ভূমিকা
মতবাদ হিসেবে উত্তর আধুনিকতাকে বর্ণনা করার জন্য দরকার হয় কিছু নির্দিষ্ট শব্দ; শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ কী, সেটা স্পষ্ট হওয়ারও দরকার হয় এই মতবাদ বুঝতে। এখানে একটা সমস্যা আছে। উত্তর আধুনিকতার উৎসভূমি ফ্রান্স। এর আকরগ্রন্থগুলি লেখা হয়েছিল ফরাসি ভাষায়। যাঁরা এগুলি লিখেছিলেন, তাঁরা এর ‘মতবাদ’ নিয়ে যতটা না আলোচনা করেছিলেন, তার চেয়ে বেশি আলোচনা করেছিলেন সেই মতবাদের নিরিখে কোনো একটা বিশেষ বিষয়ে তাদের যে উপলব্ধি, সেটা বর্ণনা করতে। এটিকে একটি ‘মতবাদ’ এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে দাঁড় করবার কাজটা কিন্তু বেশি হয়েছে ইংরেজি ভাষায়। ফলত এর উৎসে যে ফরাসি শব্দগুলি আছে, সেগুলো অনূদিত বা রূপান্তরিত হয়েছে ইংরেজিতে। অনুবাদ বা রূপান্তরে অনেকসময় শব্দগুলির অন্তর্নিহিত অর্থ ঠিকমতো ধরা পড়েনি। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। উত্তর আধুনিকতার মতবাদ নির্মাণে একটা বড়ো ভূমিকা পালন করেছে মিশেল ফুকোর ‘Discipline and Punish’ গ্রন্থটি, যেটি এ বিষয়ের আলোচনায় একটি আকর গ্রন্থের মর্যাদা পায়। বইটার ফরাসি নাম ‘Surveiller et Punir’; ‘Surveiller’ শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থ ‘নজরদারি’। ‘নজরদারি’ আর ‘discipline’ বা ‘শৃঙ্খলা’ এক কথা নয়। ‘নজরদারি’ শব্দটির অন্তর্নিহত ভাব অনেকটা হল জর্জ অরওয়েল-এর ‘big brother is watching’-এর মতো, যাতে ‘discipline’ আনার ব্যঞ্জনাটা আসে কিছুটা ঘুরপথে। বাংলায় যখন এই উত্তর আধুনিকতা-অনুসৃত শব্দগুলোকে ব্যবহার করা হয় তখন আবার বাংলা বাক্বারার অনেক সহজাত ভাব এর ভেতরে চলে আসে। তাতে অনেক সময় ধারণাটা আরও কিছুটা আলাদা হয়ে যায়। এই সমস্যাটা যে বর্তমান রচনাতেও থেকে যাবার সম্ভাবনা আছে, সূচনায় সে কথাটা উল্লেখ করা দরকার।
আর একটা সমস্যাও আছে। বর্তমান রচনার ফোকাস হল উত্তর আধুনিকতার মতাদর্শ এবং মতাদর্শ হিসেবে মার্ক্সবাদের সঙ্গে তার তফাতের ক্ষেত্রগুলি কী, সে নিয়ে আলোচনা। মতাদর্শনের পিছনে থাকে দর্শন। সুতরাং উত্তর আধুনিকতা অনুসৃত দর্শনও এই আলোচনার বিষয়বস্তু। উত্তর আধুনিক আলোচনার অনেকটাই কিন্তু শিল্পসাহিত্য, জ্ঞানতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব- এই সব নিয়ে। এটা ঠিক যে এই সব কিছু নিয়ে আলোচনার পিছনেও থাকে দর্শন এবং দর্শনবাহিত মতাদর্শ। শুধু তাই নয়। উত্তর-আধুনিক দর্শনের অনেকটাই আবার তৈরি হয়েছে এই শিল্পসাহিত্য, জ্ঞানতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব- এ সব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে। আমাদের আলোচনা কিন্তু এই সব বিষয়গুলিকে পরিহার করেছে। কৈফিয়ত হিসেবে এখানেই উল্লেখ করে রাখি যে কাজটা করা হয়েছে সচেতন ভাবেই। এই রচনা আসলে দেখতে চায়, সমাজ সংক্রান্ত আলোচনায়, অর্থাৎ সমাজ-বিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনায় উত্তর আধুনিক ভাবধারার অবস্থানটি কোথায়। সমাজ সংক্রান্ত আলোচনায় অর্থনীতি ও রাজনীতি কেন্দ্রিক ক্ষমতার গুরুত্ব অপরিসীম। মার্ক্সবাদমার্ক্সবাদ ঊনবিংশ শতা... একভাবে বিষয়টা বুঝে থাকে। দার্শনিক ও মতাদর্শগত কারণে উত্তর আধুনিক মতাদর্শ বিষয়টিকে বোঝে অন্যভাবে। তফাতের জায়গাটা কী, সেটাই এ আলোচনার মূল বিষয়। সুতরাং এ আলোচনায় বাসিনের ‘ইফিজিনি’ নাটকের কথা থাকবে না, থাকবে না দেরিদার ‘অন গ্রামাটোলজি’র কথা। একভাবে থাকবে দেরিদার ‘স্পেকটারস্ অফ মার্ক্স্’-এর কথা, তবে সেটাও আসবে উত্তর আধুনিকতার রাজনীতি আলোচনা প্রসঙ্গে।
ভূমিকায় আর একটি প্রসঙ্গও উত্থাপন করা দরকার মনে করি, যদিও প্রসঙ্গটি উত্তর সাধুনিকতা মতবাদপন্থীদের কাছে উষ্মার কারণ হতে পারে। উত্তর আধুনিকতার বিরুদ্ধে একটা বড়ো অভিযোগ এই যে এঁদের লেখাপত্রগুলিতে স্পষ্টতার অভাব আছে। এঁদের ভাষা দুর্বোধ্য, বক্তব্য বিষয়ে এঁদের লেখাপত্রে সচেতনভাবে অস্পষ্টতা রক্ষা করা হয়। বহু তুচ্ছ বা সাধারণ কথাই লেখা হয় অনাবশ্যক জটিলতার মোড়কে। যে তত্ত্বকে এঁরা নতুন কিছু তত্ত্ব হিসেবে হাজির করেন, জটিলতার আবরণ ভেদ করলে দেখা যায় সেটা আসলে বহু পুরোনো একটা তত্ত্ব। দার্শনিক বক্তব্যেও শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ধূম্রজালের অন্তরালে যা আছে, সেটা কোনো একটি বহু পরিচিত দার্শনিক তত্ত্ব; নানা ধরনের শব্দজালে বেঁধে সেই তত্ত্বকেই অন্যরকম কিছু একটা হিসেবে চালানো হচ্ছে। এই ধরনের কঠোর বক্তব্য যাঁদের কাছ থেকে এসেছে প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। নোয়াম চমস্কি এই উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকদের সম্পর্কে লিখছেন, ‘এঁদের লেখাপত্র ভঙ্গিসর্বস্ব (pretentious); পরীক্ষা করলে দেখা যায় এই লেখাগুলির মধ্যে বেশ কিছু আছে যা অশিক্ষিত লেখা (lot of it is simply illiterate), যে সবের কারণ হল সংশ্লিষ্ট মূল লেখাগুলো ঠিকমতো না পড়া। ভুল পড়ার জন্য যেটুকু আত্মসমালোচনা থাকা দরকার সে সবও নেই। লেখাগুলোতে অনেক সময়ই একটা তুচ্ছ কথা নিয়ে ফেনানো হয় (যেটা করা হয় আবার জটিল সব কথার মোড়কে), অনেক সময়ই যা লেখা হয় তা জঞ্জাল ছাড়া কিছু নয়।’ নোয়াম চমস্কির এই বক্তব্যটা ইন্টারনেট মারফত প্রচার করা হয়েছে (দ্রষ্টব্য: Left On Line Bulletin Board; sysop@lbbs.org) |
