নজরদারির যুগে আমাদের সিদ্ধান্তগুলো কি সত্যিই আমাদের?

আমরা যখন গুগলে কিছু খুঁজি, ফেসবুকে স্ক্রল করি, ইউটিউবে ভিডিও দেখি, ম্যাপে পথ খুঁজি, কিংবা কোনো অ্যাপকে লোকেশন ব্যবহারের অনুমতি দিই—আমাদের প্রতিটি আচরণ তথ্য হয়ে জমা হয়। আমরা কোথায় থামি, কিসে ক্লিক করি, কোন বিষয় আমাদের রাগায়, কোন ছবি আমাদের আকর্ষণ করে, কোন রাজনৈতিক বার্তায় আমরা সাড়া দিতে পারি—এসব ধীরে
নজরদারির যুগে আমাদের সিদ্ধান্ত কি সত্যিই আমাদের

অনুকূল লিপিকার

অনুকূল লিপিকার ক্রিমসন থিওরির একজন গবেষণা সহকারী। 

আমরা সাধারণত স্বাধীনতাকে ভাবি নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হিসেবে। আমি কী কিনব, কী পড়ব, কোন সংবাদে বিশ্বাস করব, কোন রাজনৈতিক বিষয়ে ক্ষুব্ধ হব, কাকে সমর্থন করব—এসবই যেন আমার ব্যক্তিগত বিচারবোধের ফল। আধুনিক গণতন্ত্রও এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে: নাগরিকেরা তথ্য গ্রহণ করবে, ভাববে, মত গড়বে, তারপর সিদ্ধান্ত নেবে।

কিন্তু ডিজিটাল যুগে এই সরল ধারণাটি আর অক্ষত নেই।

আমরা যখন গুগলে কিছু খুঁজি, ফেসবুকে স্ক্রল করি, ইউটিউবে ভিডিও দেখি, ম্যাপে পথ খুঁজি, কিংবা কোনো অ্যাপকে লোকেশন ব্যবহারের অনুমতি দিই—আমাদের প্রতিটি আচরণ তথ্য হয়ে জমা হয়। আমরা কোথায় থামি, কিসে ক্লিক করি, কোন বিষয় আমাদের রাগায়, কোন ছবি আমাদের আকর্ষণ করে, কোন রাজনৈতিক বার্তায় আমরা সাড়া দিতে পারি—এসব ধীরে ধীরে বিশ্লেষিত হয়। তারপর সেই বিশ্লেষণ দিয়ে শুধু আমাদের পছন্দ বোঝা হয় না; আমাদের ভবিষ্যৎ আচরণ অনুমান করা হয়, সেই অনুমান বিক্রি করা হয়, এবং সুযোগ পেলে সেই আচরণকে নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

এই ব্যবস্থাকেই শোশানা জুবফ বলেছেন surveillance capitalism, বাংলায় নজরদারি পুঁজিবাদ। এটি শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির ব্যবসা নয়। এটি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মনোযোগ, আবেগ, দুর্বলতা, এমনকি ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তকে পণ্য বানানোর এক নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা।

নজরদারি পুঁজিবাদ কী?

সহজ ভাষায়, নজরদারি পুঁজিবাদ হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে মানুষের আচরণ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, সেই তথ্য দিয়ে তার ভবিষ্যৎ আচরণ অনুমান করা হয়, এবং সেই পূর্বাভাস বিক্রি করা হয় বিজ্ঞাপনদাতা, করপোরেশন, আর রাজনৈতিক প্রভাবকদের কাছে।

পুরোনো পুঁজিবাদ জমি, শ্রম, খনিজ, বন, নদী—এসবকে কাঁচামাল বানিয়েছে। নজরদারি পুঁজিবাদ আরও ভেতরে ঢুকে মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতাকেই কাঁচামাল বানায়।

আপনি কী কিনবেন, তা মূল্যবান তথ্য। আপনি কোন রাজনৈতিক বক্তব্যে উত্তেজিত হন, তা-ও মূল্যবান তথ্য। আপনি কখন একা বোধ করেন, কখন উদ্বিগ্ন হন, কখন ক্ষুব্ধ হন—এসবও বাজারের চোখে লাভজনক।

এখানে মানুষ কেবল গ্রাহক নয়। সে একই সঙ্গে পর্যবেক্ষণের বিষয়, পরীক্ষার ক্ষেত্র, এবং মুনাফার উৎস।

কীভাবে এটি কাজ করে?

