এই কথোপকথনটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে ঘিরে। মেইন অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচন সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী গ্রাহাম প্ল্যাটনার তখন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় উঠে এসেছিলেন। নিজেকে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা এই প্রার্থীকে ঘিরে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত নানা বিতর্কও তৈরি হয়। সেই বিতর্কের সূত্র ধরে মার্কিন ব্যবসাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ প্রশ্ন তোলে—আজকের যুক্তরাষ্ট্রে ‘শ্রমিক শ্রেণি’ বলতে আদৌ কাদের বোঝায়, আর প্ল্যাটনার নিজে সেই শ্রেণির মানুষ কি না।
বাংলাভাষী পাঠকের জন্য এখানে দুটি বিষয় মনে রাখা দরকার। প্রথমত, আলোচনাটি বাংলাদেশের শ্রেণিকাঠামো নিয়ে নয়; এর প্রধান উদাহরণ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার, ট্রেড ইউনিয়ন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং সামাজিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাস থেকে। দ্বিতীয়ত, সাক্ষাৎকারটির তাৎক্ষণিক নির্বাচনী প্রসঙ্গ এখন পুরোনো হলেও এর মূল প্রশ্নটি এখনো প্রাসঙ্গিক: একজন মানুষকে কি শুধু আয়, শিক্ষা বা পেশার ধরন দেখে শ্রমিক বলা যায়, নাকি দেখতে হবে তিনি জীবিকার জন্য কার অধীনে কাজ করেন এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁর কতটা ক্ষমতা আছে?
জ্যাকোবিন রেডিওর পডকাস্ট কনফ্রন্টিং ক্যাপিটালিজম-এর এই পর্বে সমাজবিজ্ঞানী বিবেক চিবার ও মেলিসা নাশেক সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। তাঁদের আলোচনা এগিয়েছে চারটি বড় বিষয়ে: শ্রমিক শ্রেণির সংজ্ঞা, মধ্যবিত্তের অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রে শ্রেণি ও ভোটের সম্পর্ক, এবং একজন রাজনীতিককে সত্যিকার অর্থে শ্রমিকপন্থী প্রার্থী করে তোলে কী।
পডকাস্টটি প্রযোজনা করেছে ক্যাটালিস্ট: আ জার্নাল অব থিওরি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি এবং প্রকাশ করেছে জ্যাকোবিন। কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ করে ক্রিমসন থিওরি।
আলোচনার শুরু
মেলিসা নাশেক: এখন সংবাদমাধ্যমের আলোচনার বড় অংশ জুড়ে ছিল প্রাইমারি নির্বাচন। বিশেষ করে মেইনের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী গ্রাহাম প্ল্যাটনার অনেক মনোযোগ পাচ্ছিলেন।
বিবেক চিবার: ‘মনোযোগ’ বলাটা বেশ ভদ্র শোনায়। বরং বলা যায়, একের পর এক আক্রমণ চলছে।
মেলিসা: সংবাদমাধ্যম বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আনছিল, যদিও সেগুলোর সত্যতা নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন ছিল। বামপন্থীদের অনেকে মনে করছিলেন, বারাক ওবামা ও জো বাইডেনঘেঁষা ডেমোক্র্যাটিক শিবির ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর প্রচার থামাতে চাইছিল। কারণ প্ল্যাটনার মূলত দলীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরের প্রার্থী হিসেবে লড়ছিলেন এবং দলীয় প্রতিষ্ঠানের পছন্দের প্রার্থীকে কার্যত পেছনে ফেলে দিয়েছিলেন।
