ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল

কার্ল মার্কসের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সাপ্তাহিক একতা ধারাবাহিকভাবে কার্ল মার্কস, মার্কসবাদ ও তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিভিন্ন লেখা ও দলিল প্রকাশ করবে। এর ধারাবাহিকতায় এই সংখ্যায় ‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল’ প্রবন্ধটি কার্ল মার্কস কর্তৃক ১৮৫৩ সালের ১০ জুন লিখিত `New york Daily Tribune’ পত্রিকায় ৩৮০৪ নং সংখ্যায় ১৮৫৩ সালের ২৫

কার্ল মার্ক্স

কার্ল হাইনরিশ মার্ক্স (৫ মে, ১৮১৮ – ১৪ মার্চ, ১৮৮৩) ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, এবং সমাজবিজ্ঞানী। তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত। মার্ক্সের অন্যতম বিখ্যাত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে তিন খণ্ডের "পুঁজি" এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সাথে যৌথভাবে লেখা "কমিউনিস্ট ইশতেহার"। মার্ক্সের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কে তত্ত্বগুলো মার্ক্সবাদ নামে পরিচিত। তাঁর মতে, ইতিহাসে প্রতিটি সমাজের ভিত্তি ছিল শ্রেণি সংগ্রাম। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এই সংগ্রাম হয় ধনী শাসক শ্রেণি (যারা কলকারখানা ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে) এবং শ্রমজীবী শ্রেণির (যারা কাজ করে বেঁচে থাকার জন্য) মধ্যে। মার্ক্স বলেন, শ্রমিকরা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যে নতুন মূল্য তৈরি করে, তার অনেকটাই পুঁজিপতিরা নিজেরা নিয়ে নেন, আর শ্রমিকরা পায় সামান্য মজুরি। মার্ক্স মনে করতেন, পুঁজিবাদও অন্যান্য পুরনো সমাজব্যবস্থার মতো ধ্বংস হবে, কারণ এর মধ্যেই রয়েছে বিভাজন এবং সংঘর্ষ। পুঁজিবাদ ভেঙে পড়লে সমাজতন্ত্রের জন্ম হবে, যেখানে মজলুম শ্রমজীবী শ্রেণি একত্রিত হয়ে শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করবে এবং একটি শ্রেণিহীন সমাজ গড়ে তুলবে।

আমি ভারত সম্বন্ধে আমার মন্তব্যগুলির খতিয়ান করতে চাই এই প্রবন্ধে।

ইংরেজ প্রভুত্ব ভারতে প্রতিষ্ঠিত হল কী করে? মহা মোগলের একচ্ছত্র ক্ষমতা ভেঙে ফেলেছিল মোগল শাসনকর্তারা। শাসনকর্তাদের ক্ষমতা চূর্ণ করল মারাঠারা। মারাঠাদের ক্ষমতা ভাঙল আফগানরা; এবং সবাই যখন সবার সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত, তখন প্রবেশ করল ব্রিটেন এবং সকলকেই অধীন করতে সক্ষম হলো। দেশটা শুধু হিন্দু আর মুসলমানেই বিভক্ত নয়, বিভক্ত উপজাতিতে, বর্ণাশ্রমজাতিভেদে; এমন একটা স্থিতিসাম্যের ভিত্তিতে সমাজটার কাঠামো গড়ে উঠেছিল যা এসেছে সমাজের সকল সভ্যদের মধ্যস্থ একটা সাধারণ বিরাগ ও প্রথাবদ্ধ পরস্পর বিচ্ছিন্নতা থেকে:- এমন