এত কঠিন কথা বলার দরকার না থাকতেও পারে। একটা কথা কিন্তু ঠিক। এঁদের লেখাপত্রে স্পষ্টতার অভাব থাকে। ফলত এঁদের তাত্ত্বিক নির্মাণটা ঠিক কী, সে নিয়ে সংশয় থাকে আর সংশয় থাকে বলেই ‘দেরিদা ঠিক কী বলতে চেয়েছেন’ এ নিয়ে থাকে বিতর্ক। আরও একটা কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করব। চমস্কির এই বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান লেখক যেহেতু একমত যে এঁদের বহু লেখাতেই একটা তুচ্ছ কথাকে অনাবশ্যকভাবে জটিল করা হয়, অনাবশ্যকভাবে অনেক শব্দ আমদানি করা হয় যা মূল বক্তব্য বুঝতে অসুবিধা সৃষ্টি করে, বর্তমান রচনায় সে কারণে প্রথমেই এঁদের কথাগুলো বুঝতে চেষ্টা করেছি নিজের মতো করে। শব্দগুলোর সাহায্যে যে তত্ত্ব নির্মাণ করা হয়, সংক্ষেপে সেটাও বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি বইটির এই অধ্যায়ে; নিজে যেভাবে বুঝেছি, সেভাবে। ইচ্ছে করেই কোনো উদ্ধৃতির সাহায্য নিইনি, কারণ শব্দগুলোর উৎস বা জিনিওলজি নিয়ে আলোচনা করা এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। মূল যে বক্তব্যটিতে আমরা পৌঁছতে চাই সেটা হল, উত্তর আধুনিকতার তত্ত্বে কোনো নূতন দার্শনিক নির্মাণ নেই। আসলে এটির ভিত্তিতে আছে বস্তুবাদ বিরোধী ধ্রুপদি ইউরোপীয় দর্শনের কিছু বিশেষ ধারার সমাহার।
উত্তর আধুনিক তত্ত্ব
এ তত্ত্ব আসতে শুরু করে বিংশ শতকের সত্তরের দশকে। এ তত্ত্বটি গড়ে উঠেছে কয়েকজন ফরাসি চিন্তাবিদের সমাজ, সাহিত্য, জীবন দর্শন ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ের চিন্তাভাবনার সমাহারে। পরে আমরা দেখাব এই সব চিন্তাভাবনা অনেকটাই এসেছে
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের বলশেভিকরাশিয়ান শব্দ 'বলশেভিক... মতবাদ বিরোধী চিন্তাভাবনার ধারাবাহিকতায়। এসবের আশু উৎস ছিল ফ্রান্সের মার্ক্সবাদী দার্শনিক লুই আলথুসারের সমালোচনা। এই চিন্তাভাবনার সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে বিখ্যাত নামটি হল মিশেল ফুকো। সঙ্গে অবশ্যই যাঁর নাম উচ্চারিত হয় তিনি হলেন জ্যাক দেরিদা। এঁরা কেউই অবশ্য নিজেদেরকে মার্ক্সবাদমার্ক্সবাদ ঊনবিংশ শতা... বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করতে চাননি। এঁদের, বিশেষত মিশেল ফুকোর বক্তব্য এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ফুকোর বক্তব্য হল, মার্ক্সবাদকে ভুল বা ঠিক হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো দরকার নেই। সমাজ এবং বস্তুজগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্য এই দর্শনটি আসলে অপ্রতুল। এই দর্শনের ছকে পৃথিবীকে বুঝতে গিয়েই লুই আলথুসার ভুল করেছিলেন। ভুলটা খুব মামুলি ভুল নয়। আসলে মার্ক্সবাদমার্ক্সবাদ ঊনবিংশ শতা... হল ইউরোপীয় আলোক প্রাপ্তির যুগের যে দার্শনিক চিন্তা, সেই চিন্তারই ফসল। আলোকপ্রাপ্তির যুগের চিন্তাকে যদি ‘আধুনিক’ হিসেবে চিহ্নিত করার হয়, তাহলে বলতে হবে এই ‘আধুনিক’ চিন্তার ছকে পৃথিবীকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না, বুঝতে হলে দরকার হবে ‘উত্তর আধুনিক’ চিন্তা- যে চিন্তার আলোকেই ব্যাখ্যা করা যায় মানব সমাজকে, সাহিত্য, ভাষা সহ সমাজের নানা দিকগুলিতে।
চিন্তাটায় কী আছে, যেটা ‘উত্তর আধুনিক’? এটা বুঝতে হলে প্রথম দরকার ‘টেকস্ট’ কী সেটা সম্পর্কে একটা ধারণা করা। ‘টেকস্ট’ কথাটার একটা উত্তর আধুনিক মাত্রা আছে। এ বিষয়ে প্রথমে উল্লেখ করতে হবে দেরিদার ‘গ্রামাটোলজি’র এ সংক্রান্ত আলোচনা। নোয়াম চমস্কির অভিযোগের কথা মনে রেখেই বলতে হবে, আলোচনাটি সহজ কিংবা স্বচ্ছ নয়। বাক্যবিন্যাসও জটিল। যাই হোক, বহু জটিল বাক্য বিন্যাসের জাল ভেদ করে ওখানে যা পাওয়া যায় তা হল টেকস্ট হল লিখিত বা উচ্চারিত ভাষায় যে আইডিয়া নির্মাণ করা হয়, সেটা। এই কথাটার বিশেষ গুরুত্ব কী? কথাটার গুরুত্ব এইখানে যে, লিখিত ভাষা যে উচ্চারিত ভাষার ছায়ামাত্র, এটা অনেকে বুঝতে চান না (যথা গ্রিক দার্শনিক প্লেটো, কিংবা দেরিদা যাকে নিয়ে বেশি আলোচনা করেছেন, সোস্যুর)। যাই