তাঁকে নানা দিক থেকে আক্রমণ করা হচ্ছিল। এর মধ্যে আমাদের দৃষ্টি কেড়েছে ব্লুমবার্গ-এর একটি লেখা। সেখানে বলা হয়েছে, প্ল্যাটনারকে শ্রমিক শ্রেণির প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা হলেও—শিরোনামের ভাষায়—‘শ্রমিক শ্রেণি বলতে এখন আর কী বোঝায়, কেউ জানে না।’ শ্রমিক শ্রেণির সংজ্ঞা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ এবং শ্রমিকপন্থী জনতাবাদী কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনে নামা প্রার্থীদের মূল্যায়নের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক আছে।
বিবেক: শুরুতেই একটি কথা পরিষ্কার করা দরকার। গ্রাহাম প্ল্যাটনার নিজে শ্রমিক কি না, সেটি আসল প্রশ্ন নয়। আসল হলো তাঁর কর্মসূচি। পরে আমরা এ প্রসঙ্গে ফিরব।
তবে বামপন্থীদের অবশ্যই স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে—শ্রমিক শ্রেণি কাদের নিয়ে গঠিত, কোন অবস্থানের মানুষকে শ্রমিক বলা যায়, আর কাকে বলা যায় না। কারণ সংগঠিত করতে হলে আগে জানতে হবে কাদের সংগঠিত করা হচ্ছে। ‘শ্রমিক’ বলতে কী বোঝায়, সেটিই অস্পষ্ট থাকলে রাজনীতিও বিভ্রান্ত হবে।
ব্লুমবার্গ লিখেছে, ‘শ্রমিক কাকে বলে, কেউ জানে না।’ আসলে তাদের বলা উচিত ছিল, ‘আমরা জানি না শ্রমিক কাকে বলে।’ সেটিই বেশি সত্য হতো।
শ্রমিক শ্রেণি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির মৌলিক ধারণাগুলোর একটি। তাই সাধারণত ধরে নেওয়া হয়, শ্রমিক নিয়ে কথা বলা মানুষজন অন্তত শব্দটির অর্থ জানেন। আমার মনে হয়, এই ধারণা ঠিক নয়। সেই কারণেই বিষয়টি নতুন করে ভাবার এটি ভালো সুযোগ—শ্রমিক শ্রেণি কী, প্ল্যাটনারের প্রচারের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোথায় এবং তাঁকে কীভাবে দেখা উচিত।
শ্রমিক শ্রেণি কারা?
মেলিসা:ব্লুমবার্গ-এর প্রশ্নটিই আগে ধরা যাক: শ্রমিক শ্রেণি কী?
বিবেক: মানুষের শ্রেণি বোঝার একটি প্রচলিত উপায় আছে, আবার একটি তুলনামূলক নির্ভুল উপায়ও আছে। প্রথমটি সহজ, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তিকর হতে পারে; দ্বিতীয়টি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির কৌশল তৈরিতে বেশি কার্যকর।
প্রচলিত পদ্ধতিটি আয় দিয়ে শ্রেণি নির্ধারণ করে। প্রশ্নটি হয়: আপনি কত আয় করেন? এই ধারণায় দরিদ্র মানুষকেই শ্রমিক ধরা হয়।
মেলিসা: কলেজশিক্ষাও সাধারণত একটি সূচক হিসেবে ধরা হয়।
বিবেক: হ্যাঁ। এই হিসাবে শ্রমিক হলো সেই মানুষ, যার কলেজশিক্ষা নেই এবং আয় কম। আর কলেজশিক্ষিত ও ধনী মানুষ শ্রমিক নয়। জনমত জরিপ, সংবাদ আলোচনা, পত্রিকার মতামত কলাম—সব জায়গায় এই সংজ্ঞাই দেখা যায়।
মেলিসা: রাজনৈতিক দলের কৌশল তৈরিকারী গবেষকেরাও প্রায়ই এই সংজ্ঞা ব্যবহার করেন। তাঁদের গবেষণা, নীতিপত্র এবং রাজনৈতিক জোট গঠনের পরিকল্পনা এই শ্রেণিবিভাগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে সংজ্ঞার প্রশ্নটি নিছক তাত্ত্বিক নয়; রাজনৈতিক কৌশল অনেকটাই এর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
বিবেক: এই সংজ্ঞার ওপরই নির্ভর করে, আপনি কাদের নিজের নির্বাচনী বা রাজনৈতিক ভিত্তি মনে করবেন। আপনার সমর্থকগোষ্ঠী যদি অর্থনৈতিক রেখায় গঠিত হয়, তবে সেটি একটি শ্রেণিগত রেখা। শ্রেণিগুলোকে আপনি কীভাবে চিহ্নিত করছেন, তার ওপর নির্ভর করবে কার সঙ্গে কথা বলবেন এবং কাদের সংগঠিত করবেন।
মেলিসা: প্রচলিত বোঝাপড়ায় সমস্যাটি কোথায়? শ্রমিক শ্রেণিকে তাহলে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা উচিত?
