অনেক ডানপন্থী বুদ্ধিজীবীর পাশাপাশি এডওয়ার্ড সাঈদের মতো বামপন্থীদের মধ্য থেকেও মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... ও এঙ্গেলসকে ইউরোসেন্ট্রিক (ইউরোপকেন্দ্রিক) বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মতে, মার্কস ও এঙ্গেলস(১৮২০-১৮৯৫) কার্ল মার্ক... রাজনীতির গুরুত্ব কমিয়ে ইতিহাসকে শুধু অর্থনৈতিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ করেছেন। এডওয়ার্ড সাঈদ যুক্তি দেখান যে, মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... আধুনিক বিশ্ব গঠনে ও সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় উপনিবেশবাদ, বর্ণ এবং পরিচয়ের প্রশ্নগুলোকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেননি, ফলে এসব উপাদানের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব তাঁর বিশ্লেষণে আড়াল হয়ে গেছে। কেভিন অ্যান্ডারসনের ‘মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... এ্যাট দ্য মার্জিনস’ বইটি এই সমস্ত অভিযোগের যথার্থ জবাব দিয়েছেন।
ইউরোপকেন্দ্রিকতার অভিযোগটি আংশিকভাবে মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... ও এঙ্গেলসের ব্যবহৃত কিছু বিতর্কিত শব্দের ওপর নির্ভর করলেও, এই অভিযোগটির মূল ধারণা হলো, মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... সমাজ প্রগতির ধারাকে পশ্চিমা অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং মনে করেছিলেন যে বিশ্বের বাকি অংশও ইউরোপের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। যাকে অ্যান্ডারসন ‘একরৈখিক’ পথ বলে চিহ্নিত করেছেন। অ্যান্ডারসন তার লেখায় মার্ক্সের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের জবাব দেয়ার পাশাপাশি এটাও দেখিয়েছিলেন প্রকৃত সত্যটা আসলে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রথমদিককার একজন চিন্তক। মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... তার জীবনে এমন বহু রাজনৈতিক সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, যেগুলো অনেক বামপন্থীরাই উপেক্ষা করে গেছেন। মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... ও এঙ্গেলসের লেখা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়—তাঁরা ঔপনৈবেশিকতার বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে মানবমুক্তির বৃহত্তর লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলেই মনে করতেন।
মার্ক্সের বিরুদ্ধে ইউরোপকেন্দ্রিকতার যে অভিযোগ তার অন্যতম একটি কারণ কমিউনিস্ট ইশতেহারের প্রচলিত ব্যাখ্যা। ইশতেহারের প্রথম অংশ পুঁজিবাদের কিছু অর্জনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন এটি কীভাবে বিচ্ছিন্নতা দূর করে, প্রযুক্তিগত উন্নতি আনে এবং উদ্বৃত্ত (সারপ্লাস) উৎপাদন করে। তেমনই একটি অবজ্ঞাপূর্ণ বাক্যে মার্কস বলেছেন, পুঁজিবাদ ‘এমনকি সবচেয়ে বর্বর জাতিগুলোকেও সভ্যতার দিকে টেনে আনে’ (পৃষ্ঠা ৯)। অ্যান্ডারসন বলেন, এ ধরনের বিচ্ছিন্ন মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... সবসময় তাঁর সময়ের প্রচলিত কুসংস্কার থেকে ভাষাগতভাবে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে পারেননি। তবে এসব সামান্য ভাষাগত বিচ্যুতি তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তেমন অর্থবহ কিছু জানায় না।