হোক, উচ্চারিত অথবা লিখিত ভাষার সাহায্যে যা নির্মাণ করা হয় তা লেখক বা বাচকের ‘টেকস্ট’। ‘টেকস্ট’-এ থাকে লেখকের বা বাচকের চিন্তা। গ্রামাটোলজির বক্তব্য হল, ‘টেকস্ট’-এর অবনির্মাণ বা বিনির্মাণ (deconstruction) করা যায়, যার মধ্য দিয়ে পাওয়া যায় ‘অপর’ বা বিপরীত চিন্তা। এ কথার তাৎপর্য হল, একটা টেকস্ট থাকলে বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে তার একটা পালটা ‘টেকস্ট’ ও তৈরি করা যায়। তাই যদি হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে কোন আইডিয়াটা সত্য? ‘টেকস্ট’-এ যা পাওয়া গেল সেটা, না তার বিনির্মাণ যে সিদ্ধান্ত করল সেটা। আইডিয়া দিয়ে মানুষ বাস্তব জগৎকে বুঝতে চায়, ‘টেকস্ট’ সে কাজটাই করে। যদি এই নির্মাণ-বিনির্মাণ-এর আবর্তে ‘টেকস্ট’-বাহিত আইডিয়া ঘুরতে থাকে, কথা উঠবে, বাস্তব তাহলে কোন্টা? ‘টেকস্ট’ না তার বিনির্মাণ। উত্তর আধুনিকতার কাছে এর উত্তর হল- কোনটাই নয়। আসলে বাস্তব হল সম্ভাব্য সব ব্যাখ্যার এক অবিরাম স্রোত। কোনো ‘টেকস্ট’ যদি নির্দিষ্ট বিষয়ে শেষ কথা বলতে চায়, তবে সেটা হবে আধিপত্যবাদী ‘টেকস্ট’। এই ‘টেকস্ট’ আসলে ক্ষমতার লক্ষে পরিচালিত; কোনো বিপরীত বক্তব্য, যা ঐ ‘টেকস্ট’-এর বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে পাওয়া যায় তা সে সহ্য করে না। বিদ্যাচর্চায় উত্তর আধুনিকতার বিদ্রোহ এই আধিপত্যবাদী ‘টেকস্ট’-এর বিরুদ্ধে। উত্তর আধুনিক চিন্তায় সত্য বা বাস্তবের কোনো চরম বাচন (বা টেকস্ট) নেই। সত্যকে কোনো নির্দিষ্ট ‘টেকস্ট’-এর মধ্য দিয়ে খোঁজার কোনো দরকারও নেই। কীভাবে তাহলে জ্ঞানচর্চা করা উচিত? উত্তর আধুনিক বক্তব্য হল, জ্ঞানচর্চা হওয়া উচিত একটি বিশেষ বিষয়ে যে ‘টেস্ট’ এবং তার বিনির্মাণ, তার জিনিওলজি বা বংশচরিত্র অধ্যয়ন করা।
এ বিষয়ে পথ নির্দেশক জ্ঞান চর্চা করেছেন মিশেল ফুকো তাঁর ‘নজরদারি ও শাস্তি’ এবং ‘আমি পিয়ের রেভোয়া আমার মা, বোন ও ভাই-এর গলা কেটে…’ গ্রন্থ দুটিতে। প্রথম গ্রন্থটিতে আছে মধ্যযুগ থেকে প্রায় আধুনিক যুগ পর্যন্ত ফ্রান্সে এবং কিছু পরিমাণে অন্য পশ্চিম রাষ্ট্রে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার বর্ণনা। দ্বিতীয়টি হল একটি মনোরোগীর সমস্যা বর্ণনা। যেটা চমকপ্রদ তা হল, এই বর্ণনাগুলো থেকেই পাওয়া যায় উত্তর আধুনিক এই বক্তব্যের জোরালো সমর্থন যে বাস্তবে হল সম্ভাব্য সব ব্যাখ্যার এক অবিরাম স্রোত, যেখানে কোনো চরম বাচন নেই। আরও বোঝা যায়, আধিপত্য করার জন্য যে ক্ষমতার দরকার হয়, সেটাও ‘টেকস্ট’-সাপেক্ষ। সমাজে থাকে একই বিষয়ে বহু ‘টেকস্ট’। বিষয়-নির্দিষ্ট ‘টেকস্ট’কে বলা যায় ‘ডিসকোর্স’। ‘টেকস্ট’ বাহিত ‘ডিসকোর্স’ এর বিনির্মাণে দাঁড়ায় ঐ ডিসকোর্সে পালটা ‘টেকস্ট’। একটি ‘ডিসকোর্সে’ ক্ষমতার নির্দিষ্ট প্রকাশ ঘটে নির্দিষ্ট ‘টেকস্ট’-এ নির্দিষ্টভাবে। নির্দিষ্ট বাচনের নির্দিষ্ট ক্ষমতাও আবার সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। বাচনের বংশচরিত বা জিনিওলজি পাঠ করলে সেটা পরিষ্কার হয়। আধিপত্য আসে ক্ষমতার শক্তি একটা বিশেষ ‘টেকস্ট’-এ পুঞ্জীভূত হলে। অবশ্যই এটা সাময়িক, কেননা ক্ষমতা হল সম্পর্কের একটা বিশেষ প্রকাশ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ক্রিয়া ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসার ফলে যা বদলে যেতে থাকে। ক্ষমতা যেহেতু সব বাচনেই থাকে, বিমূর্তভাবে ক্ষমতা তাই বাচন নিরপেক্ষ। এটাকে ভাবা যায় একটা শক্তিস্রোত হিসেবে, যা জীবজগতের সর্বত্র সব বাচনে প্রবাহিত। ক্ষমতা অবয়ব ধারণ করে ব্যবহার, অভ্যাস, জীবনচর্চায়; প্রকাশিত হয় সামাজিক যাবতীয় সংগঠনে, প্রকাশিত হয় সংস্কৃতিতে, জ্ঞানচর্চায়।
ফুকোর এই ‘টেকস্ট’ বা বাচন সংক্রান্ত ধারণা, তাঁর জিনিওলজি-ভিত্তিক আলোচনা পদ্ধতি এবং সর্বোপরি তাঁর ‘ক্ষমতা’ সংক্রান্ত ধারণা হল উত্তর আধুনিক চিন্তার বনিয়াদ। ‘টেকস্ট’ বা বাচন সংক্রান্ত ধারণা এবং জিনিওলজি-ভিত্তিক আলোচনা পদ্ধতি নিয়ে আরও কথা আছে, উত্তর আধুনিক মতবাদ বুঝতে যা প্রয়োজনীয়। এখানে শুধু এই কথাটা উল্লেখ করা দরকার যে ক্ষমতা সংক্রান্ত ফুকো-তত্ত্ব আসলে নতুন কোনো তত্ত্ব নয়। বাচন কিংবা বিষয় নিরপেক্ষ এই ক্ষমতা-তত্ত্ব সারের বিচারে জার্মান দার্শনিক নিটশের ক্ষমতা তত্ত্বরই অনুসরণ মাত্র। নিটশের কাছেও ক্ষমতা হল একটা শক্তিস্রোত যা জীবজগতের সর্বত্র প্রবাহিত। এই অর্থে এ কথাটা দার্শনিক চিন্তায় নতুন কিছু সংযোজন নয়।