নজরদারি পুঁজিবাদ সাধারণত পাঁচটি ধাপে কাজ করে।

প্রথমত, আমাদের আচরণ সংগ্রহ করা হয়। আমরা কী দেখি, কোথায় থামি, কী সার্চ করি, কাকে অনুসরণ করি, কোন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিই—এসব তথ্য হিসেবে জমা হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তথ্য নেওয়া হয়। একটি অ্যাপ যে কাজের জন্য যতটুকু তথ্য দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এই অতিরিক্ত তথ্যই ভবিষ্যৎ মুনাফার উপাদান।

তৃতীয়ত, আমাদের মানসিক ও আচরণগত প্রোফাইল তৈরি করা হয়। অ্যালগরিদম অনুমান করে: আমরা কী পছন্দ করি, কী ভয় পাই, কী নিয়ে চিন্তিত, কোন ভাষা আমাদের নরম করে, কোন ভাষা উসকে দেয়।

চতুর্থত, সেই পূর্বাভাস বিক্রি করা হয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জানতে চায় আমরা কী কিনব। বীমা কোম্পানি জানতে চায় আমরা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনৈতিক প্রচারযন্ত্র জানতে চায়, কোন ভোটারের সামনে কোন বার্তা দিলে তার মন বদলাতে পারে। জুবফের ভাষায়, এই ব্যবসা ‘সার্টেইনটি’ বা আচরণগত নিশ্চয়তা বিক্রি করে।

পঞ্চমত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, আচরণকে প্রভাবিত করা। শুধু মানুষ কী করবে তা অনুমান নয়; এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে সে অনুমিত কাজটিই করার সম্ভাবনা বাড়ে।

কোন পোস্টটি আগে দেখবেন, কোন ভিডিওর পর কোন ভিডিও আসবে, কোন রাজনৈতিক খবর বারবার সামনে আসবে, কার বক্তব্য আপনার ফিডে অদৃশ্য হয়ে যাবে—এসবই সিদ্ধান্তের পরিবেশকে বদলে দেয়। আমরা এখনও সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যে বাস্তবতাটি আমাদের সামনে সাজানো হয়, সেটি আর নিরপেক্ষ থাকে না।

স্বাধীন সিদ্ধান্তের ভ্রম

নজরদারি পুঁজিবাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি মানুষকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ করে না। এটি মানুষের সিদ্ধান্তকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত তার নিজের বলেই মনে হয়।

আপনি ভাবলেন, হঠাৎ একটি বিষয়ে আপনার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আপনি ভাবলেন, কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রতি আপনার রাগ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। আপনি ভাবলেন, কোনো গোষ্ঠীকে সন্দেহ করার কারণ আপনি নিজেই খুঁজে পেয়েছেন।

কিন্তু এর আগে অ্যালগরিদম হয়তো আপনাকে দিনের পর দিন এক ধরনের পোস্ট, ভিডিও, ব্যাখ্যা, রাগ, ভয়, ব্যঙ্গ, অপমান, ষড়যন্ত্র, বা নির্বাচিত সত্যের মধ্যে রেখেছে। আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—কিন্তু আপনার সিদ্ধান্তের আবহাওয়া কে বানিয়েছে?

এই ব্যবস্থার শক্তি এখানেই। এটি আদেশ দেয় না। এটি বেছে নেওয়ার পরিস্থিতি সাজায়।

জুবফ বলেন, নজরদারি পুঁজিবাদ মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। কারণ এটি ভবিষ্যৎকে মানুষের নিজের খোলা ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে, বাজারের পূর্বাভাস-নির্ভর ক্ষেত্র হিসেবে ধরে। মানুষ কী করবে, তা শুধু জানার বিষয় নয়; তাকে সেদিকে চালিত করাও ব্যবসার অংশ হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক এজেন্সি কীভাবে ক্ষয়ে যায়?