উপনিবেশিকতার প্রশ্নে মার্ক্সের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সমালোচনাটি মূলত ১৮৫০ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘দ্য ব্রিটিশ রুল ইন্ডিয়া’ কে ঘিরে। এডওয়ার্ড সাঈদ, এই প্রবন্ধে ‘ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ভারতবর্ষে সভ্যতা নিয়ে এসেছে’ এ রকম একটি মনোভাবের প্রতি মার্ক্সের নরম মনোভাবের সমালোচনাকান্ত তার আদর্শবাদী দর... করেছেন। তবে, আইজাজ আহমেদ তার লেখায় সাঈদের এই সমালোচনাকে ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদী উপনিবেশবিরোধীতা’ বলে উল্লেখ করেছেন (পৃষ্ঠা ২২)।
উত্তরাধুনিক ধাঁচ’ বলার অর্থ হলো—সাঈদ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে মূলত সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও পরিচয়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রেখেছেন, অথচ তিনি সামাজিক-অর্থনৈতিক শোষণ এবং সেই শোষণের বিরুদ্ধে বাস্তব রাজনৈতিক সংগ্রামের গুরুত্বকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছেন। আইজাজ আহমেদের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি সমস্যাজনক, কারণ এটি ভারতের মতো সমাজে বিদ্যমান জাতিভিত্তিক নিপীড়ন ও বর্ণবৈষম্যের মতো অভ্যন্তরীণ শোষণের কাঠামোগুলোকে আড়াল করে দেয়। অর্থাৎ, কেবল উপনিবেশবাদী শক্তির বিরোধিতা করলেই যথেষ্ট নয়—সমাজের ভেতরে থাকা জাতিভেদ, বর্ণবাদ, শ্রেণিশোষণ ইত্যাদির বিরুদ্ধেও সংগ্রাম চালাতে হয়। মার্কস এবং তৎকালীন বহু প্রগতিশীল ভারতীয় বুদ্ধিজীবী ও কর্মী এই বিষয়টি স্পষ্টভাবেই বুঝতেন এবং জাতিভিত্তিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সামাজিক মুক্তির অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতেন।
পরবর্তীতে, যখন মার্কস উন্নয়ন বা বিকাশ প্রশ্নে আরও গভীরভাবে মনোযোগ দিতে শুরু করেন, তখন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমেই আরও দ্বান্দ্বিক (dialectical) হয়ে ওঠে। প্রাথমিক লেখায় তিনি অনেক সময় ইউরোপীয় শিল্পপুঁজিবাদের অগ্রগতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে মানবসভ্যতার স্বাভাবিক অগ্রগতি হিসেবে দেখেছিলেন, কিন্তু পরে তিনি উপলব্ধি করেন যে উন্নয়ন কোনো একরৈখিক বা সর্বজনীন ধারা নয়। উন্নয়ন বরং বৈষম্যমূলক, দ্বন্দ্বপূর্ণ এবং শোষণমূলক সম্পর্কের ভেতর দিয়ে গঠিত হয়। তিনি লক্ষ্য করতে শুরু করেন, উপনিবেশবাদ যেসব দেশে প্রবেশ করেছে, সেখানে এটি পুরনো সামাজিক কাঠামো ধ্বংস করলেও নতুন কোনো মুক্তিকামী সমাজ গড়ে তুলছে না; বরং শোষণের নতুন রূপ প্রতিষ্ঠা করছে।
এই কারণেই ১৮৫৩ সালে—যেই বছর তিনি The British Rule in India লেখেন—সেই একই বছরে আরেকটি প্রবন্ধে তিনি ভারতীয় সমাজের পরিবর্তনকে কেবল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ‘উন্নয়নমূলক অবদান’ হিসেবে না দেখে, বরং ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও প্রতিরোধের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। এই পরিবর্তন ছিল মার্কসের চিন্তায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের ভিত্তি তৈরি করে। তিনি বলেন:
এই প্রসঙ্গে, ইরফান হাবিব বলেন যে, এই লেখাগুলো থেকে বোঝা যায় যে মার্কস কেবল ব্রিটিশ শ্রমিকদের জন্য উপনিবেশিত জনগণের মুক্তিকে লক্ষ্য হিসেবে দেখেননি—যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ—বরং তিনি মনে করতেন যে ভারতের জাতীয় মুক্তি এমনও হতে পারে যে এটি ইউরোপীয় শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির আগে আসবে। তাঁর মতে, “এমন দূরদৃষ্টি এবং দার্শনিক দৃষ্টি শুধু মার্কসের কাছ থেকেই সম্ভব ছিল” (পৃ.২৩)।