‘টেকস্ট’-এর কথায় ফিরে আসা যাক। উত্তর-আধুনিক মতে সমাজে থাকে নানা ‘টেকস্ট’। নির্দিষ্ট বিষয়ের কোনো ‘টেস্ট’কে বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে পাওয়া যায় অন্য বা অপর ‘টেকস্ট’, যা ঐ বিষয়টিরই অন্য ব্যাখ্যা দিতে পারে। ঐ বিষয়ের বাস্তব হল সম্ভাব্য সব ব্যাখ্যার এক অবিরাম স্রোত, যেখানে কোনো চরম বাচন নেই। এখান থেকে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। একটি বিষয়-নির্দিষ্ট বাচন এবং প্রতিবাচনের স্রোতের সঙ্গে অন্য বিষয়-নির্দিষ্ট বাচন এবং প্রতিবাচনের স্রোতের মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে, যেটা অনুশীলন করলে একটা ‘মাষ্টার ডিস্কার্স’ বা চরম বাচন পাওয়া যেতে পারে? এর উত্তরও নেতিবাচক। একটা বিশেষ ডিস্কোর্সে যেমন থাকে সম্ভাব্য সমস্ত ব্যাখ্যার অবিরাম স্রোত, সমাজেও আছে বহু ডিস্কোর্সের অবিরাম স্রোত। এই ডিস্কার্সগুলির মধ্যে কোনো পরম্পরা বা কার্যকারণ সম্পর্ক আবিষ্কার করার চেষ্টা একটা ভ্রান্ত জ্ঞানতত্ত্বের ফসল। কার্যকারণ সম্পর্কের মধ্যে ডিসকোর্সগুলিকে বাঁধবার চেষ্টা করলে, কিংবা এদের মধ্যে কোনো পরম্পরা খোঁজার চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত যেটা তৈরি হবে সেটা হল ‘মাষ্টার ডিসকোর্স’ যেটা চরম বাচন বা মহাবাচনের আসন পাবে। যেহেতু সব ‘টেকস্ট’- এরই পালটা ‘টেকস্ট’ থাকে, সব ডিসকোর্সেরই পালটা ডিসকোর্স থাকে, সে কারণেই এরকম কোনো ‘মাষ্টার ডিস্কার্স’ তৈরি করা যায় না, কোনো চরম বাচনের বা মহাবাচনের খোঁজ করাটাও ভ্রান্ত। কেউ যদি বলেন ইতিহাসকে বুঝতে হবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের চিন্তা কাঠামোতে, তিনি আসলে বলেন একটা ‘মাষ্টার ডিস্কোর্সের’ কথা, যার সাহায্যে দাস সমাজ থেকে সমাজতন্ত্র- সব. কিছুরই ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে। এটা ভুল, এটা শেষ পর্যন্ত জ্ঞানের জগতে নিয়ে আসে আধিপত্যবাদী ‘টেকস্ট’ এবং তাকে কেন্দ্র করে জন্ম নেয় দার্শনিক ক্ষমতার পীড়ন। এই পীড়ন শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পায় রাষ্ট্র সহ যাবতীয় সামাজিক সংগঠনে, প্রকাশ পায় মানুষের ব্যবহার, অভ্যাস ও জীবনচর্চায়।
এই মাস্টার ডিসকোর্সের ছকে জ্ঞানচর্চা করার চিন্তাটি মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... উদ্ভাবিত, এটা ভাবার কারণ নেই। উত্তর আধুনিকতাবাদীদের মতে, জ্ঞানের জগতে এই ‘মাষ্টার ডিস্কার্সের’ চিন্তাটি আসলে ইউরোপীয় আধুনিকতার ফসল। কার্যকারণের মধ্যে ডিস্কোর্সগুলিকে বাঁধা, সেগুলির মধ্যে পরম্পরা খোঁজা এবং সেই চিন্তায় একটা ‘মাষ্টার ডিস্কার্স’ গড়া-এ সবই এসেছে ইউরোপীয় আধুনিক জ্ঞানচর্চার হাত ধরে। এ থেকেই জ্ঞানের জগতে এসেছে আধিপত্যবাদী ‘টেকস্ট’ গড়ার প্রবণতা এবং ইউরোপীয় আধুনিকতার চিন্তায় মানুষের ব্যবহার, অভ্যাস ও জীবনচর্চাকে বেঁধে দেবার প্রবণতা। সারা পৃথিবী এভাবেই ইউরোপীয় আধুনিকতার পীড়নের শিকার হয়েছে। উত্তর আধুনিকতার বিদ্রোহ এই ইউরোপীয় আধুনিকতার পীড়নের বিরুদ্ধে। এ বিদ্রোহ শুধু মার্ক্সের বিরুদ্ধে নয়, স্বচ্ছন্দে এ বিদ্রোহকে সাজানো যায় হেগেলীয় ‘মাস্টার ডিস্কোর্সে’র বিরুদ্ধেও।
এ বিদ্রোহের অন্তর্বস্তু নিয়ে আমরা আলোচনা করব। কিন্তু তার আগে উত্তর আধুনিক মতবাদ বিষয়ে আরও কিছু কথা উল্লেখ করতে হবে। আন্তঃসম্পর্কহীন বহু ধরনের বাচনের মধ্যে সমাজের যে অস্তিত্ব সেখানে ‘প্রগতি’র কোনো ধারণা থাকতে পারে কি? বলা যেতে পারে কি মধ্যযুগীয় ইউরোপের তুলনায় আজকের ইউরোপ অধিকতর ‘সভ্য’? উত্তর আধুনিক মতবাদ অনুসারে, এটা একটা ডিসকোর্স হতে পারে। কিন্তু সব ডিসকোর্সের মতোই এখানেও কোনো চরম বাচন নেই। যেটা হতে পারে তাহল ‘সভ্যতা’ সংক্রান্ত আলোচনার এক পর্যায়ে যেটা কর্তৃত্বকারী বাচন ছিল, তার প্রতিবাচন কীভাবে গড়ে উঠল এবং কিভাবে কর্তৃত্বকারী বাচনের বিনির্মাণ ঘটলো তার অনুসন্ধান। বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে কর্তৃত্বকারী বাচনের পরাজয় এবং পাল্টা বা প্রতিবাচনের উত্থানে ‘ভালো’ বা ‘মন্দ’, ‘প্রগতি’ বা ‘পশ্চাদগতি’-এসবের কোনো কথা ওঠে না। কারণ ‘প্রগতি’ বা ‘পশ্চাদগতি’র কোনো বাচক-নিরপেক্ষ অস্তিত্ব নেই।
যেটা এই লড়াই বা লড়াইগুলোর জিনিওলজি বা বংশচরিত্র অধ্যয়ন করলে বোঝা যায় তা হল অতীতে কীভাবে কর্তৃত্বকারী বাচনের আধিপত্য বা হেজেমনি ভাঙার কাজটা করা হয়েছে। যাঁরা এখনকার কর্তৃত্বকারী বাচনের বিনির্মাণ ঘটিয়ে একটা পালটা বাচন তৈরি করতে চান, তাঁরা এই জিনিওলজি অধ্যয়ন করলে বুঝতে পারবেন, কর্তৃত্বকারী বাচনের হেজেমনির বিরুদ্ধে লড়াই-এ ‘সাবভারসান’ বা অন্তর্ঘাত একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্তর্ঘাত ঘটানো হয় কর্তৃত্বকারী বাচনের কাঠামোটা মেনে নিয়েই সেখানে পালটা বাচনের উপাদানগুলো জোরদার করে।
