জিজেক ডিসকোর্স: মার্কসবাদের আড়ালে পুঁজিবাদের সাফাইগির

ন্যাটো, ইউক্রেন যুদ্ধ ও ‘বামপন্থা’—এই তিনের সংযোগে স্লাভয় জিজেকের (Slavoj Žižek) অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা হাজির করেছেন নিকোস মত্তাস। এই লেখায় দেখানো হয়েছে কীভাবে স্লাভপ্য জিজেকনিজেকে ‘হেগেলীয় মার্ক্সবাদী’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে ন্যাটোর সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ, পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা এবং তথাকথিত ‘ডিক্যাফেইনেটেড বিপ্লব’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক সাফাইদাতায় পরিণত হয়েছেন। যুগোস্লাভিয়া থেকে ইউক্রেন—জিজেকের রাজনৈতিক অবস্থানের

নিকোস মত্তাস

ইন-ডিফেন্স অব কমিউনিজমের এডিটর-ইন-চিফ। 

“ইউক্রেনের প্রতি আমাদের ন্যূনতম দায় হলো পূর্ণ সমর্থন দেওয়া। আর তাঁর জন্য আমাদের দরকার আরও শক্তিশালী ন্যাটো […] আজকের দিনে কেউ যদি স্পষ্টভাবে ইউক্রেনের পক্ষে না দাঁড়ায়, সে আর নিজেকে বামপন্থী বলতে পারে না।”
(The Guardian, ২১ জুন ২০২২)

এই কথাগুলো কার? ন্যাটোর মহাসচিব জেন্স স্টোল্টেনবার্গের? নাকি জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎসের? অথবা স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের? না, তাদের কারও নয়। এই বক্তব্য সমকালীন বাম বুদ্ধিজীবী মহলের এক আলোচিত ‘তারকা’ চরিত্র, বহুল প্রচারিত ‘হেগেলীয় মার্কসবাদী‘ দার্শনিক স্লাভয় জিজেকের।
ইউক্রেন নিয়ে জিজেকের মতামত আদৌ কোনো গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল না, যদি না পশ্চিমা গণমাধ্যম তাকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরত এবং তাকে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবিত বুদ্ধিজীবীদের’ একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করত। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে জিজেক কেবল বুর্জোয়া মিডিয়াতেই নন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নামী একাডেমিক প্রতিষ্ঠান এবং থিঙ্ক ট্যাংকগুলোর মধ্যেও দৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলেছেন।
বাস্তবতা হলো স্লাভয় জিজেক আসলে ছদ্ম-মার্কসবাদের (Pseudo-marxism) এক জীবন্ত প্রতীক, একজন বুদ্ধিবৃত্তিক ধাপ্পাবাজ, যিনি ভারী ভারী বিশ্লেষণ, অসংলগ্ন ও প্রায়ই পরস্পরবিরোধী দার্শনিক জটলা, আর ফোলা-ফাঁপা শব্দচয়নের আড়ালে মূলত শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই ‘সাফাই’ গান বা গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেন।
এটা মোটেও কাকতালীয় নয় যে, ইউক্রেনকে রক্ষার নামে আজ তিনি ‘আরও শক্তিশালী ন্যাটো’-র দাবি তুলছেন। অথচ ১৯৯৯ সালে সেই একই মানুষ ন্যাটোর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও যুগোস্লাভিয়ার ওপর বোমাবর্ষণের প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন। “NATO, the Left Hand of God” শিরোনামের এক প্রবন্ধে জিজেক লিখেছিলেন-

আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, যুগোস্লাভিয়ায় বোমাবর্ষণের যে ‘প্যারাডক্স’, সেটা পশ্চিমা শান্তিবাদীরা যেটা নিয়ে অভিযোগ করে আসছে—অর্থাৎ ন্যাটো নাকি যে জাতিগত নিধন ঠেকাতে গিয়েছিল, সেটাকেই উসকে দিয়েছে। আসলে সমস্যাটা সেখানে নয়, আসল সমস্যা হলো ‘ভিক্টিমাইজেশন’-এর আদর্শবাদ। সার্বীয় দানবদের হাত থেকে অসহায় আলবেনীয়দের রক্ষা করা ঠিক আছে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তাদের এই অসহায় অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে গড়ে তুলতে দেওয়া যাবে না […]

