এডওয়ার্ড সাঈদের প্রাচ্যবাদে মার্ক্স

এডওয়ার্ড সাঈদের Orientalism প্রাচ্য-পশ্চিম সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যাখ্যা করলেও তিনি শ্রেণি-সংগ্রামকে আড়াল করে সবকিছু জাতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে দেখিয়েছেন। বিশেষত মার্ক্সকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি মানবিক সহানুভূতির দিককে ইতিবাচক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে প্রাচ্যবাদী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা এক ধরনের দ্বিমুখী ব্যাখ্যা তৈরি করে। এই লেখায় সাঈদের সেই সীমাবদ্ধতাকে আলোচনায় আনা হয়েছে।

মাহদী আমেল

দক্ষিণ লেবাননের হারুফ গ্রামে জন্ম নেন হাসান হামদান, যিনি পরবর্তীতে মাহদী আমেল নামে পরিচিত হন। শৈশবে পরিবারসহ বৈরুতে পাড়ি দিয়ে তিনি শিক্ষা লাভ করেন আল-মাকাসিদ স্কুলে, পরে প্যারিসে উচ্চশিক্ষার জন্য যাত্রা করেন। লিঁও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি অর্জনের পর তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি রাজনীতির সক্রিয় পরিসরে যুক্ত হন।

মাহদী আমেল কেবল একজন শিক্ষক বা দার্শনিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সংগ্রামী চিন্তক, যিনি তত্ত্বকে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাইতেন। সাম্প্রদায়িকতার শেকড় ও উপনিবেশিক মানসিকতার সমালোচনায় তাঁর লেখনী ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়। শ্রেণিকক্ষের ভেতর কিংবা গ্রাম-শহরের সাধারণ মানুষের কাছে—সবখানেই তিনি সহজ ভাষায় মুক্তির ধারণা পৌঁছে দিতে সচেষ্ট ছিলেন।

তিনি কবি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন—হিলাল বিন যায়তুন নামে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি লেবানন কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য হিসেবে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত থেকেছেন। ১৯৮৭ সালের ১৮ মে, বৈরুতে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন থেমে গেলেও তাঁর চিন্তা ও লেখা আজও প্রজন্মকে আলো দেখায়

জাতির চিন্তা নাকি প্রভাবশালী শ্রেণীর চিন্তা?

এডওয়ার্ড সাঈদের লেখাটি থেকে একটি উদ্ধৃতি নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু হতে পারে।  সাঈদ বলেন, “প্রাচ্যবাদী ধারণার শুরুর দিকে লোকেরা (যারা মূলত প্রাচ্যের সংস্কৃতি এবং সমাজ অধ্যয়নকারী পশ্চিমা পন্ডিত) প্রাচ্যের একটি সরলীকৃত এবং প্রায়ই বিকৃত চিত্র বা মডেল তৈরি করেছিলেন। তাদের প্রাচ্য সম্পর্কীত ধারণা প্রাচ্যের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং বাস্তবতাগুলিকে সঠিকভাবে বা সামগ্রিকভাবে উপস্থাপন করেনি। বরং, এটি প্রভাবশালী পশ্চিমা সংস্কৃতির চাহিদা এবং দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী গঠন করা হয়েছিল। তারপর পশ্চিমের প্রাচ্যবাদবিশারদরা প্রাচ্যের বিভিন্ন সমাজের প্রকৃত জটিলতা ও বৈচিত্র্যগুলিকে বোঝার চেষ্টা না করে তাদের নিজস্ব তত্ত্ব এবং ব্যবহারিক উদ্দেশ্যকে ভিত্তি দেয়ার জন্য এই সংকুচিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট মডেলটি গ্রহণ করেন।”