উত্তর আধুনিক মতাদর্শ-আশ্রিত আন্দোলনে ‘অন্তর্ঘাত’ একটি শক্তিশালী অস্ত্র। জিনিওলজির অধ্যয়ন থেকে শুধু বুদ্ধিচর্চা হয় এমন নয়। এই অধ্যয়ন থেকে আবার অন্তর্ঘাত ঘটাবার রণকৌশল গড়ার উপাদানও পাওয়া যায়। মতাদর্শে এইভাবে আসে সক্রিয়তার উপাদান। উত্তর আধুনিক মতাদর্শের ভিত্তিতে যাঁরা আন্দোলন গড়ার কথা বলেন, এই ‘অন্তর্ঘাত’ সংক্রান্ত আলোচনাগুলি তাঁদের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আধুনিক মতাদর্শে ইউরোপীয় আধুনিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের যে চিন্তা আছে, ‘অর্ন্তঘাত’ সংক্রান্ত এই আলোচনা থেকে অনেকে তাতে খুঁজে পান এক জঙ্গি আন্দোলনের সম্ভাবনা। মতাদর্শ হিসেবে উত্তর আধুনিকতাবাদের আকর্ষণ গড়ে ওঠার এটা একটা অন্যতম কারণ।
উত্তর আধুনিক তত্ত্বের ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ার প্রসঙ্গে আরও দুটো শব্দ গুরুত্বপূর্ণ। একটি হল ‘contingent need’ বা আশু প্রয়োজনীয় ধারণা। অন্যটি হল ‘contextuality’ বা প্রাসঙ্গিকতা। বাচনের আন্তঃসম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা যেহেতু ভ্রান্ত এবং বাচনগুলো থেকে যেহেতু কোনো মহাবাচন গড়ে তোলা যায় না, আন্দোলন গড়ার ক্ষেত্রে তাই যেটা দেখা দরকার সেটা হল, কোন ডিসকোর্সটিতে ‘অন্তর্ঘাত’ ঘটানো আশু প্রয়োজন। আশু প্রয়োজনের বিষয়টা বুঝতে হয় সামাজিক বাস্তবতা থেকে। সামাজিক বাস্তবতা যদি আন্না হাজারের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের ডিসকোর্সটিকে প্রাধান্যে রাখে, তবে তখন ‘নর্মদা বাঁচাও’ না করে দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলনকে আশ্রয় করে এই ডিসকোর্সেই অংশগ্রহণ করতে হবে এবং দুর্নীতিকেন্দ্রিক কর্তৃত্বকারী বাচনে অন্তর্ঘাত ঘটানোর চেষ্টা করতে হবে। বাস্তবতায় ‘ওয়াল-স্ট্রিট দখল’ এসে পড়লে সেটাই হবে ‘contingent need’ বা আশু প্রয়োজনের বিষয়। এই রকম ‘contingent need’ নিয়ে আন্দোলন করার সময় আবার আন্দোলনের বিষয়টিকে ধরতে হবে তাঁর ‘context’ বা প্রাসঙ্গিকতায়। দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলনে কেউ যদি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের বিষয়টা নিয়ে আসেন, সেটা হবে অপ্রাসঙ্গিক, কেননা সে বিষয়টা আসলে সংসদ বা সংসদ বহির্ভূত রাজনীতির ডিসকোর্সের বিষয়। আন্দোলন এই জন্যই স্থানিক। এ কারণেই আবার যাঁরা একজোট হবেন একটি নির্দিষ্ট আন্দোলনে, তাঁদের দায়বদ্ধতাও স্থানিক (বিষয় নির্দিষ্ট)। বলা বাহুল্য এইসব আন্দোলনের কোনো পাকা সাংগঠনিক কাঠামো থাকবে না। যেটুকু সংগঠন গড়ে উঠবে সেটাও বিষয় নির্দিষ্ট অণু (micro) সংগঠন। সংগঠনের কাঠামো নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে। উত্তর আধুনিক চিন্তায় সাংগঠনিক কাঠামোর বিষয়টাও একটা ডিস্কোর্স, যাকে ঘিরে থাকে এক বা একাধিক বাচন যার মধ্যে একটি হল কর্তৃত্বকারী বাচন। উত্তর আধুনিকতা এই কর্তৃত্বকারী বাচনভিত্তিক সংগঠনের বিরোধিতা করে, কেননা এটা শেষ পর্যন্ত নিয়ে আসে সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণ, বলশেভিকরাশিয়ান শব্দ 'বলশেভিক... মতাদর্শ ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলি যা করে থাকে। সংগঠন হবে কর্তৃত্ববাদ বিরোধী, এর কাঠামো হবে ঢিলেঢালা, ব্যক্তি তার ইচ্ছেমতো চলবে। ঠিক কীরকম হবে এই আন্দোলন এবং এই আন্দোলন গড়ার লক্ষে ঠিক কী ধরনের সংগঠন গড়তে হবে, এ বিষয়ে স্পষ্টতার অভাব আছে উত্তর আধুনিক তত্ত্বে। যেটুকু বোঝা যায়, তার ব্যবহারিক তাৎপর্য কত, এ নিয়ে আমরা আলোচনা করব ‘মার্ক্সবাদমার্ক্সবাদ ঊনবিংশ শতা... ও উত্তর আধুনিকতা’ শীর্ষক অধ্যায়ে।
উত্তর আধুনিক তত্ত্বের দর্শন
সমস্ত তত্ত্বেরই দার্শনিক ভিত্তি থাকে। উত্তর আধুনিক তত্ত্বেরও অবশ্যই দার্শনিক ভিত্তি আছে। সেটা ঠিক কী, এটা বুঝতে সমস্যা হয় এই কারণে যে এই তত্ত্বের প্রধান রূপকাররা তাঁদের দার্শনিক অবস্থান কী, সেটা স্পষ্ট করেননি। নিটশে এবং মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয..., গ্রামশি কিংবা অ্যাডোনো-সব কিছুই পাওয়া যায় এঁদের চিন্তায়। এঁদের ঘোষিত অবস্থানে অবশ্য ধ্রুপদি দর্শনের কোনো স্থান নেই, কেননা, ধ্রুপদি দর্শনের মৃত্যু হয়েছে ধরে নিয়েই এসেছে উত্তর আধুনিকতা। এঁরা কি নিজেরা কোনো নতুন দর্শন সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন, জাঁ পল সাঁত্র ‘অস্তিত্ববাদী’ দর্শনের সাহায্যে যা করবার চেষ্টা করেছিলেন? এর উত্তর হল নেতিবাচক। তাহলে এঁদের দর্শন কী? বলা হয়, উত্তর আধুনিকতার ভিত্তিতে আছে ‘দর্শন শূন্যতা’। কথাটা চটকদার, সন্দেহ নেই। কিন্তু এর মধ্যে সারবত্তা কিছু নেই। উত্তর আধুনিক ‘টেকস্ট’ গুলির কোনো দার্শনিক ভিত্তি নেই এমন নয়। সব ‘টেকস্ট’-এর মতোই এই সব ‘টেকস্ট’-এরও দার্শনিক ভিত্তি আছে। এসবের দার্শনিক। ভিত্তিতে যা পাওয়া যায় তা দর্শন শূন্যতা নয়, শূন্যতার দর্শনও নয়। এঁদের ‘টেকস্ট’-এর বিশ্লেষণ (বিনির্মাণ) করলে বোঝা যায়, এসবের ভিত্তিতেও আছে ইউরোপীয় ধ্রুপদি দর্শনই, সযত্নে যা থেকে বাতিল করা হয়েছে বস্তুবাদ ও যুক্তিবাদের আধুনিকতা।
