জমির জাতীয়করণকে কার্ল মার্কস সমাজের অর্থনৈতিক বিকাশ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখেছেন।এই লেখাটি প্রকাশিত হয় ১৮৭২ সালের মার্চ মাসে কার্ল মার্কসের মজুরি দাম মুনাফা শীর্ষক পুস্তিকাটিতে। লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন ননী ভৌমিক।
ভূ-সম্পত্তিই হল সকল সম্পদের আদি উৎস এবং এটি এমন এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যার সমাধানের ওপর নির্ভর করে আছে শ্রমিক শ্রেণির ভবিষ্যৎ।
আমি এখানে জমির ব্যক্তিগত মালিকানার সমর্থক যতসব আইনজ্ঞ দর্শনশাস্ত্রী ও অর্থশাস্ত্রীর উপস্থাপিত সকল যুক্তিতর্ক নিয়ে পর্যালোচনা করতে চাই না, কেবল প্রথমত নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই এই বক্তব্যটিতে যে, ওই সমর্থকরা ‘স্বাভাবিক অধিকার’ এর মুখোশের নিচে(১৯২৮-১৯৬৭) আর্জেন্টিন... প্রাণপণে গোপন রাখার চেষ্টা করেছেন জমি ছিনিয়ে নেয়ার আদিম ঘটনাটিকে : যদি সমাজের মুষ্টিমেয় কয়েকজনের পক্ষে জমি ছিনিয়ে নেয়ার ব্যাপারটা তাদের স্বাভাবিক অধিকারের সামিল হয়ে থাকে, তাহলে সমাজের অধিকাংশের পক্ষে যা প্রয়োজন তা হল কেবলমাত্র যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি সংগ্রহ করা, যাতে তাদের কাছ থেকে যা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তা ফিরতি ছিনিয়ে নেয়ার মতো স্বাভাবিক অধিকার তারা অর্জন করতে পারে। ইতিহাসের গতিপথে বিজেতারা পশুশক্তির বলে সংগৃহীত তাদের আদি খেতাব, উপাধি ইত্যাদিকে তাদের নিজেদেরই জারি করা আইনের সাহায্যে এক ধরনের সামাজিক মর্যাদা দেয়াটা বেশ সুবিধাজনক বলে দেখেছে।
অতঃপর এসেছেন দর্শনশাস্ত্রী এবং তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে ওই সমস্ত আইনকানুনের মধ্যে নিহিত রয়েছে ও প্রকাশিত হয়েছে মানবজাতির সর্বজনীন সমর্থন। কাজেই যদি জমির ব্যক্তিগত মালিকানার ব্যাপারটি এমন কোনো সর্বজনীন সমর্থনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে তাহলে স্পষ্টতই তা লোপ পাবে যে-মুহূর্তে সমাজের অধিকাংশ মানুষ তার ন্যায্যতা মেনে নিতে অস্বীকৃত হবে।
অবশ্য ভূ-সম্পত্তিতে তথাকথিত এই ‘অধিকার’-এর প্রশ্নটি বাদ দিয়েও আমি জোর করে বলতে চাই যে সমাজের অর্থনৈতিক বিকাশ, জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও কেন্দ্রীভবন, অর্থাৎ সেই সমস্ত ঘটনা যা পুঁজিতন্ত্রী খামারিকে বাধ্য করে কৃষিতে যৌথভাবে সংগঠিত শ্রমকে নিয়োগ করতে এবং ক্রমশ বেশি-বেশি যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক উপায়াদি প্রয়োগে করতে এই সবই ক্রমশ বেশি করে জমির জাতীয়করণকে ‘সামাজিক দিক থেকে প্রয়োজনীয়’ করে তুলবে এবং এর বিরুদ্ধে ভূ-সম্পত্তির অধিকার-সম্পর্কিত হাজার কথাবার্তাও কোনো কাজে লাগবে না। সমাজের অবশ্য-পূরণীয় চাহিদা মিটবেই ও তা মেটাতে হবেই, সামাজিক প্রয়োজনের তাগিদে পরিবর্তনাদিও ঘটবে নিজ নিজ পথ অনুসরণ করে এবং কোথাও দ্রুত কোথাও-বা অপেক্ষাকৃত পরে তাদের স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রয়োজনীয় আইনকানুনও তৈরি করে নেবে।
আমাদের যা প্রয়োজন তা হল দিনে-দিনে উৎপাদনের মাত্রা বাড়িয়ে চলা, আর উৎপাদন-বৃদ্ধির এই জরুরি প্রয়োজন কখনোই মিটতে পারে না যদি আমরা অল্প কয়েকজন ব্যক্তিকে তাদের খেয়ালখুশি মাফিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থপূরণে কৃষি-উৎপাদনের ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রিত করতে দিই। সকল প্রকার আধুনিক পদ্ধতি, যেমন জমির সেচ ও জলনিকাশী-ব্যবস্থা, বাষ্পীয় লাঙলচালনা, জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগের ব্যবস্থা ইত্যাদি ব্যাপকভাবে কৃষিতে ব্যবহৃত হওয়া দরকার। কিন্তু যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আমরা অধিকারী এবং যন্ত্রপাতি, সাজ-সরঞ্জামের মতো কৃষিতে ব্যবহার্য যে-কূটকৌশল আমাদের আয়ত্তে, তা কখনোই সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব নয় একমাত্র ব্যাপক হারে জমিচাষের বন্দোবস্ত করা ছাড়া।
ব্যাপক হারে জমির চাষ-আবাদ যদি ছোট-ছোট ও টুকরো-টুকরো জমি পৃথকভাবে চাষের চেয়ে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এত উৎকষ্টতর ও লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়ে থাকে (এমনকি খোদ কৃষককে যা ভারবাহী পশুতে পরিণত করে সেই বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থাতেও যদি এটি সম্ভব হয়ে থাকে), তাহলে ব্যাপক জাতীয় ভিত্তিতে এই জমিচাষের প্রবর্তন করতে পারলে কি উৎপাদনের ক্ষেত্রে আগ্রহ-উদ্দীপনা আরও বৃদ্ধি পাবে না?