বিবেক: ভুল সংজ্ঞার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, আপনি সংগঠনের জন্য ভুল মানুষের কাছে যাবেন এবং যাঁদের কাছে যাওয়া দরকার, তাঁদের অনেককেই বাদ দেবেন।
আয়ভিত্তিক সংজ্ঞা পুরোপুরি ভুল নয়। কেবল আয় দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে, শ্রমিকদের বড় অংশই দরিদ্র। দারিদ্র্যসীমার দেড় গুণের নিচে(১৯২৮-১৯৬৭) আর্জেন্টিন... আয় করা মানুষকে দরিদ্র ধরলে তাঁদের মধ্যে অনেক শ্রমিক পাওয়া যাবে।
কিন্তু একই সঙ্গে বহু শ্রমিক বাদ পড়ে যাবেন।
ধরা যাক, একজন ইউনিয়নভুক্ত দক্ষ শ্রমিকের চুক্তি ভালো। তাঁর আয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যম পারিবারিক আয়ের চেয়েও বেশি। তাঁর বাড়ি ও গাড়ি আছে, হয়তো দুই বছর কলেজেও পড়েছেন। আয় ও শিক্ষাভিত্তিক সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি আর শ্রমিক নন।
এভাবে বাদ পড়ে মার্কিন শ্রমিক আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ইউনিয়নভুক্ত দক্ষ শ্রমিকেরা। তাঁদের আয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে, কলেজশিক্ষা থাকতে পারে, এমনকি বাড়ির মতো সম্পদও থাকতে পারে।
উল্টো দিকেও ভুল হয়। বহু ছোট দোকানি, স্বনিয়োজিত মালিক-পরিচালক বা পারিবারিক ব্যবসার মালিক কলেজে পড়েননি; তাঁদের শিক্ষা হয়তো উচ্চবিদ্যালয় পর্যন্ত। আয়-শিক্ষার মানদণ্ডে তাঁদের শ্রমিক শ্রেণিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে, যদিও তাঁদের শ্রেণি-অবস্থান মধ্যবিত্ত।
এখানেই মূল সমস্যা। দোকানমালিককে শ্রমিক আর শ্রমিককে মধ্যবিত্ত ধরে নিলে এমন মানুষদের একই দলে ফেলা হয়, যাঁদের স্বার্থ আসলে এক নয়।
নিজেদের অবস্থার উন্নতি করতে কী ধরনের নীতি দরকার বা কোন পদক্ষেপ তাঁদের পক্ষে যাবে—এই প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান ভিন্ন হবে। কলেজশিক্ষিত শ্রমিক সাধারণত ইউনিয়ন চাইবেন। কিন্তু কয়েকজন কর্মচারী নিয়োগ করা ছোট দোকানমালিক ইউনিয়নকে অপছন্দ করতে পারেন। কর্মীদের বড় ধরনের মজুরি বৃদ্ধি তাঁর মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে, এমনকি ব্যবসাটিকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
আমরা শ্রমিক আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতে চাই বলেই এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণির এমন সংজ্ঞা দরকার, যা একই মৌলিক স্বার্থের মানুষদের চিহ্নিত করবে এবং একই সঙ্গে বুঝতে সাহায্য করবে কারা সেই স্বার্থের বিরোধিতা করতে পারেন।
এই অর্থে শ্রেণির সংজ্ঞা স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত—অর্থাৎ আমরা কোন রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে শ্রেণিকে দেখছি, তার সঙ্গেও বিষয়টি যুক্ত। আমাদের দৃষ্টিতে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ সামাজিক গণতন্ত্র, ট্রেড ইউনিয়নবাদ ও সমাজতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। তাই এমন মানুষদের খুঁজতে হবে, যাঁদের বাস্তব অবস্থান দীর্ঘমেয়াদি এই কৌশলের সঙ্গে মেলে।
আয়ভিত্তিক ধারণার বদলে মানুষ উৎপাদনব্যবস্থায় কোথায় দাঁড়িয়ে এবং কর্মক্ষেত্রে তার কতটা ক্ষমতা আছে দিয়ে শ্রমিককে সংজ্ঞায়িত করলে সেই মানুষদের অনেক বেশি নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা যায়।
মেলিসা: তাহলে কোন মৌলিক পার্থক্য একজন মানুষকে শ্রমিক করে তোলে? সেই অবস্থান কীভাবে নির্দিষ্ট স্বার্থ তৈরি করে?