এই উদ্ধৃতিটি দিয়ে আলোচনা শুরু করার উদ্দেশ্য ছিলো পাঠককে এডওয়ার্ড সাঈদের “প্রাচ্যবাদ (Orientalism)” বইটির মৌলিক যুক্তির কাঠামোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া, যা এই বইয়ের পুরোটা জুড়ে তার চিন্তাভাবনা সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে পারে। প্রাচ্যবাদে আলোচিত “প্রাচ্য” আসল প্রাচ্য নয়, বরং এটি পশ্চিমা স্কলারদের দ্বারা তৈরি প্রাচ্যের একটি ধারণা। প্রাচ্য সম্পর্কে তাদের এই ধারণাটি তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে এবং প্রভাবশালী পশ্চিমা সংস্কৃতির (বিশেষ করে শক্তিশালী বুর্জোয়ারা) প্রাচ্য সম্পর্কে বিশ্বাসের সাথে মানানসই। এই সংস্কৃতিটি (পড়ুন, পশ্চিমা সংস্কৃতি) একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণীর (বুর্জোয়া) হলেও, সাঈদ এটিকে পশ্চিমা ও ইউরোপীয় সংস্কৃতি হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি একে “প্রভাবশালী” এবং “প্রধান” বলেন কারণ এটি পশ্চিমা(বুর্জোয়া শ্রেণীর শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব করার কারণে নয়)। শ্রেণির ধারণাটি স্বীকার না করে, সাঈদের সংজ্ঞাটি পশ্চিমা প্রভাবশালী সংস্কৃতির বিপরীতে অন্য কোনো বিরোধী সংস্কৃতি থাকতে পারে-এই ধারণাটিকে উপেক্ষা করে। এর ফলে, এই  প্রভাবশালী পশ্চিমা সংস্কৃতিকে বৈশ্বিক ও একক কিছু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, এতে করে বোঝা যায়- যে এটি ‘সংস্কৃতি’ শব্দ দ্বারা বোঝানো সবকিছুর প্রতিনিধিত্ব করে।

এই প্রভাবশালী সংস্কৃতি নিজেকে ছাড়া অন্য সবকিছুকে বাদ দিতে এবং নিজেকে একমাত্র সত্যিকারের “সংস্কৃতি” হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। তবে, এই সংস্কৃতি যেভাবে বাস্তবে বিদ্যমান—যেমন এটি শাসক শ্রেণীর (বুর্জোয়া) সংস্কৃতি—আর যেভাবে এটি নিজেকে পুরো জাতির সংস্কৃতি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, তার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যখন শাসক শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে (এমনকি সমালোচনামূলকভাবে) ইতিহাস দেখা হয়, তখন এই পার্থক্যটি উপেক্ষিত হয়। কিন্তু যদি আপনি ইতিহাসকে শাসক শ্রেণীর বিরোধীদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, তাহলে এই পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার জন্য বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। যার অর্থ হলো জীবনের বাস্তব, বস্তুগত অবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। যদি আমরা কোনও কিছুর বাহ্যিক রূপকে তার প্রকৃত স্বভাবের সাথে মিলিয়ে ফেলি, তাহলে ইতিহাসে বিভিন্ন ধারণার মধ্যে থাকা বৈপরীত্য এবং সংঘাতগুলি আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। এই ধরনের চিন্তাভাবনা শেষ পর্যন্ত একটি একক, একীভূত সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, কারণ এটি “সংস্কৃতি”কে শুধুমাত্র শাসক শ্রেণীর ধারণাগুলির মধ্যে দেখে। এতে বিরোধী ধারণাগুলির জন্য কোনও জায়গা থাকে না। এই ধরনের চিন্তাভাবনাকে অন্তত আদর্শবাদী বলা যেতে পারে, কারণ এটি ইতিহাসকে শাসক শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, যদিও এটি সেই ধারণাগুলিকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করে।

আমার দৃষ্টিতে, এই ধরনের চিন্তাধারা সাঈদের মার্ক্স এবং তার প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে সংযোগের বোঝাপড়াকে প্রভাবিত করে। আগের অংশের ঠিক পরেই, সাঈদ লেখেন:

“কখনও কখনও আমরা প্রাচ্য এবং পশ্চিমের মধ্যে অসম সম্পর্কের মধ্যে ব্যতিক্রম বা আকর্ষণীয় জটিলতা খুঁজে পাই। কার্ল মার্ক্স তার ১৮৫৩ সালের ভারতের ব্রিটিশ শাসনের বিশ্লেষণে এশীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ধারণাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি সেই ব্যবস্থায় ইংরেজ ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ, লোভ, এবং প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতার কারণে সৃষ্ট মানবিক দুর্ভোগকেও তুলে ধরেছিলেন। বেশ কয়েকটি নিবন্ধে, মার্ক্স ক্রমবর্ধমান দৃঢ়তার সাথে এই ধারণায় ফিরে এসেছিলেন যে, যদিও ব্রিটেন এশিয়াকে ধ্বংস করছিল, তারপরেও এটি (ব্রিটিশ উপনিবেশ) সেখানে একটি প্রকৃত সামাজিক বিপ্লবের সম্ভাবনা তৈরি করছিল। মার্ক্সের লেখা থেকে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অধীনে সমাজের সহিংস রূপান্তরের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করলে, প্রাচ্যের মানুষের ভোগান্তির  প্রতি আমাদের স্বাভাবিক সহানুভূতিও খানিকটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।”

সাঈদ যুক্তি দেন যে প্রাচ্য এবং পশ্চিমের মধ্যে একটি অসম সম্পর্ক রয়েছে, যা প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারা দ্বারা গঠিত। এমনকি যদি কোনও পশ্চিমা স্কলার প্রাচ্যবাদী নাও হন, তবুও তারা এই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেন না। এর অর্থ হল, সমস্ত পশ্চিমা চিন্তাভাবনা যে প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রাচ্যকে দেখে, সেটি এমন একটি প্রাচ্য তৈরি করে যা আসল প্রাচ্য নয়, বরং এটি পশ্চিমা ধারণাগুলির দ্বারা নির্মিত। এর ফলে, পশ্চিম এবং প্রাচ্যের মধ্যে সম্পর্ক প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, এবং কার্ল মার্ক্সসহ যেকোন পশ্চিমা চিন্তাবিদ এটি থেকে মুক্তি পেতে পারেন না। এটি কোনও নির্দিষ্ট চিন্তাবিদের ব্যাপার নয়, বরং একটি বৃহত্তর নীতির ব্যাপার, যেখানে একটি জাতির প্রভাবশালীগোষ্ঠীর চিন্তাধারা তার সমস্ত মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে। এটি প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যার মানে হল সমস্ত পশ্চিমা স্কলার এর দ্বারা প্রভাবিত হয়, কারণ কোনও স্কলার তার জাতি বা তিনি যে একাডেমিক ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত সেগুলির প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন না।