রাজনৈতিক এজেন্সি মানে শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার নয়। এর অর্থ নিজের স্বার্থ বোঝার ক্ষমতা, মত গঠনের স্বাধীনতা, অন্যদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যৌথ দাবি তোলার শক্তি, এবং শাসকের ভাষা ও প্রচারণাকে প্রশ্ন করার সামর্থ্য।

নজরদারি পুঁজিবাদ এই এজেন্সিকে সরাসরি কেড়ে নেয় না; বরং ধীরে ধীরে দুর্বল, বিচ্ছিন্ন ও পরিচালনাযোগ্য করে তোলে।

প্রথমত, নাগরিককে মানুষ নয়, প্রোফাইলে ভেঙে ফেলা হয়। গণতন্ত্রের নাগরিক একজন বিচারক্ষম সত্তা। কিন্তু নজরদারি পুঁজিবাদের কাছে সে ‘মধ্যবিত্ত ক্ষুব্ধ পুরুষ’, ‘অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় থাকা তরুণ’, ‘ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল ভোটার’, ‘উদ্বিগ্ন মা’, ‘রাগপ্রবণ কনটেন্ট-ভোক্তা’—এই ধরনের আচরণগত শ্রেণিতে বিভক্ত একটি ডেটা-সত্তা। তার রাজনৈতিক অবস্থানকে বোঝার চেষ্টা করা হয় না; বরং তাকে টার্গেট করা হয়।

দ্বিতীয়ত, মত গঠনের জায়গা ভেঙে যায়। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সবাই অন্তত কিছু সাধারণ তথ্যভূমি ভাগ করে নেয়। মানুষ তর্ক করে, দ্বিমত করে, কিন্তু মোটামুটি একই জনপরিসরে থাকে। অ্যালগরিদমিক প্ল্যাটফর্ম এই জনপরিসরকে ভেঙে দেয়। প্রত্যেকে তার নিজের কাস্টমাইজড বাস্তবতা দেখে। একেক জনের কাছে একেক ধরনের খবর, একেক ধরনের রাগ, একেক ধরনের শত্রু হাজির হয়। ফলে গণতান্ত্রিক বিতর্কের জায়গায় তৈরি হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব-বুদ্‌বুদ।

তৃতীয়ত, ক্ষোভকে সংগঠিত রাজনীতিতে নয়, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঠেলে দেওয়া হয়। মানুষের ক্ষোভ রাজনৈতিক শক্তি হতে পারে, যদি তা সমস্যার মূল কারণ বোঝে, সংগঠিত হয়, দাবি তোলে। কিন্তু প্ল্যাটফর্ম-চালিত অর্থনীতি ক্ষোভকে প্রায়ই ক্লিকযোগ্য আবেগে নামিয়ে আনে। অন্যায় নিয়ে ভাবনার বদলে আসে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিশ্লেষণের বদলে আসে সহজ শত্রু। রাজনৈতিক প্রশ্নের বদলে আসে অ্যালগরিদম-পুষ্ট উত্তেজনা। এভাবে মানুষ রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যায় না; বরং রাজনীতির গভীরতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতিক্রিয়ার অর্থনীতিতে বন্দী হয়।

চতুর্থত, মানুষ নিজেকে সক্রিয় ভাবলেও, অনেক সময় সে চালিত হয়। লাইক দেওয়া, শেয়ার করা, মন্তব্য করা—এসব দেখে মনে হয় মানুষ ভীষণ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো: সে কি সত্যিই রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করছে, নাকি এমন কনটেন্টের ধারাবাহিক প্রবাহে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে যা তার আবেগকে ধরে রাখতে তৈরি? রাজনৈতিক এজেন্সির জায়গায় তখন আসে নিরবচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়াশীলতা। সে কথা বলছে, কিন্তু কোন বিষয়ে কথা বলবে তা অনেক সময় প্ল্যাটফর্ম বেছে দিচ্ছে। সে রাগ করছে, কিন্তু কোন ঘটনায় রাগ করবে তার অগ্রাধিকার অদৃশ্যভাবে সাজানো হচ্ছে। সে নির্বাচন করছে, কিন্তু তার উপলব্ধির ক্ষেত্রটি আগেই রূপায়িত।

এটি কেন এক ধরনের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা?