শ্রমিক হওয়ার দুটি শর্ত
বিবেক: মূলত দুটি শর্ত একজন মানুষকে শ্রমিক করে।
প্রথমটি হলো—জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে অন্যের অধীনে কাজ করতে হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি ইচ্ছা করে অন্যের অধীনে কাজ করছেন—এটি যথেষ্ট নয়; তাঁর জীবিকা চালাতে কাজটি তাঁর প্রয়োজন।
কিম কার্দাশিয়ান ইচ্ছা করে ম্যাকডোনাল্ডসে চাকরি নিলে তিনি শ্রমিক হয়ে যাবেন না। পরদিনই চাকরি ছেড়ে দিলেও তাঁর জীবনে তেমন ক্ষতি হবে না। সেই চাকরি তাঁর আয়ের প্রধান উৎস নয়।
গ্রাহাম প্ল্যাটনার শ্রমিক কি না, তা মুখ্য নয়। মুখ্য তাঁর কর্মসূচি।
এ ধরনের কাজকে সাধারণত মজুরিশ্রম বলা হয়। তবে কেবল ঘণ্টাভিত্তিক মজুরি পাওয়া কর্মীদের মধ্যে সংজ্ঞা আটকে রাখা যাবে না। বেতনভুক্ত অনেক মানুষও অন্যের জন্য কাজ করেন। পেশাজীবী শ্রেণির কিছু অংশ এবং অত্যন্ত দক্ষ শ্রমিকদের অনেকে ঘণ্টাভিত্তিক মজুরির বদলে মাসিক বেতন পান।
বেতন আসলে মজুরিরই একটি রূপ। ঘণ্টা ধরে না দিয়ে মাস ধরে দেওয়া হয়। বেতনভুক্ত কর্মীকে বলা হতে পারে, নির্দিষ্ট মাসিক অর্থের বিনিময়ে তাঁকে অনির্ধারিত সংখ্যক ঘণ্টা কাজ করতে হবে। তবু বিনিময়টি সময়ভিত্তিকই থাকে—যা মজুরির মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু আরও একটি শর্ত আছে। শ্রমিক শুধু উৎপাদনের উপায়ের মালিক নন মানুষ নন; তিনি একজন বসের অধীনে কাজ করেন এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা খুব কম বা নেই বললেই চলে।
ম্যানেজারও বেতন পান। তাহলে তাঁকে শ্রমিক বলা হয় না কেন?
কারণ তাঁর বেতনের সঙ্গে যে কাজটি যুক্ত, তা মালিকের কাজের একটি অংশ—অন্যের শ্রম পরিচালনা করা।
একজন পুঁজিপতি ও একজন শ্রমিককে কল্পনা করুন। শ্রমিক মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন; পুঁজিপতি মুনাফা নেন। শ্রমিককে প্রয়োজনীয় গতি ও মানে কাজ করাতে পুঁজিপতিকে তাঁর ওপর কর্তৃত্ব চালাতে হয়—নজরদারি, তদারকি ও ব্যবস্থাপনা করতে হয়।
প্রতিষ্ঠান ছোট থাকলে মালিক নিজেই তা করতে পারেন। কিন্তু কর্মীসংখ্যা একশতে পৌঁছালে সবাইকে সরাসরি তদারকি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। তখন তিনি ম্যানেজার নিয়োগ করেন।
কাগজে ম্যানেজারও বেতনভুক্ত কর্মচারী। তাই তাঁকে শ্রমিকের মতো দেখায়। কিন্তু বাস্তবে মালিক নিজের একটি কাজ তাঁর কাছে হস্তান্তর করেছেন—কর্তৃত্বের কাজ।
মেলিসা: অন্যের ওপর নজরদারির ক্ষমতা।
বিবেক: ঠিক তাই। ম্যানেজার ও তাঁর অধীন শ্রমিক—উভয়েই পুঁজিপতির কাছ থেকে অর্থ পান। কিন্তু তাঁরা একই শ্রেণির নন। কারণ ম্যানেজার শ্রমিকের শোষণ সংগঠিত ও পরিচালনায় সহায়তা করে আয় করেন। আবার তিনি পুরোপুরি পুঁজিপতিও নন। তাঁকে চাকরিচ্যুত করা যায়। তাই তিনি মাঝামাঝি অবস্থানে থাকেন। অধিকাংশ ম্যানেজারকে মধ্যবিত্ত বলা হয়, কারণ তাঁদের মধ্যে দুই শ্রেণির একটি করে বৈশিষ্ট্য আছে। শ্রমিকের মতো তিনি পুঁজিপতির কাছ থেকে বেতন পান; কিন্তু শ্রমিকের বিপরীতে অন্য শ্রমিকের কাজ ও শোষণ পরিচালনা করেন।
মেলিসা: এই অর্থে পুঁজিপতি শ্রেণির সঙ্গে তাঁর একটি অভিন্ন স্বার্থও তৈরি হয়।
বিবেক: ঠিক। অনেক ম্যানেজারের বেতন বা বোনাস কোম্পানির মুনাফার সঙ্গে যুক্ত। ফলে মালিক বা প্রধান নির্বাহীকে মুনাফা বাড়াতে সাহায্য করা তাঁর সরাসরি স্বার্থে পরিণত হয়। সেই মুনাফা প্রায়ই অধীন শ্রমিকদের কল্যাণের বিনিময়ে আসে।
অতএব, অন্যের জন্য কাজ করাই শ্রমিক হওয়ার যথেষ্ট শর্ত নয়। দুটি শর্ত একসঙ্গে লাগবে: আপনাকে অন্যের জন্য কাজ করতে হয় এবং আপনার হাতে পুঁজিপতির মতো ব্যবস্থাপনা ও তদারকির ক্ষমতা নেই।
যদি সেই ক্ষমতা থাকে, তবে আপনি সম্ভবত মাঝামাঝি শ্রেণিতে। পুঁজিবাদে এই তৃতীয় শ্রেণিকেই আমরা মধ্যবিত্ত বলি। শ্রমিকের মতো তারা উৎপাদনের উপায়ের মালিক নয় এবং অন্যের জন্য কাজ করতে হয়। আবার পুঁজিপতির মতো শ্রমিকের ওপর ক্ষমতাও প্রয়োগ করে। তাই পুঁজির কিছু স্বার্থের সঙ্গে তাদের স্বার্থ মিলে যায়।
মধ্যবিত্ত কারা?