ভারত নিয়ে মার্কসের পরবর্তী লেখাগুলোতেও উপনিবেশবাদের ভয়াবহতার প্রতি তাঁর ক্রমশ বাড়তে থাকা ক্ষোভ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন যে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম ও পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রাম একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসনকে কাঁপিয়ে দেয়া মহান সিপাহী বিদ্রোহের পর, এঙ্গেলসকে লেখা এক চিঠিতে মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... লিখেছিলেন, “ভারত এখন আমাদের সবচেয়ে বড় মিত্র” (পৃষ্ঠা ৪১)।
অ্যান্ডারসন দেখিয়েছেন যে মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... ও এঙ্গেলস(১৮২০-১৮৯৫) কার্ল মার্ক... সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমর্থন তাঁদের চিন্তাধারায় কোনো বাড়তি বা গৌণ বিষয় ছিল না—বরং তাঁদের কৌশলগত ভাবনারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, পোল্যান্ডের জনগণ এবং রাশিয়ার অন্যান্য নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীর মুক্তিকে মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখতেন। ১৮৬৪ সালে তিনি তাদের পরাজয়কে ইতিহাসের বড় এক আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেন: “পোলিশ বিদ্রোহের দমন এবং ককেশাসকে দখল করা—আমি মনে করি ১৮১৫ সালের পর ইউরোপে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনা” (পৃষ্ঠা ৬৬)।
একইভাবে, মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে চলা সংগ্রামের প্রবল সমর্থক ছিলেন। দাসদের নিজেদের প্রতিরোধ ও লড়াই তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। এঙ্গেলসকে লেখা এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “আমার মতে, আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো—একদিকে আমেরিকার দাসদের আন্দোলন, যা ব্রাউনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে, আর অন্যদিকে রাশিয়ার দাসদের মধ্যে যে আন্দোলন চলছে” (পৃষ্ঠা ৮৫)।
আমেরিকান গৃহযুদ্ধ, ইউরোপে দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে আন্দোলন এবং পোলিশ বিদ্রোহ—এই সব মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনালের জন্ম দেয়। ইন্টারন্যাশনালের উদ্বোধনী ভাষণে মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... উল্লেখ করেন, ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির দৃঢ় প্রতিবাদই “ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলকে আটলান্টিকের ওপারে দাসপ্রথা টিকিয়ে রাখার জন্য এক লজ্জাজনক ধর্মযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে বিরত করেছে” (পৃষ্ঠা ১০৮)।
মার্ক্সের বিরুদ্ধে পশ্চিমা উন্নয়ন মডেল চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগটিও আসলে ভিত্তিহীন। অ্যান্ডারসন তাঁর উপেক্ষিত সাংবাদিকতা ও নোটবইগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... ভারত, রাশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার সামাজিক কাঠামো ও উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে গভীর গবেষণা করেছিলেন। আসলে, মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... রাশিয়ায় সাম্প্রদায়িক কৃষি ব্যবস্থার ভেতর থেকেই সমাজতন্ত্রের দিকে একটি ভিন্নধর্মী উন্নয়নপথের সম্ভাবনা দেখেছিলেন—যা ইউরোপীয় শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে মিলিয়ে এগোতে পারত। তিনি এমন লেখকদের সঙ্গে বিতর্ক করেছিলেন যারা মনে করতেন এশিয়ায় কেবল সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্কই ছিল। মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... এর বিপরীতে যুক্তি দেন যে এশিয়ার সমাজ ছিল ভিন্নধর্মী এক ব্যবস্থা, যাকে তিনি ‘এশীয় পদ্ধতি’ নামে উল্লেখ করেন—যার কোনো সরাসরি সমান্তরাল পশ্চিমা ইতিহাসে নেই।