একদিকে জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং অপরদিকে কৃষিজাত পণ্যদ্রব্যের ক্রমবর্ধমান দরদাম তর্কার্তীতভাবে প্রমাণ করছে যে জমির জাতীয়করণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক দিক থেকে প্রয়োজনীয় একটি ব্যাপার।
ব্যক্তিগত অপব্যবহারের ফলে কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন হ্রাসের মতো ব্যাপার অবশ্যই তখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে, যখন কৃষিকজাজ পরিচালিত হবে জাতির নিয়ন্ত্রণাধীনে ও সমগ্র জাতির উপকারার্থে।
আজ এখানে এই বিশেষ প্রশ্নটি নিয়ে বিতর্ক চলার সময়ে যে সমস্ত নাগরিকের বক্তব্য আমি শুনলাম, তাঁরা সবাই জমির জাতীয়করণ সমর্থন করেছেন বটে, তবে এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন তাঁরা।
ফ্রান্সের কথা প্রায়ই উল্লেখ করতে শুনলাম, কিন্তু কৃষক-মালিকানার দেশ ফ্রান্স জমিদারি-প্রথার দেশ ইংল্যান্ডের চেয়ে জমির জাতীয়করণ থেকে আরও দূরে অবস্থান করছে। এটা সত্যি যে ফ্রান্সে যার কেনার ক্ষমতা আছে সেই জমি পেতে পারে, কিন্তু ঠিক এই সুযোগটি থাকার ফলেই সেখানে জমি টুকরো টুকরো ভূমিখণ্ডে ভাগ হয়ে গেছে এবং তা চাষ করছে নিজেদের ও নিজ-নিজ পরিবারের মেহনত দিয়ে স্বল্পবিত্ত ও জমির ওপর প্রধানত নির্ভরশীল যতসব কৃষক। এই ধরনের ভূ-সম্পত্তি এবং এ থেকে উদ্ভূত ছোট হারে পৃথক-পৃথক চাষ-ব্যবস্থা যেমন আধুনিক উন্নত কৃষির পক্ষে প্রয়োজনীয় সকল প্রকার যন্ত্রপাতি, সাজ-সরঞ্জামের ব্যবহার এড়িয়ে চলে তেমনই তা খোদ কৃষককে সামাজিক অগ্রগতির ও সবচেয়ে বেশি করে জমির জাতীয়করণের, সবচেয়ে পাকাপোক্ত শত্রু করে তোলে।
যে জমিতে আনুপাতিকভাবে স্বল্প আয়ের জন্যে সমগ্র প্রাণশক্তি তাকে নিয়োগ করতে হচ্ছে সেই জমির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, উৎপাদনের বেশিরভাগ অংশ করের আকারে রাষ্ট্রকে, মামলা-মোকদ্দমার খরচ হিসেবে আইনজীবীদের ও ঋণ বাবদ সুদ হিসেবে কুসীদজীবীকে দিতে বাধ্য এবং তার কর্মস্থল সেই ছোট্ট জমিটুকুর বাইরেকার সকল সামাজিক আন্দোলন সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। ফরাসি দেশের কৃষক তার জমির টুকরোটি ও সেই জমিতে তার নিছক নামেমাত্র মালিকানাটুকু তবু অসম্ভব অন্ধ অনুরাগভরে আঁকড়ে থাকে। আর এইভাবে ফরাসি কৃষকের মধ্যে গড়ে ওঠে শিল্পের শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে এক মারাত্মক শত্রুতার মনোভাব।
জমির জাতীয়করণের পক্ষে কৃষকের মালিকানার ব্যাপারটি তাই সবচেয়ে বড় বাধা বলে ফ্রান্সের বর্তমান অবস্থায় আমরা এই বিরাট সমস্যাটির সমাধান অবশ্যই সেদেশে খুঁজতে যাব না। মধ্য-শ্রেণির কোনো গভর্নমেন্টের অধীনে জমি ছোট-ছোট টুকরোয় ব্যক্তিবিশেষদের কিংবা শ্রমজীবীদের সমিতিগুলির মধ্যে চাষের জন্যে খাজনার ভিত্তিতে বণ্টন করার উদ্দেশ্যে জমির জাতীয়করণ নিষ্পন্ন করলে তা কেবলমাত্র ওই ব্যক্তিবিশেষদের মধ্যেই বেপরোয়া প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে এবং তার ফলে ঘটবে ক্রমবর্ধমান হারে ‘খাজনা’ বৃদ্ধি ও তা আবার জমি-আত্মসাৎকারীদের নতুন-নতুন সুযোগ জুটিয়ে দেবে কৃষির উৎপাদকদের শোষণ করার।