মেলিসা: মধ্যবিত্তকে আলাদা করার এটিই কি একমাত্র মানদণ্ড?
বিবেক: মার্ক্সীয় অর্থে মধ্যবিত্ত এমন একটি শ্রেণি, যার মধ্যে অপর দুই শ্রেণির বৈশিষ্ট্য আছে, কিন্তু সে পুরোপুরি কোনোটিই নয়। ম্যানেজারদের কথা আমরা বললাম। শ্রমিকের মতো তাঁদের অন্যের জন্য কাজ করতে হয়; পুঁজিপতির মতো তাঁরা শ্রমিকের তদারকি ও শোষণে অংশ নেন। মধ্যবিত্তের আরেকটি অংশ হলো মালিক-পরিচালক বা স্বনিয়োজিত ক্ষুদ্র মালিক। তিনি নিজের উৎপাদনের উপায়ের মালিক—এটি পুঁজিপতির বৈশিষ্ট্য।
মেলিসা: তাই তিনি অন্য কারও কাছ থেকে মজুরি নেন না; কার্যত নিজেকেই নিজের শ্রমের দাম দেন।
বিবেক: কিন্তু পুঁজিপতির সঙ্গে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। পুঁজিপতি উৎপাদনের উপায়ের মালিক হলেও অন্যের শ্রম কিনে নেন। তাঁর আয় আসে অন্যের শ্রম থেকে। স্বনিয়োজিত মালিক নিজের যন্ত্র, দোকান বা ব্যবসা নিজেই পরিচালনা করেন; অন্যের শ্রমের ওপর তাঁর আয় দাঁড়িয়ে থাকে না।
ম্যানেজার ও ছোট দোকানমালিক অনেক দিক থেকে আলাদা। একজন পুঁজিপতির বেতনভুক্ত, অন্যজন কারও কাছ থেকে বেতন পান না। তবু তাঁরা একটি জায়গায় এক—কেউই সরাসরি শ্রমিক নন, আবার পূর্ণাঙ্গ পুঁজিপতিও নন।
আধুনিক মধ্যবিত্তের মধ্যে তাই থাকেন ম্যানেজার, পুঁজিপতির অধীনে কাজ করেও শ্রমশোষণ পরিচালনায় সহায়তাকারী পেশাজীবী এবং নিজের উৎপাদনের উপায় নিজে ব্যবহার করা মালিক-পরিচালকেরা। এদের মধ্যে থাকতে পারেন চুল কাটার দোকানের মালিক, ক্ষুদ্র দোকানি, স্বনিয়োজিত প্লাম্বার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
কৃষিসমাজে এদের সমতুল্য হলো মধ্য কৃষক—যিনি নিজের জমির মালিক, নিজেই চাষ করেন, কিন্তু নিয়মিত ভাড়াটে শ্রমিক নিয়োগ করেন না। এই অর্থে ক্ষুদ্র কৃষক ও ছোট দোকানি একই শ্রেণিগত অবস্থানের মানুষ: দুজনই মালিক-পরিচালক।
শ্রমিক শ্রেণি হলো সেই সব মানুষ, যাঁরা মজুরি বা বেতনের বিনিময়ে কাজ করেন এবং অন্য শ্রমিকদের ওপর তাঁদের স্থায়ী তদারকি বা ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা খুব কম অথবা নেই।
সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ
মেলিসা: এই সংজ্ঞায় শ্রমিক শ্রেণির আকার কত বড়? মার্ক্সবাদী যুক্তিতে শ্রমিকেরা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ—এ কারণেই তাঁদের আমূল পুঁজিবাদবিরোধী কর্মসূচির প্রধান শক্তি হিসেবে দেখা হয়।
বিবেক: শ্রমিক শ্রেণির সবচেয়ে সংকীর্ণ সংজ্ঞা নিলে—যাঁদের কোনো তদারকি ক্ষমতাই নেই—পেশাগত শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশকে শ্রমিক বলা যাবে। কিন্তু এই সংজ্ঞা অতিরিক্ত সংকীর্ণ।
অনেক শ্রমিকের কিছু দক্ষতা ও স্বায়ত্তশাসন থাকে। কেউ কেউ নিচু স্তরের সাময়িক সুপারভাইজারও হন। ম্যানেজাররা তদারকি করেন, কিন্তু সব সুপারভাইজার ম্যানেজার নন।
নিয়োগকর্তারা অনেক সময় কর্মীদের মধ্য থেকেই কাউকে সাময়িকভাবে কিছু তদারকি ক্ষমতা দেন। তিনি মূল কাজ বা শপ-ফ্লোরের শ্রম থেকে আলাদা হন না। নতুন ম্যানেজার নিয়োগের খরচ বাঁচানো কিংবা শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরির জন্য তাঁকে সামান্য কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। বাস্তবে তিনি উন্নীত মর্যাদার শ্রমিকই থেকে যান।