মার্কসের “এশীয় পদ্ধতি” নিয়ে অনেক সমালোচনাকান্ত তার আদর্শবাদী দর... হয়েছে। কিন্তু অ্যান্ডারসন দেখিয়েছেন যে এই বিষয়ে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল জটিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে। তাঁর প্রথম দিকের লেখায় তিনি ভারতীয় গ্রামের সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থাকে “প্রাচ্য স্বৈরাচারের” ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু ১৮৫৭ সালের পর, যখন তিনি গ্রুন্ড্রিসে লিখছিলেন, তখন তিনি এই ব্যবস্থাগুলোকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করেন। আধুনিক শ্রমিক শ্রেণির অসহায় ও বিচ্ছিন্ন অবস্থার বিপরীতে তিনি এগুলোকে এক ধরনের বিকল্প সম্ভাবনা হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক ধ্বংস না হয়ে বরং পুঁজিবাদের অগ্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে।
মার্কসের জাতীয় স্বনির্ভরতার প্রতি সমর্থন এবং অনুন্নত বিশ্বের অগ্রগতির প্রতি তাঁর আশাবাদ কাকতালীয় ছিল না। এগুলো এসেছিল তাঁর পুঁজিবাদবিরোধী মৌলিক অবস্থান থেকে। উদাহরণ হিসেবে আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ প্রচারণাকে ধরা যায়—যা তিনি ব্রিটেনে শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছিলেন। লন্ডনে ইন্টারন্যাশনালের জেনারেল কাউন্সিলের কাজে তিনি বলেছিলেন, “ইংরেজ শ্রমিকদের বোঝাতে হবে যে, আয়ারল্যান্ডের মুক্তি কেবল ন্যায়বিচার বা মানবিকতার প্রশ্ন নয়, বরং তাদের নিজেদের মুক্তির প্রথম শর্ত” (পৃষ্ঠা ১৫০)। মার্কস বিশ্বাস করতেন যে, সমাজব্যবস্থাকে শিকড়সহ উপড়ে ফেলার জন্য যেকোনো আন্দোলনকে স্বাগত জানানো উচিত, যদি তা শাসক শ্রেণির ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
এ থেকেই বোঝা যায়, মার্কস ইউরোপকেন্দ্রিক ছিলেন—এই অভিযোগ সত্য নয়। তাঁর বিশ্লেষণ তাঁকে কোনো যান্ত্রিক ধাপতত্ত্বে আটকে রাখেনি; বরং তাঁকে নিয়ে গেছে পুঁজিবাদী উন্নয়নের বৈপরীত্য ও অসমতার গভীর বোঝাপড়ায়। তিনি তাঁর সময়ের অন্য যেকোনো পশ্চিমা চিন্তাবিদের তুলনায় আরও উৎসাহ নিয়ে বিশ্বের প্রতিটি বিদ্রোহকে সমর্থন করেছেন। মার্কস ও এঙ্গেলস(১৮২০-১৮৯৫) কার্ল মার্ক... রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য লড়েছেন—তাদের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলনকে শুধুই স্বতঃস্ফূর্ত শ্রেণিসংগ্রামে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।
ইন্টারন্যাশনালের উদ্বোধনী ভাষণে মার্কস বলেছিলেন, দাসপ্রথা বিরোধী আন্দোলন, পোলিশ বিদ্রোহ এবং ককেশাসে রুশ দখলদারিত্ব “শ্রমিক শ্রেণিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতা বোঝার শিক্ষা দিয়েছে… বিদেশনীতি নিয়ে লড়াইও শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির সাধারণ সংগ্রামের অংশ” (পৃষ্ঠা ৬৭)।
অ্যান্ডারসনের বই তাই শুধু মার্কস-বিরোধী ডান ও বামপন্থী মতাদর্শের খণ্ডন নয়—এটি আমাদের শেখায় কিভাবে মার্কসবাদকে অর্থনীতিবাদের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা থেকে মুক্ত করে জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে হয়। আজও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে অবমূল্যায়ন করে কেবল শ্রেণিসংগ্রামকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অথচ আমাদের পৃথিবী গঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের দ্বারা। মার্কসের সময়ের মতোই আজও দেশে দেশে জাতিবিদ্বেষ ও বিভাজন বিদেশি আগ্রাসনের সঙ্গে জড়িত। তাই আমাদের আন্দোলনেরও একটি “বিদেশনীতি” দরকার—যা আমাদের নিজেদের মুক্তির সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে।
লেখক