এ বিষয়ে এডওয়ার্ড সাঈদের চিন্তাধারার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি মনে করেন সমস্ত চিন্তাধারা প্রভাবশালী সংস্কৃতির দ্বারা গঠিত হয়, যা সমাজে বিদ্যমান অন্যান্য শ্রেণীর প্রভাব এবং তাদের মধ্যে নানাবিধ দ্বন্দ্বের বিষয়টি আড়াল করে দেয় ও চিন্তাধারার প্রেক্ষাপটকে সরল করে তোলে। সাঈদ এই বুদ্ধিভিত্তিক চর্চার ক্ষেত্রটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন এটি শুধুমাত্র প্রভাবশালী চিন্তাধারার সমন্বয়ে গঠিত। বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে ঐতিহাসিক সংগ্রামের ফলে উদ্ভূত অনেক বৈপরীত্যপূর্ণ ধারণার জটিল বাস্তবতাকে সাঈদ উপেক্ষা করেন। এই জটিলতাকে স্বীকার করার পরিবর্তে, সাঈদ বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রটিকে একটি একক, ঐক্যবদ্ধ কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করেন—যা মূলত শাসক শ্রেণীর চিন্তাধারা—যা পুরো জাতির চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করে। এই পদ্ধতিটিকে রাজনীতিতে আমরা যাকে প্রায়ই “জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা” বলে থাকি তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে, সাঈদ বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণার মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষকে জাতীয় চিন্তাধারা এবং ব্যক্তিগত চিন্তাধারার মধ্যে একটি বিরোধ হিসেবে রূপান্তরিত করেন। সাঈদের মতে, সাধারণ মানুষেরা তাদের জাতির প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চিন্তাধারার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে পারে না। এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চিন্তাধারা শেষ পর্যন্ত সবসময় জয়ী হয়, কারণ এটি একটি সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করে সাধারণ মানুষের উপর প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চিন্তাধারা চাপিয়ে দেয়, যা সাঈদের মতে চিন্তার ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিয়ম অনুযায়ী, খুব বিরল ক্ষেত্রে ছাড়া কেউই জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে না। যদি এমন কোনও বিরল ঘটনা ঘটে, তবে এটি আসলে নিয়মটিকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ তখন এটি একটি অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়। চিন্তার জগতে, এই ব্যতিক্রমটি প্রভাবশালী চিন্তাধারার বিপরীত। এখানে একটি প্রশ্ন তৈরি হয় যে, কেন শাসক শ্রেণীর প্রভাবশালী চিন্তাধারাকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এবং তার বিপরীত চিন্তাধারাকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়? সাঈদের প্রস্তাবিত সমস্ত চিন্তার মৌলিক রীতিতে এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। সাঈদের চিন্তার পিছনে যে যুক্তি রয়েছে তা হল একটি পরিচয়মূলক (Identity Centric) ধারা, যেখানে প্রভাবশালী চিন্তাধারাকে মানদণ্ড হিসাবে দেখা হয় এবং যে কোনও ভিন্ন চিন্তাধারাকে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

হৃদয় পূর্বে আর মস্তিষ্ক পশ্চিমে?

সাঈদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হলে মার্ক্সের কোন ধারণাগুলিকে সাঈদ ওরিয়েন্টালিস্ট চিন্তাধারার ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করেন এবং কোনগুলিকে এর অংশ হিসেবে দেখেন তার দিকে নজর দিতে হবে। সাঈদের মতে, যখন মার্ক্স ব্রিটিশ শাসনের অধীনে প্রাচ্যের মানুষের ভোগান্তির সমালোচনা করেন, তখন তিনি ওরিয়েন্টালিস্ট চিন্তাধারা থেকে সরে আসেন। তবে, সাঈদ যুক্তি দেন যে পূর্বের সমাজগুলিতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলির ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কথা বলার সময় মার্ক্স আবার ওরিয়েন্টালিস্ট চিন্তাধারায় ফিরে যান। এই ব্যাখ্যাটি উদ্বেগজনক, শুধু যে এটি কেবলমাত্র মার্ক্সের আলোচনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে তা নয়, সেইসাথে এডওয়ার্ড সাঈদ যখন মার্ক্সের লেখা ব্যাখ্যা করেন, তখন সাঈদের নিজস্ব চিন্তাধারার পদ্ধতিগত দিকটিও সামনে চলে আসে।