সামান্য স্বাধীনতা বা অস্থায়ী তদারকি ক্ষমতার কারণে এই মানুষদের শ্রমিক শ্রেণির বাইরে রাখলে বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে। শ্রমিক আন্দোলন ঐতিহাসিকভাবেও তাঁদের ম্যানেজার মনে করেনি; দক্ষ, স্বায়ত্তশাসিত ও সাময়িক সুপারভাইজার শ্রমিকদের ইউনিয়নের ভেতরেই এনেছে।
তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমশক্তির প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ শতাংশ শ্রমিক শ্রেণির অংশ। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
এই শ্রেণির কেউ উচ্চদক্ষ, কেউ কম দক্ষ; কেউ ইউনিয়নভুক্ত, কেউ নন। তাঁদের মধ্যে প্রকৌশলী, বিমানশিল্পের দক্ষ কর্মী বা অটোমোবাইল শিল্পের উচ্চ বেতনের ইউনিয়ন শ্রমিকও থাকতে পারেন।
মেলিসা: এই শ্রেণিবিশ্লেষণের বিরুদ্ধে একটি প্রচলিত অভিযোগ হলো, এতে শ্রমিক শ্রেণিকে ব্লু-কলার শ্রমিকদের সঙ্গে এক করে দেখা হয়।
বিবেক: এটি বড় ভুল। কেবল নীল-কলার কর্মীদের শ্রমিক ধরলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমশক্তির সংখ্যাগরিষ্ঠকেই পাওয়া যাবে না। মার্ক্সবাদও কখনো শ্রমিক শ্রেণিকে শুধু নীল-কলার কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেনি।
অনলাইনের বামপন্থীদের মধ্যে এমন মত থাকতে পারে, কিন্তু মার্ক্সবাদমার্ক্সবাদ ঊনবিংশ শতা... বা বৃহত্তর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এর কোনো ভিত্তি নেই। আমরা যে সংজ্ঞা দিলাম, তাতেই শ্রমিক শ্রেণি নীল-কলার সীমানা ছাড়িয়ে উচ্চদক্ষ, তুলনামূলক স্বায়ত্তশাসিত ও বেতনভুক্ত কর্মীদের একটি অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
কিম কার্দাশিয়ান ম্যাকডোনাল্ডসে চাকরি নিলেই শ্রমিক হয়ে যাবেন না।
শ্রমিক হওয়ার মানদণ্ড পেশার পোশাক বা মর্যাদা নয়। আপনি অন্যের জন্য কাজ করেন এবং অন্যদের ওপর ব্যবস্থাপনার স্থায়ী ক্ষমতা আপনার নেই—এই দুটি বিষয়ই মুখ্য। ফলে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে উচ্চদক্ষ, উচ্চ বেতনের এবং বেতনভুক্ত কর্মীরাও থাকবেন।
তবে বেতনভুক্ত হলেই সবাই শ্রমিক নন। কেউ মাসিক বেতন পেলেও কার্যত অস্থায়ী বা গিগধর্মী কর্মী হতে পারেন—এক বছরের জন্য কাজ করছেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ব্যবস্থাপনায় ওঠার সুযোগ নেই। তিনি শ্রমিকের অবস্থানেই থাকেন।
আবার কেউ কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিচু পদে ঢুকে জানেন, নিয়ম মেনে আট বা দশ বছর চললে ধাপে ধাপে ম্যানেজার হবেন। শুরুতে তাঁর কাজ শ্রমিকের মতো হলেও ভবিষ্যৎ স্বার্থ তাঁকে আলাদা দিকে টানতে পারে। কর্মীদের পাশে দাঁড়ালে পদোন্নতি আটকে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় তিনি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আপস করবেন।
মেলিসা: কারণ ভবিষ্যতে তিনি কর্মক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা ও বেশি স্বায়ত্তশাসন পাবেন।