মার্কস শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছিলেন—শ্রমিক নিজের শ্রমের ফলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। নজরদারি পুঁজিবাদের যুগে মানুষ নিজের মনোযোগ, অভিজ্ঞতা, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার পরিবেশের ওপরও নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে।

সে ভাবছে, সে নিজেই বেছে নিচ্ছে। কিন্তু তার পছন্দের অনেক উপাদান অন্যত্র গঠিত। সে ভাবছে, সে নিজেই রাগ করছে। কিন্তু তার রাগের উপাদান বাছাই করে দেওয়া হয়েছে। সে ভাবছে, সে নিজেই মত গড়ছে। কিন্তু তার সামনে কী কী মত হাজির হবে, সেটিই অন্যের হাতে।

এটি রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার নতুন রূপ। মানুষ রাজনৈতিক জীবন থেকে সরাসরি নির্বাসিত নয়; বরং সে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় এমন এক পরিবেশে, যার গভীর যুক্তি তার অজানা।

এই অজানাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দৃশ্যমান প্রচারণাকে প্রশ্ন করা যায়। অদৃশ্য প্রভাবকে চেনাই কঠিন।

‘নাজ (Nudge)’ বা মৃদু ধাক্কা কেন রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক?

কখনও বলা হয়, মানুষের ভালো সিদ্ধান্তে সাহায্য করার জন্য ‘নাজ’ বা মৃদু প্রভাব দরকার হতে পারে—যেমন স্বাস্থ্যকর খাবার সামনে রাখা, কর জমা দেওয়ার রিমাইন্ডার পাঠানো ইত্যাদি। কিন্তু জুবফ এই যুক্তির বিষয়ে সতর্ক। তাঁর মতে, যখন কোনো অদৃশ্য শক্তি মানুষের সিদ্ধান্তের স্থাপত্য তৈরি করে, তখন সেটি ক্ষমতার সম্পর্ক। কারণ সেখানে একজন ঠিক করছে, অন্যজন কীভাবে বেছে নেবে।

বাজার-নিয়ন্ত্রিত নাজ আরও বিপজ্জনক। কারণ তার লক্ষ্য নাগরিকের মঙ্গল নয়; মুনাফা, নিয়ন্ত্রণ, বা কাঙ্ক্ষিত আচরণ।

রাজনীতিতে এর অর্থ হতে পারে: কোন ভোটারকে ভয় দেখাতে হবে, কাকে উদাসীন রাখতে হবে, কাকে উসকে দিতে হবে, কাকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করতে হবে, এবং কাকে কোন পরিচয়-ভিত্তিক ক্ষোভে আবদ্ধ রাখতে হবে—এসবই ঠিক করে দেওয়া যায়।

এখানে রাজনৈতিক মত গঠন আর খোলা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এটি আচরণগত প্রকৌশলের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

গণতন্ত্রের ভেতরেই গণতন্ত্রকে ফাঁপা করা

নজরদারি পুঁজিবাদ গণতন্ত্রকে সব সময় সরাসরি বাতিল করে না। নির্বাচন থাকতে পারে, প্রচার থাকতে পারে, মানুষ ভোটও দিতে পারে। কিন্তু তবুও গণতন্ত্র ফাঁপা হয়ে যেতে পারে।

কারণ গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো স্বাধীন রাজনৈতিক বিচারবোধ। সেই বিচারবোধ যদি ক্রমাগত বাজার-নির্মিত তথ্যপরিবেশ, ব্যক্তিকৃত প্রভাব, আবেগ-উত্তেজক কনটেন্ট, এবং অদৃশ্য আচরণ-পরিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্যে গঠিত হয়, তাহলে ভোটের স্বাধীনতা আইনি অর্থে থাকলেও তার সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়।

এখানে মানুষ আর কেবল মত প্রকাশ করছে না। তাকে এমনভাবে মানচিত্রিত করা হচ্ছে যাতে তার মতকে ধরা, পূর্বাভাস করা, এবং ঘোরানো যায়।

এই কারণে নজরদারি পুঁজিবাদ শুধু গোপনীয়তার সংকট নয়। এটি গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের সংকট।

তাহলে কি মানুষ পুরোপুরি অসহায়?