কথাটা ব্যাখ্যা করার জন্য প্রথমে দেখা যাক উত্তর আধুনিক ডিসকোর্স এবং ডিসকোর্সভিত্তিক ‘টেকস্ট’ কী? ডিসকোর্স হল বাচকের চিন্তায় ধরা পড়া একটি বিষয়, যেটি প্রকাশিত হয় তার ‘টেকস্ট’-এ (লিখিত বা উচ্চারিত)। ডিসকোর্সের কোনো বাচক নিরপেক্ষ অস্তিত্ব নেই। বাচকের চিন্তায় যা ধরা পড়ে, যেটা পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট ‘টেকস্ট’-এ, তার বাইরে বিষয়টির অস্তিত্ব নেই। ডিসকোর্স তাই চিন্তন সাপেক্ষ। ইউরোপীয় বস্তুবাদ যে চিন্তন নিরপেক্ষ বাস্তবের কথা বলে, উত্তর আধুনিক তত্ত্বে তার স্থান নেই। কথাটা আরও কিছুটা ব্যাখ্যা করা দরকার। বস্তু জগতে বহু কিছু থাকে, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ যার অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে না। সচেতন থাকে না বলেই তা নিয়ে তার কোনো ডিসকোর্সও থাকে না। মানুষ যে পরিমাণে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাড়তে থাকে তার ডিসকোর্স-এর পরিধি। তার ডিসকোর্সের পরিধির বাইরে বস্তুজগতের অস্তিত্ব, ডিসকোর্স না থাকার কারণে থাকতে পারে না- ডিসকোর্সের পরিধি বৃদ্ধির বাস্তবতাই এ বক্তব্যটি খণ্ডন করে। মানুষ যখন জলের প্লবতা সংক্রান্ত ডিসকোর্সের সঙ্গে পরিচিত ছিল না, জলের প্লবতার অস্তিত্ব তখনও ছিল। পৃথিবীর আহ্নিক বা বার্ষিক গতিও চিন্তন নিরপেক্ষ বাস্তব। ‘টেকস্ট’-এর বাইরে কোনো ডিস্কোর্স থাকতে পারে না, এ কথাটা তাই ঠিক নয়। বাচক সাপেক্ষে বাস্তব, বা চিন্তন সাপেক্ষ বাস্তবের যে কথা উত্তর আধুনিকরা বলে থাকেন তার মূলে আছে এই ধারণা যে মানুষের চেতনার বাইরে কোনো বাস্তব নেই। বলা বাহুল্য, এটা অনেক পুরোনো কথা এবং এর দার্শনিক উৎস ‘দর্শন শূন্যতা’ নয়। এর পিছনে আছে নির্দিষ্ট ধ্রুপদি দর্শন-ভাববাদী দর্শন।
কথাটা আরও কিছুটা আলোচনা করব। ‘টেকস্ট’ এবং তার বিনির্মাণের মধ্যে দিয়ে যা চলতে থাকে তাহল বাস্তবের সব সম্ভাব্য ব্যাখ্যার এক অবিরাম স্রোত, যেখানে কোনো চরম বাচন নেই- উত্তর আধুনিক এই বক্তব্যটিও সতর্কভাবে অনুধাবন করা দরকার। বাস্তবের নির্দিষ্ট রূপটি কী? উত্তর আধুনিক তত্ত্ব অনুসারে, বাস্তব হল ‘সম্ভাব্য সব ব্যাখ্যার অবিরাম স্রোত’-অর্থাৎ বাস্তবের কোনো নির্দিষ্ট রূপ নেই। বাচক এটিকে যেভাবে দেখে সেটাই বাস্তব। এ কথার অর্থ হল সত্যর কোনো বস্তুভিত্তি নেই। সত্য বিষয়ীভূত। সত্য নির্মিত হয়। নির্মাণকারী যেভাবে সত্যকে দেখে, সত্য সেটাই। ‘সত্য টেকস্ট-নির্ভর’ কথাটার অর্থ দাঁড়ায় সেটাই। বলা বাহুল্য এ কথাটাও দর্শন শূন্যতার কথা নয়। এ কথাটাও এসেছে ভাববাদী দর্শনের হাত ধরে। ভাববাদী দর্শনই বিষয়কে বিষয়ী সাপেক্ষ হিসেবে দেখে, বাচক সাপেক্ষ বাচন সংক্রান্ত সত্যের ধারণা এনে উত্তর আধুনিকতা ঠিক যে কাজটা করতে চায়। ভাববাদী দর্শন ভুল কি ঠিক, সেকথা এক প্রসঙ্গে অবান্তর। প্রাসঙ্গিক কথাটা শুধু এটুকুই যে উত্তর আধুনিকতার পিছনে আছে এক চমকপ্রদ নতুন দর্শন, এ কথাটা ঠিক নয়। এর জিনিওলজিতে আছে ইউরোপীয় ভাববাদী দর্শন। ভাববাদী দর্শনের কোন বিশেষ ধারায় একে ফেলা যায়, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। উত্তর আধুনিক তত্ত্বের সত্য সংক্রান্ত ধারণাটা সম্ভবত ইমানুয়েল কান্টের অজ্ঞেয়বাদী দর্শনের কাছাকাছি, যদিও ইমানুয়েল কান্টের আলোচনায় যে গভীরতা, এঁদের লেখাপত্র তার কাছাকাছি আসে না।
উত্তর আধুনিক তত্ত্ব যুক্তিবাদ বিরোধী। এই তত্ত্ব ডিসকোর্সগুলির মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক কিংবা এদের মধ্যে পরস্পরা খোঁজার ঘোরতর বিরোধী, কেননা এই ধরনের জ্ঞানচর্চা হল ‘মাস্টার ডিসকোর্স’ তৈরির জ্ঞানচর্চা যা থেকে তৈরি হয় আধিপত্যবাদী টেকস্ট, ইউরোপীয় আধুনিকতা যে কাজটা করত, যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই এসেছে উত্তর আধুনিকতা। রেনে দেকার্ত থেকে আলবার্ট আইনস্টাইন পর্যন্ত ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার একটা অত্যন্ত শক্তিশালী ঘরানাকে এভাবেই নাকচ করে উত্তর আধুনিকতা পন্থীরা। আর একটি কথাও উল্লেখ করা দরকার। যুক্তিবাদ ভুল কি ঠিক সেটা নিয়ে আলোচনা সম্ভবত এ প্রসঙ্গে অবান্তর। কিন্তু যে কথাটা একেবারেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না সে কথাটা হল, যুক্তিবাদ-বিরোধী তত্ত্ব গড়ার ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিকরা স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন, এটাও ঠিক কথা নয়। ফ্রান্সিস বেকন, রেনে দেকার্ত থেকে আলবার্ট আইনস্টাইন পর্যন্ত মনীষীরা যে চিন্তাধারায় পৃথিবীকে বুঝবার চেষ্টা করেছেন, তার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার যে ধারা, যেখানে আছে ‘অনিশ্চয়তা’র তত্ত্ব, আছে ‘বিশৃঙ্খলা’র তত্ত্ব, সেখানে এঁদের স্বকীয় অবদান কোথায়? এঁরা যুক্তিবাদের বিরোধিতা করেন ‘আধিপত্যবাদী’ বাচন গড়তে না দেবার তাগিদ থেকে। তাগিদটার পিছনে ‘রাগ’ ‘অভিমান’ ‘হতাশা’- অনেক কিছুই থাকতে পারে। কিন্তু যা নেই তা হল ‘বিশৃঙ্খলা-তত্ত্ব’ বা ‘অনিশ্চয়তা-তত্ত্ব’র মতো শক্ত বনিয়াদে দাঁড়ানো কোনো চিন্তাভাবনা। কিন্তু সে যা-ই হোক, ইউরোপে যে কার্যকারণ সম্পর্ক খোঁজার যুক্তিবাদী মতবাদের বিপরীতে এক শক্তিশালী আধুনিক মতবাদ আছে, যে মতবাদের ভিত্তিতে বহু জ্ঞানচর্চা হয়ে থাকে, উত্তর-আধুনিকতাকে ফেলা যায় জ্ঞান চর্চার সেই ধারাতেই। উত্তর আধুনিকতার দার্শনিক ভিত্তি ভাববাদ, এর আলোচনা পদ্ধতি যুক্তিবাদ বিরোধী। যাঁরা এর মধ্যে নতুন কোনো দার্শনিক নির্মাণ খুঁজবেন, তাঁরা হতাশ হবেন।
আর একটা কথাও এ প্রসঙ্গে বলা দরকার। তত্ত্বটির দার্শনিক চরিত্র নিয়ে মাথা না ঘামিয়েই যাঁরা এর মধ্যে নতুন কোনো তত্ত্ব খুঁজবেন, তারাই বা শেষ পর্যন্ত কী পাবেন? কতগুলো বিশেষ শব্দ এবং বেশ কিছু দুর্বোধ্য বাক্যজালে জড়ানো এই সব বিশেষ শব্দ-ভিত্তিক ধারণাকে ঐ সব বিশেষ শব্দ এবং সংশ্লিষ্ট বাক্যজাল থেকে মুক্ত করলে যা পাওয়া যায়, সহজ ভাষায় প্রকাশ করলে দেখা যাবে, তাতেও নতুন কিছু নেই। এই তত্ত্বে বলা হচ্ছে, যে কোনো একটা বিষয় (object)-কে বিষয়ী (subject) যেভাবে দেখে, বিষয়গত সত্য সেটাই। বিষয়ী ভেদে সত্যের রূপ ভেদ হতে পারে। রূপ ভেদ কী হচ্ছে, সেটা বোঝা যায় বিষয়টি নিয়ে বিষয়ীরা কী আলোচনা করছেন তার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে। বিষয়গুলোর মধ্যে আন্তঃ সম্পর্ক আছে কিনা, এ আলোচনা করা যাবে না কারণ কার্যকারণ সম্পর্ক বোঝার জন্য যে যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ করা হয়, পদ্ধতি হিসেবে সেটা এঁদের মতে ভুল। এই আলোচনায় সে কারণেই কোনো ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ বা বিশ্ববীক্ষা থাকে না, হেগেল(১৭৭০-১৮৩১) উনিশ শতকের প..., ‘মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... বা ইমানুয়েল কান্টের আলোচনায় যা পাওয়া যায়। এই অর্থে এই তত্ত্বে বিষয় সংক্রান্ত ইতিহাস-চর্চা থাকলেও এর কোনো ইতিহাস তত্ত্ব নেই। বস্তুত, ইতিহাস তত্ত্বের অসম্ভবতা সংক্রান্ত এর যা তত্ত্ব, সেটা আবার অনেকটা মেলে ভিয়েনা স্কুলের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা কার্ল পপারের তত্ত্বের সঙ্গে। এই রচনার তৃতীয় অধ্যায়ে এ বিষয়টি নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।উত্তর আধুনিক তত্ত্বের একটা জোরের জায়গা ক্ষমতা-সংক্রান্ত আলোচনা। ক্ষমতাকে এই তত্ত্ব বিষয় এবং বিষয়ীর মধ্যে ক্রিয়ীশীল একটা স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে দেখে। বস্তুত, মিশেল ফুকোর আলোচনা পদ্ধতিতে এই ক্ষমতার বিষয়টিকে বিপুল গুরুত্ব দিয়ে যেভাবে সেটিকে একটা স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার ভিত্তিতেই আধিপত্যবাদী বাচনের বিরুদ্ধে ‘অন্তর্ঘাতে’র মধ্য দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করার কথা এসেছে ফুকো-অনুগামীদের মধ্যে, তাতে ভাবা যেতে পারত যে উত্তর আধুনিক তত্ত্বেরও একটা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ আছে এবং সেই গ্র্যান্ড ন্যারেটিভটা হল ক্ষমতা-ভিত্তিক আলোচনা। তাতেও অবশ্য এই তত্ত্বের কোনো স্বতন্ত্র দার্শনিক উৎস নির্মাণ করা সম্ভব হত না। ক্ষমতার ভিত্তিতে সামাজিক সত্যকে বিশ্লেষণ করার কাজটা ইতিপূর্বেই নিটশে করে গেছেন। বড়ো জোর বলা যেতে পারত যে, এই তত্ত্বের দার্শনিক ভিত্তি নিটশে। সমস্যা হল, উত্তর আধুনিক তত্ত্ব এই দিক থেকেও আধাখ্যাঁচড়া। একটি বিশেষ ‘ডিস্কোর্স’-ভিত্তিক বাচনগুলিতে মিশল ফুকোর আলোচনা পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্ষমতার খেলা কীভাবে চলে সেটির হয়তো ভালো আলোচনা করা যায়। কিন্তু সব ডিসকোর্সগুলো একত্রে কীভাবে এই ক্ষমতাজালে ধরা পড়ে সে আলোচনা করা যাবে না, কারণ ডিস্কোর্সগুলির মধ্যেকার আন্ত সম্পর্ক খোঁজা উত্তর আধুনিক চিন্তা-বিরোধী। একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সমাজে আছে লিঙ্গ ভিত্তিক ক্ষমতার ডিসকোর্স, যা নিয়ে বহু আলোচনা করা যায়। সমাজে আছে রাষ্ট্র ভিত্তিক ক্ষমতার ডিসকোর্স, যা নিয়েও বহু আলোচনা