একটা দেশ ও এমন একটা সমাজ, সে কি বিজয়ের এক অবধারিত শিকার হয়েই ছিল না? হিন্দুস্তানের অতীত ইতিহাস না জানলেও অন্তত এই একটি মস্ত ও অবিসংবাদী তথ্য তো রয়েছে যে এমন কি এই মুহূর্তেও ভারত ইংরেজ রাজাভুক্ত হয়ে আছে ভারতেরই খরচে পোষিত এক ভারতীয় সৈন্যবাহিনী দ্বারাই! বিজিত হবার নিয়তি ভারত তাই এড়াতে পারত না; এবং তার অতীত ইতিহাস বলতে যদি কিছু থাকে তো তা সবখানি হল পরপর বিজিত হবার ইতিহাস। ভারত সমাজের কোনো ইতিহাসই নেই– অন্তত জানা কোনো ইতিহাস। ভারতের ইতিহাস বলে যা বলি, সে শুধু একের পর এক বহিরাক্রমণকারীর ইতিহাস, যারা ঐ অপ্রতিরোধী ও অপরির্বতমান সমাজের নিষ্ক্রিয় ভিত্তিতে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে গেছে। ভারত বিজয়ের অধিকার ইংরেজের ছিলো কিনা, এটা তাই প্রশ্ন নয়: প্রশ্ন এই, তুর্কি, পারসীক কি রুশদের দ্বারা ভারত বিজয় কি ব্রিটনদের দ্বারা ভারত বিজয়ের চেয়ে শ্রেয় বলে ভাববো? ভারতবর্ষে এক দ্বিবিধ কর্তব্য পালন করতে হবে ইংল্যান্ডকে; একটি ধ্বংসমূলক এবং অন্যটি উজ্জীবনমূলক– পুরাতন এশীয় সমাজের ধ্বংস এবং এশিয়ায় পাশ্চাত্য সমাজের বৈষয়িক ভিত্তির প্রতিষ্ঠা। আরবি, তুর্কি, তাতার, মোগল যারা একের পর এক ভারত প্লাবিত করেছে তারা অচিরেই হিন্দুভূত হয়ে গেছে; ইতিহাসের এক চিরন্তন নিয়ম অনুসারে বর্বর বিজয়ীরা নিজেরাই বিজিত হয়েছে তাদের প্রজাদের উন্নততর সভ্যতায়। ব্রিটিশেরাই হল প্রথম বিজয়ী যারা হিন্দু সভ্যতার চেয়ে উন্নত এবং সেই হেতু তার কাছে অনবিগম্য। দেশীয় গোষ্ঠীগুলিকে ভেঙে দিয়ে, দেশীয় শিল্পকে উন্মুলিত করে এবং দেশীয় সমাজে যা কিছু মহৎ ও উন্নত ছিল তাকে সমতল করে দিয়ে ব্রিটিশেরা সে সভ্যতাকে চূর্ণ করে। তাদের ভারত শাসনের ঐতিহাসিক পাতাগুলো থেকে এই ধ্বংসের অতিরিক্ত কিছু পাওয়া যায় না বললেই হয়। স্তূপাকৃতি ধ্বংসের মধ্য থেকে উজ্জীবনের ক্রিয়া প্রায় লক্ষ্যেই পড়ে না। তা সত্ত্বেও সে ক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এ উজ্জীবনের প্রথম শর্ত হল ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য– মোগল-ই-আজম আমলের চেয়েও তা বেশি সংহত ও দূরপ্রসারিত। ব্রিটিশ তরবারি দ্বারা আরোপিত সেই ঐক্য এখন বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ দ্বারা দৃঢ়ীভূত ও স্থায়ী হবে। দেশীয় যে সৈন্যবাহিনী ব্রিটিশ ট্রিল-সার্জেন্টদের দ্বারা সংগঠিত ও সুশিক্ষিত হয়ে উঠেছে তা ভারতীয় আত্মমুক্তির এবং বহিরাগত যে কোনো আক্রমণকারীর শিকার হওয়া থেকে অব্যাহতির নামান্তর। এশীয় সমাজে এই প্রথম প্রবর্তিত এবং হিন্দু ইউরোপীয়ের সন্তানদের দ্বারা যা প্রধানত পরিচালিত সেই স্বাধীন সংবাদপত্র হল সেই সমাজের পুননির্মাণের এক নতুন ও শক্তিশালী কারিকা। জমিদার ও রায়তোয়ার যত ঘৃণাই হোক, তারা হল জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার দুটি বিশেষ রূপ যা এশীয় সমাজের মহান অপেক্ষিত আবশ্যিকতা। কলকাতায় ইংরেজদের তত্ত্বাবধানে অনিচ্ছাভরে ও কার্পণ্য সহকারে শিক্ষিত ভারতের দেশীয় অধিবাসীদের মধ্য থেকে নতুন একটি শ্রেণি গড়ে উঠছে যারা শাসন পরিচালনার যোগ্যতাসম্পন্ন এবং ইউরোপীয় বিজ্ঞানে সুশিক্ষিত। ইউরোপের সঙ্গে ভারতের দ্রুত ও নিয়মিত যোগাযোগ এনে দিয়েছে বাষ্প, ভারতের প্রধান প্রধান বন্দরগুলিকে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্বে মহাসমুদ্রের বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং ভারতের অচলায়তনের যা প্রাথমিক কারণ সেই বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে তাকে পুনরুত্থিত করেছে। সেদিন দূরে নয়, যখন রেলওয়ে ও বাষ্পীয় পোতের সমন্বয়ে ভারত ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার দূরত্ব সময়ের পরিমাপে কমে আসবে আট দিনে এবং এই একদা-রূপকথার দেশটা এইভাবে সত্য করেই পাশ্চাত্য জগতের অন্তর্ভুক্ত হবে। ভারতের প্রগতিতে এতদিন পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনের শাসক শ্রেণিগুলির যা স্বার্থ ছিল সেটা নিতান্ত আকস্মিক, অস্থায়ী ও ব্যতিরেকমূলক। অভিজাত শ্রেণি চেয়েছিল জয়, ধনপতিরা চেয়েছিল লুণ্ঠন এবং মিলতন্ত্রীরা চেয়েছিল সস্তায় বেচে বাজার দখল। কিন্তু এখন অবস্থা উল্টে গেছে। মিলতন্ত্রীরা আবিষ্কার করেছে যে উৎপাদনশীল দেশ রূপে ভারতের রূপান্তর তাদের কাছে একান্ত জরুরি এবং সেই জন্য সর্বাগ্রে সেচ ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন-ব্যবস্থা তাকে দিতে হবে। এখন তাদের অভিপ্রায় ভারতের উপর রেলওয়ের এক জাল বিস্তার করা। এবং সে কাজ তারা করবেই। তার ফল অপরিমেয় হতে বাধ্য। এ কথা অতি সুবিদিত যে, ভারতের উৎপাদন-শক্তি পঙ্গু হয়ে আছে তার বিভিন্ন উৎপাদন-দ্রব্যের পরিবহন ও বিনিময় ব্যবস্থার একান্ত অভাবে। বিনিময় ব্যবস্থার অভাবের জন্যে প্রাকৃতিক প্রাচুর্যের মাঝখানে এমন সামাজিক নিঃস্বতা ভারতের চেয়ে বেশি আর কোথাও দেখা যায় না। ১৮৪৮ সালে ব্রিটিশ কমন্স সভার একটি কমিটির কাছে প্রমাণিত হয়েছিল যে, ‘খান্দেশে যখন এক কোয়ার্টার শস্য বিক্রি হচ্ছিল ৬ থেকে ৮ শিলিং মূল্যে তখন পুনায় তা বিক্রি হচ্ছিল ৬৪ থেকে ৭০ শিলিং দামে– সেখানে লোকে দুর্ভিক্ষে মরে পড়ে থাকছিল রাস্তায়, খান্দেশ থেকে সরবরাহ আসার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, কেননা কাঁচা রাস্তায় গাড়ি অচল।’ যেখানে রেলপথ-বাঁধের প্রয়োজনে মাটি দরকার সেখানে পুকুর খুঁড়ে এবং বিভিন্ন লাইন বরাবর অঞ্চলে জল সরবরাহ করে রেলওয়ের প্রবর্তনকে সহজেই কৃষি-উদ্দেশ্যের সহায়ক করে তোলা সম্ভব। এইভাবে প্রাচ্যের চাষ ব্যবস্থার যা অপরিহার্য শর্ত সেই সেচ ব্যবস্থা প্রভূত পরিমাণে বিস্তৃত করা যেতে পারে এবং জলাভাবে বারবার দেখা দেয়া স্থানীয় দুর্ভিক্ষগুলিকে রোধ করা সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রেলওয়ের অসাধারণ গুরুত্ব স্পষ্ট হবে যদি মনে রাখি এমন কি ঘাটের নিকটবর্তী জেলাগুলিতে সেচহীন জমিগুলির তুলনায় সেচ দেওয়া জমিগুলির কর তিন গুণ, কর্মসংস্থান দশ-বারো গুণ এবং মুনাফা বারো থেকে পনেরো গুণ বেশি। রেলওয়ের ফলে সামরিক ব্যবস্থার আয়তন ও ব্যয় কমানোর উপায় হবে। ফোর্ট সেন্ট উইলিয়ামের সেনাপতি কর্নেল ওয়ারেন কমন্স সভার সিলেক্ট কমিটির নিকট বলেন: ‘বর্তমানে যত দিন এমন কি যত সপ্তাহ দরকার হয়, মাত্র তত ঘণ্টার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংবাদ পেয়ে যাওয়া এবং আগের চেয়ে আরো কম সময়ের মধ্যে সৈন্য ও গোলাবারুদসহ নির্দেশ প্রেরণের সম্ভাব্যতা, এ বিবেচনা একটুও ছোট করে দেখা চলে না। বর্তমান অপেক্ষা আরো দূরবর্তী ও স্বাস্থ্যকর অঞ্চলগুলিতে সৈনাদের রাখা যাবে এবং এতে করে রোগজনিত জীবনহানি বহু পরিমাণে কমানো যাবে। বিভিন্ন স্তিপোতে রসদের এত বেশি প্রয়োজন থাকবে না, এবং জলবায়ুর কারণে রসদের ক্ষয়ক্ষতি ও নাশ পরিহার করা সম্ভব হবে। সৈন্যবাহিনীর কার্যকরিতা বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ অনুপাতে কমানো যাবে সৈন্যসংখ্যা।’ আমরা জানি, গ্রাম-গোষ্ঠীগুলির নিজেদের পরিচালিত সংগঠন ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে গেছে, কিন্তু এগুলির যা সর্বমন্দ দিক– বাঁধি-গৎ ও বিচ্ছিন্ন কণিকায় সমাজের বিচূর্ণাভবন, সেটার প্রাণশক্তি এখনো বজায়। গ্রামগুলির বিচ্ছিন্নতা থেকে যা সৃষ্টি ভারতে পথঘাটের অভাব এবং পথঘাটের অভাবের ফলে গ্রামগুলির বিচ্ছিন্নতা হয়েছে চিরস্থায়ী। নিম্নতম মাত্রার সুযোগ-সুবিধার ওপর, গ্রাম গ্রামন্তরের সঙ্গে প্রায় কোনো যোগাযোগ ছাড়াই এবং সামাজিক অগ্রগতির জন্যে যা অপরিহার্য তেমন আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টা ব্যতিরেকেই এক একটি গোষ্ঠীর এমনি পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার নিম্নতম।
আমরা জানি, গ্রাম-গোষ্ঠীগুলির নিজেদের পরিচালিত সংগঠন ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে গেছে, কিন্তু এগুলির যা সর্বমন্দ দিক– বাঁধি-গৎ ও বিচ্ছিন্ন কণিকায় সমাজের বিচূর্ণাভবন, সেটার প্রাণশক্তি এখনো বজায়। গ্রামগুলির বিচ্ছিন্নতা থেকে যা সৃষ্টি ভারতে পথঘাটের অভাব এবং পথঘাটের অভাবের ফলে গ্রামগুলির বিচ্ছিন্নতা হয়েছে চিরস্থায়ী। নিম্নতম মাত্রার সুযোগ-সুবিধার ওপর, গ্রাম গ্রামন্তরের সঙ্গে প্রায় কোনো যোগাযোগ ছাড়াই এবং সামাজিক অগ্রগতির জন্যে যা অপরিহার্য তেমন আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টা ব্যতিরেকেই এক একটি গোষ্ঠীর এমনি পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার নিম্নতম মাত্রায় বেঁচে এসেছে। গ্রাম-গোষ্ঠীগুলির এই স্বপর্যাপ্ত জাড্যা ভেঙে দিয়ে ছিল ব্রিটিশরা রেলপথে মেটাবে যোগাযোগ ও আদান-প্রাদানের নতুন অভাববোধ। তাছাড়া, রেলপথ ব্যবস্থার অন্যতম ফল হবে– রেলপথের নিকটবর্তী প্রত্যেকটি গ্রামে অন্যান্য দেশের যন্ত্রপাতি ও কারিগারি জ্ঞান এবং সে জ্ঞান লাভের উপায় সুলভ হবে। তার ফলে প্রথমত ভারতের বংশানুক্রমিক ব্যক্তিভোগী গ্রাম্য কারিগরের পুরো যোগ্যতার পরখ হবে এবং অতঃপর তার ত্রুটি দূরীকরণে সাহায্য হবে। (চ্যাপম্যান, ‘ভারতের তুলা ও বাণিজ্য’। আমি জানি যে, ইংরেজ মিলতন্ত্রীরা ভারতকে রেলপথে বিভূষিত করতে ইচ্ছুক শুধু এই লক্ষ্য নিয়ে যাতে তাদের কলকারখানার জন্যে কম দামে তুলা ও অন্যান্য কাঁচামাল নিষ্কাশিত করা যায়। কিন্তু যে দেশটায় লোহা আর কয়লা বর্তমান সে দেশের গতিপথে যদি একবার যন্ত্রের প্রবর্তন করা যায় তাহলে সে যন্ত্র তৈরির ব্যবস্থা থেকে তাকে সরিয়ে রাখা অসম্ভব। রেল চলাচলের আশু ও চলতি প্রয়োজন মেটাবার জন্যে যা দরকার সে সব শিল্প ব্যবস্থা না করে বিপুল এক দেশের ওপর রেলপথের জাল-বিস্তার চালু রাখা যাবে না এবং তার মধ্য থেকেই গড়ে উঠবে শিল্পের এমন সব শাখায় যন্ত্রশিল্পের প্রয়োগ, রেলপথের সঙ্গে যার আশু সম্পর্ক নেই। তাই এই রেলপথই হবে ভারতে সত্যকার আধুনিক শিল্পের অগ্রদূত। এ যে নিশ্চয় তা আরো স্পষ্ট এই কারণে যে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নিজেরাই স্বীকার করে একেবারে নতুন ধরনের শ্রম-ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া এবং যন্ত্র সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করার মতো বিশেষ যোগ্যতা হিন্দুদের আছে। কলকাতা টাঁকশালে যে দেশীয় মেকানিকরা অনেক বছর ধরে বাষ্পীয় যন্ত্রে কাজ করছেন তাঁদের সামর্থ্য ও নৈপুণ্য, হরিদ্বার কয়লা অঞ্চলে কতকগুলি বাষ্পীয় যন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশীয়গণ এবং অন্যান্য দৃষ্টান্ত থেকে এ ঘটনার প্রভূত প্রমাণ পাওয়া যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুসংস্কারে ভয়ানক প্রভাবিক হওয়া সত্ত্বেও মিঃ ক্যাম্পবেল স্বয়ং স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, ‘ভারতের বিপুল জনগণের মধ্যে প্রভূত শিল্প-ক্ষমতা বর্তমান পুঁজি সঞ্চয়ের মতো যোগ্যতা তাদের বেশ আছে, গাণিতিকভাবে তাদের মাথা পরিচ্ছন্ন এবং অঙ্ক ও গাণিতিক বিজ্ঞানাদিতে তাদের প্রতিভা অতি উল্লেখযোগ্য।’ উনি বলছেন, ‘এদের মেধা চমৎকার’ (৬২)। রেল ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত অধুনিক শিল্পের ফলে শ্রমের বংশানুক্রমিক যে ভাগাভাগির উপর ভারতের জাতিভেদপ্রথার ভিত্তি, ভারতীয় প্রগতি ও ভারতীয় ক্ষমতার সেই চূড়ান্ত প্রতিবন্ধক ভেঙে পড়বে। ইংরেজ বুর্জোয়ারা বাধ্য হয়ে যা কিছুই করুক তাতে ব্যাপক জনগণের মুক্তি অথবা তাদের সামাজিক অবস্থার বাস্তব সংশোধন ঘটবে না– এগুলি শুধু উৎপাদন-শক্তির বিকাশের ওপরেই নয়, জনগণ কর্তৃক তাদের স্বত্ব-গ্রহণের ওপরেও নির্ভরশীল। কিন্তু এ দুটি জিনিসের জন্যেই বৈষয়িক পূর্বশর্ত স্থাপনের কাজ ইংরেজ বুর্জোয়ারা না করে পারবে না। তার বেশি কি বুর্জোয়ারা কখনো কিছু করেছে? রক্ত আর কাদা, দীনতা ও হীনতার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিবর্গ ও জাতিকে চেনে না নিয়ে বুর্জোয়ারা কি কখনো কোনো অগ্রগতি ঘটিয়েছে? খাস গ্রেট ব্রিটেনেই যতদিন না শিল্পকারখানার প্রলেতারিয়েত কর্তৃক তার বর্তমান শাসক শ্রেণি স্থানচ্যুত হচ্ছে অথবা হিন্দুরা নিজেরাই ইংরেজের জোয়াল একেবারে ঝেড়ে ফেলার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী যতদিন না হচ্ছে ততদিন ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ বুর্জোয়া কর্তৃক ছড়িয়ে দেয়া এই সব নতুন সমাজ-উপাদানের ফল ভারতীয়রা পাবে না। যাই হোক নিঃসন্দেহে আশা করতে পারি, ন্যূনাধিক সুদূর ভবিষ্যতে দেখবো এই মহান ও চিত্তাকর্ষক দেশটির পুনরুজ্জীবন, সেই দেশ যেখানকার এমন কি হীনতম শ্রেণিগুলির ক্ষেত্রেও শিষ্ট দেশবাসীরা- প্রিন্স সালতিকভের ভাষায়– ‘sont plus fins et plus adroits que les italiens’, যাদের পরাধীনতাও এক ধরনের শান্ত মহত্ত্ব দ্বারা প্রতিতুলিত (counterbalanced) স্বাভাবিক অনীহা সত্ত্বেও যারা ব্রিটিশ অফিসারদের চমৎক্বত করেছে তাদের সাহস দেখিয়ে, যাদের দেশটা হল আমাদের ভাষা ও আমাদের ধর্মের উৎসভূমি, এবং যাদের জাটদের মধ্যে আমরা পাই প্রাচীন জার্মান ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে প্রাচীন গ্রিকদের প্রতিরূপ। উপসংহারের কিছু মন্তব্য না দিয়ে ভারত প্রসঙ্গে ছেদ টানতে পারছি না। স্বদেশে যা ভদ্ররূপ নেয় এবং উপনিবেশে গেলেই যা নগ্ন হয়ে আত্মপ্রকাশ করে সেই বুর্জোয়া সভ্যতার প্রগাঢ় কপটতা এবং অঙ্গাঙ্গি বর্বরতা আমাদের সামনে অনাবত। বুর্জোয়ারা নিজেদের সম্পত্তির সমর্থক বলে দেখায় কিন্তু বাংলায় মাদ্রাজে ও বোম্বাইয়ে যে রকম কৃষি বিপ্লব হল তেমন কৃষি বিপ্লব কি কোনো বৈপ্লবিক দল কখনো সৃষ্টি করেছে? দস্যুচূড়ামণি স্বয়ং লর্ড ক্লাইভের ভাষায়, ভারতবর্ষে যখন কেবল দুর্নীতি দিয়ে লালসার তাল ধরা যাচ্ছিল না, তখন কি ওরা নৃশংস জবরদস্তির পথ নেয় নি? জাতীয় ঋণের অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতার কথা নিয়ে ওরা যখন ইউরোপে বাগাড়ম্বর করছে তখন ভারতে কি তারা রাজাদের ডিভিডেন্ট বাজেয়াপ্ত করে নি– কোম্পানির নিজস্ব তহবিলেই যারা তাদের ব্যক্তিগত সঞ্চয় ঢেলেছিল: ‘আমাদের পবিত্র ধর্ম’ রক্ষার অছিলায় ওরা যখন ইউরোপে ফরাসী বিপ্লবের বিরুদ্ধে