বিবেক: তিনি শ্রমিক শ্রেণি থেকে উঠে বুর্জোয়া শ্রেণিতে নয়, ‘সম্মানজনক মধ্যবিত্ত অবস্থানে’ যাবেন।
তাঁর স্বার্থে তখন দুই শ্রেণিরই উপাদান থাকে। প্রতিষ্ঠানের নিচের স্তরে থাকাকালে তিনি সাধারণ কর্মী, কায়িক শ্রমিক বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন এবং শক্তিশালী ইউনিয়নকে নিজের পক্ষেও উপকারী ভাবতে পারেন।
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি জানেন, ইউনিয়নের সঙ্গে দাঁড়ানো তাঁকে পদোন্নতির তালিকায় পেছনে ফেলে দিতে পারে। ফলে ব্যবস্থাপনার পাশে দাঁড়ানোর স্বার্থও তৈরি হয়। মধ্যবিত্ত অবস্থানের সারকথা এখানেই: দুই শ্রেণির বৈশিষ্ট্য থাকায় মানুষটি দুই দিকেই টান অনুভব করেন।
বেতনভুক্ত কর্মীর প্রশ্নেও তাই জটিলতা আছে। বেতন কোনো কর্তৃত্বের সিঁড়ির প্রথম ধাপ হলে এবং সেই সিঁড়ি তাঁকে শোষণ পরিচালনার ক্ষমতার দিকে নিয়ে গেলে তাঁর স্বার্থ সাধারণ শ্রমিকের মতো থাকে না। তাঁকে ঊর্ধ্বমুখী শ্রমিক বলা যেতে পারে—সংগঠিত করতে হলে সেই রূপান্তরের আগেই করতে হবে।
বাস্তবে তাই কিছু অবস্থান গতিশীল। কিন্তু এ কারণে শ্রেণির সংজ্ঞা অস্পষ্ট হয় না। সংজ্ঞা স্থির থাকে; মানুষ সেই কাঠামোর এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে যেতে পারে। বরং স্পষ্ট সংজ্ঞাই এই গতিশীলতা বুঝতে সাহায্য করে।
আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেণিকাঠামো
মেলিসা: শ্রমিক ও মধ্যবিত্তের পার্থক্য পরিষ্কার হলো। এখন আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেণিকাঠামোকে কীভাবে বর্ণনা করবেন?
বিবেক: এটি একটি চেনা ধরনের পুঁজিবাদী শ্রেণিকাঠামো।
মার্ক্সবাদমার্ক্সবাদ ঊনবিংশ শতা... নিয়ে একটি খুব সরলীকৃত ও ভুল ধারণা আছে—মার্ক্সবাদ নাকি পুঁজিবাদে শুধু পুঁজিপতি ও শ্রমিক, এই দুই শ্রেণির কথা বলে। মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয..., মার্ক্সবাদী বা মার্ক্সবাদী ঐতিহ্যে এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। এটি মূলত শীতল যুদ্ধের সময়কার ব্যঙ্গচিত্র, যা সমকালীন বামপন্থার একটি অংশও অজান্তে মেনে নিয়েছে।
ধ্রুপদি মার্ক্সীয় ব্যাখ্যায় পুঁজিবাদে তিনটি শ্রেণি থাকে: শ্রমিক শ্রেণি, বুর্জোয়া—অর্থাৎ পুঁজিপতি শ্রেণি এবং মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্তের মধ্যে অপর দুই শ্রেণির কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, কিন্তু সে পুরোপুরি কোনোটিই নয়।
মার্ক্সবাদীরা আরও বলেছেন, শ্রমিক শ্রেণি সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রে আজও সেটি সত্য। শ্রমশক্তির প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ শতাংশ শ্রমিক।
আমি নির্দিষ্ট সংখ্যা না বলে একটি পরিসর দিচ্ছি, কারণ ধারণাগুলো কীভাবে পরিমাপ করা হবে—এ নিয়ে মার্ক্সবাদমার্ক্সবাদ ঊনবিংশ শতা... ও শ্রেণিতত্ত্বে যৌক্তিক বিতর্ক আছে। তবু ভিন্ন গবেষণা প্রায় একই ফল দেয়। দশটিরও বেশি শ্রেণিবিন্যাসে মোটামুটি একই চিত্র পাওয়া যায়: প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিক শ্রেণি, প্রায় ৩ শতাংশ পুঁজিপতি এবং এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ মধ্যবিত্ত।