তবে শুধু ন্যাটোই এই সংঘাতকে অরাজনৈতিক (depoliticized) করেনি। তথাকথিত-বামপন্থী ন্যাটোবিরোধীরাও তাই করেছে। তাদের কাছে যুগোস্লাভিয়ায় বোমাবর্ষণ ছিল টিটোর যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার শেষ অধ্যায়, একটি প্রতিশ্রুতির অবসান, বহু-জাতিসত্তাভিত্তিক ও প্রকৃত সমাজতন্ত্রের এক ইউটোপিয়ার পতন, যা শেষ পর্যন্ত জাতিগত যুদ্ধের বিশৃঙ্খলায় গড়িয়ে পড়ে। এমনকি আলাঁ বাদিউর মতো তীক্ষ্ণদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক দার্শনিকও মনে করেন যে, সব পক্ষই সমানভাবে দোষী। তাঁর মতে, সার্ব, স্লোভেন ও বসনীয় সব পক্ষেই জাতিগত নিধনকারীরা ছিল […]
এটা আমার কাছে হারিয়ে যাওয়া যুগোস্লাভিয়ার জন্য এক ধরনের বামপন্থী নস্টালজিয়া বলেই মনে হয়। পরিহাসের বিষয় হলো—এই নস্টালজিয়া স্লোবোদান মিলোশেভিচের সার্বিয়াকেই সেই স্বপ্নরাজ্যের উত্তরসূরি মনে করে—অর্থাৎ ঠিক সেই শক্তিটিকেই, যে বাস্তবে পুরোনো যুগোস্লাভিয়াকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ধ্বংস করেছিল।”
(lacan.com/zizek-nato.html, ২৯ জুন ১৯৯৯)
যুগোস্লাভিয়ায় ন্যাটোর জঘন্য অপরাধের প্রকাশ্য সমর্থক স্লাভয় জিজেক সার্ব জনগণের ওপর চালানো সেই বর্বরতার পরিমাণে মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তার চেয়েও বেশি বোমা তিনি চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়,

সুতরাং একজন বামপন্থী হিসেবে ‘বোমা ফেলা হবে কি হবে না?’—এই দোটানার আমার উত্তর হলো: এখনও যথেষ্ট বোমা ফেলা হয়নি, এবং যা-ও ফেলা হয়েছে তা অনেক দেরিতে হয়েছে। (Slavoj Žižek, Against the Double Blackmail, New Left Review, এপ্রিল ১৯৯৯)

যুগোস্লাভিয়ার সেই অপরাধের চার বছর পর, ২০০৩ সালে, এক সাক্ষাৎকারে স্লোভেনীয় এই “দার্শনিক” আবারও জোর দিয়ে বলেন—

অনেক বামপন্থীর আতঙ্কের কারণ হলেও সত্য, আমিও প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়ায় ন্যাটোর বোমাবর্ষণের পক্ষে কিছুটা সহমর্মিতা দেখিয়েছিলাম। দুঃখিত, কিন্তু এই বোমাবর্ষণই একটি ভয়াবহ সংঘাত থামিয়েছিল।
(Left Business Observer #105, আগস্ট ২০০৩)

যখন স্লাভয় জিজেক ন্যাটোর সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের সরাসরি সমর্থন করেন না, তখন তিনি সমাজ, রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে ভারী ভারী অথচ ফাঁপা আবোলতাবোল কথাবার্তায় মেতে ওঠেন। ২০১২ সালে গ্রিসের তৎকালীন উদীয়মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল ‘সিরিজা’ (SYRIZA) আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় এই স্লোভেনীয় বুদ্ধিজীবী ‘সুবিধাবাদকে’ (opportunism)-কে সমর্থন করতেও দ্বিধা করেননি! তাঁর কথায়—

দেখুন, একধরনের নীতিগত সুবিধাবাদও আছে— যা আসলে নীতিরই সুবিধাবাদ। যখন আপনি বলেন পরিস্থিতি একেবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, এবং আমাদের আর কিছুই করার নেই—কারণ কিছু করতে গেলে আমরা আমাদের নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব—তখন একে একটি নীতিগত অবস্থান বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এটি আসলে সুবিধাবাদেরই একটি চরম রূপ।

২০১২ সালে স্লাভয় জিজেক প্রকাশ্যভাবেই সিরিজা (SYRIZA)-কে সমর্থন করেন এবং আলেক্সিস সিপ্রাসের সঙ্গে যৌথ রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। একই সঙ্গে তিনি গ্রিসের কমিউনিস্ট পার্টি কেকেই (KKE)-র বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়াতেও দ্বিধা করেননি। তাঁর ভাষায়, কেকেই হলো—“সেইসব মানুষের দল, যারা এখনও বেঁচে আছে শুধু এই কারণে যে তারা মরতে ভুলে গেছে।”
এই সেই একই ভণ্ড, যিনি ২০১৫ সালে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর বিশ্ব পুঁজিবাদের অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার ‘সমাধান’ হিসেবে সমাজের সামরিকীকরণের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে—