লড়ছিল তখন একই সময়ে কি তারা ভারতে খ্রিষ্টধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ করে দেয় নি এবং উড়িষ্যা ও বাংলার মন্দিরগুলিতে ধাবমান তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে টাকা তোলার জন্যে জগন্নাথের মন্দিরে অনুষ্ঠিত হত্যা ও গণিকাবৃত্তির ব্যবসায় চালায় নি? ‘সম্পত্তি, শৃঙ্খলা, পরিবার ও ধর্মের’ ধ্বজাধারী হল এরাই। ইউরোপ-সদৃশ বিপুল ১৫ কোটি একর এক ভূখণ্ডের দেশ ভারতবর্ষের প্রসঙ্গে দেখলে ব্রিটিশ শিল্পের বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া সুস্পষ্ট এবং হতভম্ব করার মতো। কিন্তু ভোলা উচিত নয়, বর্তমানে যেভাবে সমগ্র উৎপাদন পদ্ধতি সংগঠিত এ হল তারই অঙ্গাঙ্গি ফলাফল। এ উৎপাদন দাঁড়িয়ে আছে পুঁজির চূড়ান্ত প্রভুত্বের ওপর। স্বাধীন শক্তি হিসেবে পুঁজির অস্তিত্বের জন্যে পুঁজির কেন্দ্রীভবন অত্যাবশ্যক। বর্তমানে প্রতিটি সুসভ্য শহরে অর্থশাস্ত্রের যে অন্তর্নিহিত অঙ্গাঙ্গি নিয়মগুলি কাজ করছে বিশ্বের বাজারের ওপর এ কেন্দ্রীভবনের বিধ্বংসী প্রভাব শুধু সেই নিয়মগুলিকেই উদঘাটিত করছে বিপুলতম আকারে। ইতিহাসের বুর্জোয়া যুগটার দায়িত্ব নতুন জগতের বৈষয়িক ভিত্তি সৃষ্টি করা– একদিকে মানবক্তাতির পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বময় যোগাযোগ এবং সে যোগাযোগের উপায়: অন্যদিকে মানুষের উৎপাদন-শক্তির বিকাশ এবং প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের ওপর বৈজ্ঞানিক আধিপত্যরূপে বৈষয়িক উৎপাদনের রূপান্তর। ভূতাত্ত্বিক বিপ্লবে যেমন পৃথিবীর উপরিতল গঠিত হয়েছে, তেমনি বুর্জোয়া শিল্প ও বাণিজ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন জগতের এই সব বৈষয়িক শর্ত। বুর্জোয়া যুগের ফলাফল, বিশ্বের বাজার এবং আধুনিক উৎপাদন-শক্তিকে যখন এক মহান সামাজিক বিপ্লব কব্জা করে নেবে এবং সর্বোচ্চ প্রগতিসম্পন্ন জাতিগুলির জনগণের সাধারণ নিয়ন্ত্রণে সেগুলো টেনে আনবে, কেবল তখনই মানব প্রগতিকে সেই বিকটাকৃতি আদিম দেবমূর্তির মতো দেখাবে না যে নিহতের মাথার খুলিতে ছাড়া সুধা পান করতে চায় না।

লেখকবৃন্দ

কার্ল হাইনরিশ মার্ক্স (৫ মে, ১৮১৮ – ১৪ মার্চ, ১৮৮৩) ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, এবং সমাজবিজ্ঞানী। তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত। মার্ক্সের অন্যতম বিখ্যাত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে তিন খণ্ডের "পুঁজি" এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সাথে যৌথভাবে লেখা "কমিউনিস্ট ইশতেহার"। মার্ক্সের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কে তত্ত্বগুলো মার্ক্সবাদ নামে পরিচিত। তাঁর মতে, ই...

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন

Scroll to Top