সমাজতন্ত্রীদের কাজ তাই এই দুই-তৃতীয়াংশকে সংগঠিত করে আন্দোলনের মেরুদণ্ড বানানো এবং মধ্যবিত্তের যথেষ্ট অংশকে টেকসই মিত্র হিসেবে যুক্ত করা। সামাজিক গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি কেবল শ্রমিকদের নিয়ে সফল হবে না। মধ্যবিত্তের কোন বস্তুগত স্বার্থ একটি বৃহৎ জোটে তাদের টেনে আনতে পারে, সেটি বুঝে কর্মসূচি তৈরি করতে হবে। ধারণাগত কাজটি হলো তাদের স্বার্থ বোঝা; রাজনৈতিক কাজ হলো সেই স্বার্থকে আকৃষ্ট করতে পারে এমন কর্মসূচি নির্মাণ।
মেলিসা: আপনার যুক্তির ভিত্তি হলো—মানুষ কীভাবে জীবিকা অর্জন করে এবং কর্মক্ষেত্রে কতটা ক্ষমতা রাখে, তার ওপর শ্রেণি নির্ভর করে। একই অবস্থান থেকে কিছু সাধারণ স্বার্থও তৈরি হয়।
কিন্তু আধুনিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সব সময় শ্রেণিগত রেখা ধরে এগোয় না। ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের শ্রমিক ও দরিদ্রের দল হিসেবে তুলে ধরলেও দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক ভোট হারাচ্ছে। কেউ ব্যবসায়ী শ্রেণির দল হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকানদের দিকে যাচ্ছে, কেউ রাজনীতি থেকেই সরে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা কি শ্রেণিভিত্তিক ব্যাখ্যার জন্য চ্যালেঞ্জ নয়?
রাজনীতিতে কোনো শর্টকাট নেই
মেলিসা: শ্রমিক শ্রেণিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়তে চাওয়া বামপন্থীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
বিবেক: প্রতিটি পর্বে আমরা যে কথায় ফিরি, সেটিই: এর কোনো শর্টকাট নেই।
এটি গড়ে তুলতে হয় শ্রমজীবী মানুষদের কার্যকর সংগঠনে একত্র করে—শুধু বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক কর্মীদের নয়, বাস্তব শ্রমজীবী মানুষদের। তারপর তাঁদের দেখাতে হয়, রাজনীতি তাঁদের জীবনে ফল দিতে পারে।
রাজনীতি শুধু অভিনয় নয়, মঞ্চে(১৯২৮-১৯৬৭) আর্জেন্টিন... বড় কথা বলা নয়, নৈতিকতার প্রদর্শনী নয়, সব সময় ‘সঠিক’ শব্দ বেছে কথা বলা খোঁজাও নয়। রাজনীতি হলো মানুষের জন্য কিছু অর্জন করা।
অর্জন এলে দুটি পরিবর্তন ঘটে। শ্রমিকেরা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন এবং সংগঠনের প্রাণশক্তিতে পরিণত হন। তখন নিখুঁত ব্যক্তির ওপর নির্ভরতাও কমে।
এখনো আমরা এমন ‘সঠিক’ প্রার্থী খুঁজি, যিনি নিজে থেকেই সব সঠিক কাজ করবেন। বরং ধরে নিতে হবে, অধিকাংশ প্রার্থী তা করবেন না। তাই এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা একদিকে তাঁদের জবাবদিহির মধ্যে রাখবে, অন্যদিকে তাঁরা ব্যর্থ হলে তাঁদের জায়গায় দাঁড়ানোর মতো নতুন প্রার্থী তৈরি করবে।
রাজনীতি তাই নৈতিকভাবে নিখুঁত একজন মানুষ খোঁজার প্রকল্প নয়। আসল কাজ হলো এমন সংগঠন গড়ে তোলা, যা সাধারণ মানুষকে একত্র করবে, নেতাদের জবাবদিহির মধ্যে রাখবে এবং সেই সংগঠিত শক্তি দিয়ে বাস্তব পরিবর্তন আদায় করবে।
লেখক
অনুকূল লিপিকার ক্রিমসন থিওরির একজন গবেষণা সহকারী।