“গণতান্ত্রিক প্রেরণায় গড়ে ওঠা তৃণমূল আন্দোলনগুলো দৃশ্যত ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাই হয়তো বিশ্ব পুঁজিবাদের এই দুষ্টচক্র ভাঙার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ‘সামরিকীকরণ’—যার মানে হলো স্ব-নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির ক্ষমতা স্থগিত করে দেওয়া।”

(Slavoj Žižek: In the Wake of Paris Attacks the Left Must Embrace Its Radical Western Roots, inthesetimes.com, ১৬ নভেম্বর ২০১৫)
এর এক বছর পর, ২০১৬ সালে, এই অতিরঞ্জিত চিন্তাবিদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অতি-প্রতিক্রিয়াশীল বিলিয়নিয়ার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করেন এবং তাকে আখ্যা দেন একজন ‘মধ্যপন্থী উদারপন্থী’ হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ে তাকে গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিসের মতো অন্যান্য স্বঘোষিত ‘অসংলগ্ন মার্কসবাদী’দের সাথে রাজনৈতিক প্যানেলে দেখা গেছে।

না, স্লাভয় জিজেক কোনোভাবেই না তো একজন মার্কসবাদী, না একজন র‌্যাডিক্যাল দার্শনিক। তিনি এমন কোনো পাগলও নন, যিনি কেবল মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আবোলতাবোল বকেন। বরং উল্টোটা—তিনি পুঁজিবাদী বর্বরতার একজন অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ সাফাইদাতা এবং সচেতনভাবে একজন কমিউনিজম-বিরোধী চিন্তক। সেই অবস্থান থেকেই তিনি বিংশ শতকের সমাজতন্ত্রকে হেয় করেন, নির্লজ্জভাবে লেনিনের ওপর আক্রমণ করেন, এবং প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে ন্যাটোর মতো খুনি সাম্রাজ্যবাদী জোটকে সমর্থন জুগিয়ে যান। এমনকি যখন তিনি সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের পক্ষে কথা বলার ভান করেন, তখনো তিনি তা করেন কেবল কথার কথায়—একটি বিমূর্ত তাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে; তিনি সুকৌশলে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োগের ক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন।

তাহলে প্রশ্ন হলো—স্লাভয় জিজেক আসলে কিসের প্রতিনিধিত্ব করেন? এর উত্তর তিনি নিজেই একবার দিয়ে ফেলেছেন। তাঁর ভাষায়,

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সংবেদনশীল উদারপন্থীরা চায় এক ধরনের ডিক্যাফেইনেটেড বিপ্লব—এমন এক বিপ্লব, যার গায়ে বিপ্লবের গন্ধই নেই।

এই কথাটাই আসলে জিজেক এবং বুর্জোয়া গণমাধ্যমে অতিমাত্রায় প্রচারিত অন্য তথাকথিত ‘মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী’দের (যেমন—আলাঁ বাদিউ, আন্তোনিও নেগ্রি, টেরি ঈগলটন প্রমুখ) প্রকৃত পরিচয়। তারা সবাই হলো সেই ‘ডিক্যাফেইনেটেড বিপ্লব’-এর আদর্শগত ওয়েটার—এবং একই সঙ্গে শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য সাফাইদাতা। 

লেখক: নিকোস মত্তাস।

অনুবাদক: তাওহীদুর রহমান। 

মূল লেখার লিঙ্ক: মিডওয়েস্টার্ন মার্কস।

[ক্রিমসন থিওরিতে প্রকাশিত প্রতিটি লেখা সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। ক্রিমসন থিওরিতে প্রকাশিত ও অনূদিত লেখার বক্তব্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি অপরিহার্যভাবে একমত—এমনটি নয়। ক্রিমসন থিওরি সমালোচনামূলক ও চিন্তা-উদ্রেককারী লেখা প্রকাশ ও অনুবাদে আগ্রহী। বহুমাত্রিক বিতর্ক, তর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে, প্রকাশিত যেকোনো লেখার যুক্তিসঙ্গত প্রতিক্রিয়া বা সমালোচনামূলক লেখা প্রকাশ করতেও ক্রিমসন থিওরি সমানভাবে আগ্রহী। আমাদের সম্পাদকীয় নীতির মূল লক্ষ্য হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে বৌদ্ধিক সততা, যুক্তিনিষ্ঠতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ নিশ্চিত করা।] 

লেখকবৃন্দ

ইন-ডিফেন্স অব কমিউনিজমের এডিটর-ইন-চিফ। 

সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ছেন। ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন, জগৎ দেখার ইচ্ছা আছে।

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন

Scroll to Top