করা যায় উত্তর আধুনিক চিন্তাকাঠামোতে। কিন্তু লিঙ্গ-ভিত্তিক ডিস্কোর্সে ক্ষমতার খেলার সঙ্গে রাষ্ট্র ভিত্তিক ডিস্কোর্সে ক্ষমতার খেলার কী সম্পর্ক, উত্তর আধুনিক চিন্তাকাঠামোতে সেটা ধারণ করতে গেলে কথা উঠবে পরম্পরা খোঁজা এবং কার্যকারণ সম্পর্কের যুক্তি কাঠামোর আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে কিনা। সেই সূত্রে কথা উঠবে, যুক্তিবাদের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হচ্ছে কি না এবং এখানে এসেই এ আলোচনা ইতি ঘটবে। ফলত ক্ষমতাকে অবলম্বন করে এই দুই ডিসকোর্সকে একত্রে গাঁথার কাজটা করা যাবে না। একই ভাবে অন্য ডিসকোর্সগুলির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। নিটশের দর্শনভিত্তিক এই আলোচনাও তাই থেকে যাবে অসম্পূর্ণ।
এখান থেকেই কথা উঠবে, উত্তর আধুনিক তত্ত্ব-ভিত্তিক আলোচনা পদ্ধতিতে কাঠামোগত সমস্যা আছে কিনা। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই আলোচনা পদ্ধতিতে সবকিছু নিয়েই ডিসকোর্স গড়া যায়, শুধু ‘ক্ষমতা’ নিয়ে কোনো স্বতন্ত্র ডিস্কোর্স গড়া যায় না। উত্তর আধুনিক আলোচনা পদ্ধতিতে কেন এটা সম্ভব নয়, তার যুক্তি আছে। এই আলোচনা পদ্ধতিতে ‘ক্ষমতা’কে ধরা হয় এমন একটা বিষয় হিসেবে, যা সব ডিস্কোর্সে ক্রিয়াশীল। ডিসকোর্সগুলির মধ্য দিয়েই যেহেতু ক্ষমতার প্রকাশের রূপগুলো ধরা পড়ে, ‘ক্ষমতা’র স্বতন্ত্র কোনো অভিব্যক্তি থাকে না যাকে বা যেগুলিকে নির্দিষ্ট ডিসকোর্সের বাইরে নিয়ে এসে আলোচনা করা সম্ভব। উলটোদিক থেকে ভাবা যাক। যদি এমন হত যে ‘ক্ষমতা’র নিজস্ব একটা ডিসকোর্স আছে, যা সব ডিসকোর্সেই ক্রিয়াশীল, তাহলে কী হত? তাহলে পাওয়া যেত একটা সার্বজনীন যুক্তিশৃঙ্খলে। কী দাঁড়াত তাহলে? তাহলে পাওয়া যেত একটা গ্র্যান্ড ন্যারোটিভ, যেটা উত্তর আধুনিকতার ঘোর অপছন্দ। সুতরাং আলোচনা পদ্ধতিতে থাকবে সর্বব্যাপ্ত এক ‘ক্ষমতা-কেন্দ্রিক’ ন্যারেটিভ বা বাচন-প্রতিবাচনের আলোচনা, কিন্তু সেটাকে ক্ষমতা কেন্দ্রিক মহাবাচন বলা যাবে না। যুক্তির ক্ষেত্রে এটা স্ববিরোধী।
যাঁরা উত্তর আধুনিক তত্ত্বে আস্থা রাখেন না, তাঁরা বলতেই পারেন যে উত্তর আধুনিকতাও একটা আধিপত্যবাদী ডিসকোর্স। আলোচক চান বা চান, তাঁকে মেনে নিতে হবে যে ক্ষমতার খেলার মধ্যেই থাকে চরাচরের যাবতীয় ডিসকোর্স। না মানলে বলা হবে, তিনি এক বিশেষ ডিসকোর্সের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন, মার্ক্সবাদীদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করে থাকেন উত্তর আধুনিকবাদীরা। বলা যাবে না যে এটা আসলে নিটশেবাদী চিন্তাপদ্ধতিরই আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা, আধিপত্যের শৃঙ্খল ভাঙার যুদ্ধ ঘোষণা করে যা করা হচ্ছে। অথচ, উত্তর আধুনিক যুক্তিকাঠামো অনুসরণ করলে সেটাই মনে হবে। বলা যায় যে এটা যুক্তিবাদ বিরোধী ভাববাদী এক তত্ত্ব, যার মূল কথাকে নিটশের বিশ্ববীক্ষাতেই সাজিয়ে নেওয়া যায়। মহাবাচনবাদী তত্ত্বের আধিপত্য ভাঙার জঙ্গি স্লোগান তুলে এই তত্ত্ব নিটশেবাদী মহাবাচন প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে কাজ করছে।
যেহেতু নিটশেবাদী মহাবাচন প্রতিষ্ঠার কাজটা এই তত্ত্ব করছে খণ্ড বাচনের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে, সারের বিচারে বলা যায়, তত্ত্বটি এই কাজ করছে আধাখ্যাঁচড়াভাবে। অন্য কোনো মহাবাচন যেহেতু নেই এবং সম্ভাব্য নিটশেবাদী মহাবাচন প্রতিষ্ঠার কাজটিও যেহেতু এই তত্ত্ব করে আধাখ্যাঁচড়া ভাবে, দার্শনিক জায়গায় এই তত্ত্ব শেষপর্যন্ত জোরদার করে নৈরাজ্যবাদকে। কেন একথা বলা যায়, এই রচনার দ্বিতীয় অধ্যায়ে সেটা আমরা ব্যাখ্যা করেছি। আধুনিকতার সমালোচনাকান্ত তার আদর্শবাদী দর... করতে গিয়ে কীভাবে এই তত্ত্ব নৈরাজ্যবাদী তত্ত্বে পরিণত হল, সেটা ব্যাখ্যা করতে হলে প্রয়োজন হবে এই তত্ত্বের জিনিওলজি বা বংশ চরিত্র বিশ্লেষণ করা। সে কাজটা আমরা করব এই রচনার চতুর্থ অধ্যায়ে, যেখানে আমরা উত্তর-আধুনিকতাবাদ ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে কোন সময় কীভাবে উদ্ভূত হল, সে নিয়ে আলোচনা করব। কিন্তু সে সবের আগে এই উত্তর আধুনিকতা মূলত যে মহাবাচনকে আক্রমণ করেছে সেই মার্ক্সবাদীমহাবাচন কীভাবে এই তত্ত্বকে দেখে থাকে, সেটা আমরা আলোচনা করব। মহাবাচনের পেছনে যাকে ইতিহাস-তত্ত্ব। ইতিহাস-তত্ত্ব কীভাবে আক্রান্ত হয় এই তত্ত্ব দ্বারা এবং সেই আক্রমণের ধার কতটা সেটাও আমরা আলোচনা করব তত্ত্বটির জিনিওলজিতে যাবার আগে। প্রথমে দেখব মার্ক্সবাদমার্ক্সবাদ ঊনবিংশ শতা... কীভাবে দেখে উত্তর আধুনিকবাদকে, তারপর দেখব ইতিহাস-তত্ত্ব আক্রমণ করে এই তত্ত্ব জ্ঞানচর্চাকে কোথায় নিতে চায়।
লেখক