১৮৬৮ সালে (৬৫) ব্রাসেল্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে আমাদের জনেক বন্ধু বলেছিলেন:
জমিতে ছোট-ছোট ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভবিষ্যৎ বিজ্ঞনের রক্ত অনুসারে অন্ধকার, আর বড়-বড় ভূ-সম্পত্তির ভবিষ্যৎ অন্ধকার ন্যায়বিচারের রায়ে। তাহলে এর একমাত্র একটিই বিকল্প থাকছে। তাহলো জমিকে হতেই হবে গ্রামীণ সমিতিসমূহের সম্পত্তি, অথবা সমগ্র জাতির সম্পত্তি। এই সমস্যার সমাধান করবে ভবিষ্যৎ।
আমি বলব, ব্যাপারটা ঘটবে উল্টো। সামাজিক আন্দোলনের পরিণতি ঘটবে এই সিদ্ধান্তে যে একমাত্র স্বয়ং জাতিই সমগ্র জমির মালিক হতে পারে। কেননা জমি সংঘবদ্ধ খেতমজুরদের হাতে তুলে দেবার অর্থ দাঁড়াবে সমাজকে বিশেষ একটিমাত্র উৎপাদক-শ্রেণির হাতে সমর্পণ করা।
জমির জাতীয়করণ শ্রম ও পুঁজির মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এক পরিবর্তন ঘটাবে, এবং পরিশেষে কি শিল্পের ক্ষেত্রে ও কি গ্রামীণ ক্ষেত্রে উৎপাদনের পুঁজিতান্ত্রিক রূপটিকে দেবে বাতিল করে।
অতঃপর শ্রেণি-বৈষম্য ও শ্রেণিগত বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও এ সমস্ত যার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সেই অর্থনৈতিক বুনিয়াদটিও যাবে লুপ্ত হয়ে। তখন অন্যের শ্রমের খরচে বেঁচে(১৯২৮-১৯৬৭) আর্জেন্টিন... থাকা অতীতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তখন আর খোদ সমাজ থেকে পৃথক কোনো গভর্নমেন্ট বা রাষ্ট্রক্ষমতার অস্তিত্ব থাকবে না। কৃষি, খনিশিল্প, পণ্যোৎপাদন–এক কথায়, উৎপাদনের সকল শাখাই তখন ক্রমশ সংগঠিত হবে একেবারে যথাযথ পদ্ধতিতে। উৎপাদনের উপায়-উপকরণসমূহের জাতীয় কেন্দ্রীভবন তখন হয়ে দাঁড়াবে এমন একটি সমাজের জাতীয় ভিত্তি, যে সমাজ গঠিত হবে যৌথ ও যুক্তিসম্মত পরিকল্পনার ভিত্তিতে সামাজিক ক্রিয়াকলাপে ব্যাপৃত স্বাধীন ও সমকক্ষ উৎপাদকদের সম্মিলন নিয়ে। ঊনবিংশ শতকের বিপুল অর্থনৈতিক অগ্রগতি যে পথে চলেছে তার জনহিতকর লক্ষ্য হল এই-ই।র
লেখকবৃন্দ
কার্ল হাইনরিশ মার্ক্স (৫ মে, ১৮১৮ – ১৪ মার্চ, ১৮৮৩) ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, এবং সমাজবিজ্ঞানী। তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত। মার্ক্সের অন্যতম বিখ্যাত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে তিন খণ্ডের "পুঁজি" এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সাথে যৌথভাবে লেখা "কমিউনিস্ট ইশতেহার"। মার্ক্সের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কে তত্ত্বগুলো মার্ক্সবাদমার্ক্সবাদ ঊনবিংশ শতা... নামে পরিচিত। তাঁর মতে, ই...