না। মানুষের রাজনৈতিক এজেন্সি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। মানুষ এখনও প্রতিরোধ করে, প্রশ্ন তোলে, সংগঠিত হয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ভেতরেও বিকল্প কণ্ঠ তৈরি করে। নজরদারি পুঁজিবাদ সর্বশক্তিমান নয়।

কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই এই ব্যবস্থাকে নিরীহ প্রযুক্তি হিসেবে দেখি। আমরা ভাবি, এটি কেবল বিজ্ঞাপন দেখানোর উন্নত উপায়। অথচ এর গভীরে রয়েছে মানুষের মনোযোগ, আবেগ, আচরণ এবং রাজনৈতিক বিচারবোধকে মুনাফার লজিকে অধীন করার চেষ্টা।

যতক্ষণ আমরা এই কাঠামোকে বুঝতে না পারব, ততক্ষণ আমরা প্রতিটি প্রভাবকে নিজের সিদ্ধান্ত বলে ভুল করব।

কী করা দরকার?

এই সমস্যার সমাধান শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে সম্ভব নয়। অবশ্যই আমাদের সতর্ক হতে হবে—প্রাইভেসি সেটিংস, ডেটা অনুমতি, প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অভ্যাস—এসব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটি একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো; তাই এর জবাবও রাজনৈতিক হতে হবে।

প্রয়োজন তথ্য সংগ্রহের কঠোর সীমা; সম্মতির নামে ডেটা লুট বন্ধ করা; আচরণগত পূর্বাভাস ও প্রভাব-বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ; রাজনৈতিক মাইক্রো-টার্গেটিংয়ের কড়া বিধিনিষেধ; অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা; এবং নাগরিকদের ডিজিটাল অধিকারকে মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

জুবফের বক্তব্য স্পষ্ট: মানুষের ভবিষ্যৎ আচরণকে পণ্য বানিয়ে যে বাজার গড়ে উঠেছে, সেটি অনিবার্য নয়। আইন, নাগরিক চাপ, সাংবাদিকতা, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের মাধ্যমে তা বদলানো সম্ভব।

শেষ কথা

নজরদারি পুঁজিবাদ আমাদের বলে: আমরা আপনাকে আরও ভালোভাবে চিনি, তাই আপনাকে আরও ভালো সেবা দেব। কিন্তু এর আড়ালে আরেকটি বাক্য লুকিয়ে থাকে: আমরা আপনাকে এত ভালোভাবে চিনি যে, আপনার পরের পদক্ষেপও অনুমান করতে পারি—এবং চাইলে সেটিকে প্রভাবিতও করতে পারি।

এই ব্যবস্থায় মানুষ কেবল দেখা হয় না; তাকে পাঠ করা হয়। কেবল পাঠ করা হয় না; তাকে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। কেবল শ্রেণিবিন্যাস করা হয় না; তাকে চালিত করার চেষ্টা চলে।

ফলে প্রশ্নটি আর শুধু ‘আমার ডেটা কে নিচ্ছে?’ নয়। প্রশ্নটি হলো: আমার মত, আমার রাগ, আমার আকাঙ্ক্ষা, আমার ভোট—এসব কতখানি সত্যিই আমার?

গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ, যখন নাগরিকেরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেয়। নজরদারি পুঁজিবাদ সেই সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে ছিনিয়ে নেয় না। সে তার চারপাশের অদৃশ্য দেয়ালগুলো বানিয়ে দেয়।

লেখক

অনুকূল লিপিকার ক্রিমসন থিওরির একজন গবেষণা সহকারী। 

Scroll to Top