সাঈদের মতে, যখন মার্ক্স হৃদয় দিয়ে কথা বলেন, আবেগ ও সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করেন, তখন তিনি ওরিয়েন্টালিস্ট চিন্তাধারা থেকে সরে আসেন। তবে, যখন মার্ক্স যুক্তি প্রয়োগ করেন, তখন তিনি আবার ওরিয়েন্টালিস্ট চিন্তাধারায় ফিরে যান। সাঈদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, এটি যেন মার্ক্সের হৃদয় এবং মস্তিষ্কের মধ্যে বিভক্ত হয়ে আছেন—যেখানে তার হৃদয় প্রাচ্যের পক্ষে এবং তার মস্তিষ্ক পশ্চিমের পক্ষে। যখন মার্ক্স হৃদয় দিয়ে কথা বলেন, তখন ওরিয়েন্টালিস্ট চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। কিন্তু যখন তিনি যুক্তি প্রয়োগ করেন, তখন ওরিয়েন্টালিস্ট ধারণাগুলি পুনঃব্যক্ত হয়, বিশেষ করে প্রাচ্যে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলির ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তার প্রতি মার্ক্সের বিশ্বাসের মাধ্যমে। এডওয়ার্ড সাঈদ তার লেখায় যে ‘মানবিক সহানুভূতি’ বলেন তার সাথে ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তার উদ্দেশ্যপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মধ্যে একটি আপাতদৃষ্টিতে অমীমাংসিত বৈপরীত্য দেখা দেয়। এই দুটি ধারণা পরস্পরবিরোধী। যদি চিন্তাধারা প্রথমটিকে (মানবিক সহানুভূতি) স্বীকৃতি দেয়, তাহলে এটি প্রাচ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রাচ্যের পক্ষে দাঁড়ায়, আর যদি দ্বিতীয়টিকে (উদ্দেশ্যপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ) স্বীকৃতি দেয়, তাহলে এটি প্রাচ্যবাদকে সমর্থন করে, অর্থাৎ এটি প্রাচ্যের বিরুদ্ধে একটি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। এর থেকে এমনটা মনে হয় যে, প্রাচ্য অধ্যয়নের প্রতিটি বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক পদ্ধতি অবশ্যম্ভাবীভাবে প্রাচ্যবাদের ফাঁদে পড়ে, যার অর্থ এটি পশ্চিমা চিন্তাধারাকে অনুসরণ করে। এই যুক্তিটি বোঝায় যে যৌক্তিক চিন্তাধারাকে ‘যৌক্তিক’ হিসাবে বিবেচনা করা হয় কারণ এটি পশ্চিমা। অন্যদিকে, প্রাচ্যকে প্রকৃতপক্ষে বুঝতে হলে এবং পশ্চিমা চিন্তাধারার ফাঁদে না পড়তে হলে হৃদয় থেকে আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে এর কাছে যেতে হবে, যুক্তি দিয়ে নয়। এর মানে হলো প্রাচ্যের সংস্কৃতির “চালিকাশক্তি”গুলির সাথে সংযোগ স্থাপন করা এবং এর সাথে একাত্ম হওয়া। সাঈদের মতে, এখানেই ম্যাসিগনন নামের একজন ফরাসি প্রাচ্যবাদী তার ব্যক্তিগত অন্তর্দৃষ্টি এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মধ্য দিয়ে ‘প্রাচ্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি’ ব্যবহার করে প্রাচ্যবিষয়ক একাডেমিয়ায় তার সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছিলেন। এটি ম্যাসিগননকে অন্যান্য প্রাচ্যবাদীদের থেকে আলাদা করে তোলে কারণ তার হৃদয় ও মন প্রাচ্যের সাথে সংযুক্ত ছিল। সাঈদের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি ম্যাসিগননকে সাধারণ প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারা থেকে মুক্তি পেতে বা কখনও কখনও এর সীমার বাইরে যেতে সক্ষম করেছিল। আমরা “মাঝেমাঝে” বলছি কারণ আমরা সতর্ক থাকতে চাই যেন সাঈদ এমন কিছু বলেছেন বলে দাবি না করি যা তিনি বলেননি। যদিও  ম্যাসিগননের প্রাচ্যের “চালিকাশক্তি”গুলির সাথে আধ্যাত্মিকভাবে সংযুক্ত হওয়ার ক্ষমতাকে সাঈদ অত্যন্ত প্রশংসা করেন, তিনি তবুও স্বীকার করেন যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে, প্রাচ্য সম্পর্কে ম্যাসিগননের ধারণাগুলি খুবই প্রথাগত ছিল এবং তার প্রাচ্য সম্পর্কে অনন্য এবং অসাধারণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও তা একপ্রকার প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারারই অনুসারী ছিল। তবে, সাঈদ স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন না যে ম্যাসিগননের চিন্তাভাবনার কোন অংশের কথা তিনি বলতে চেয়েছেন। এটি পরিষ্কার করতে, আমরা পুরো অংশটি উদ্ধৃত করব, যদিও আমরা ইতিমধ্যে কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছি।

কোনও স্কলার, এমনকি ম্যাসিগননও, তার জাতি বা তিনি যে একাডেমিক ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত তা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হতে পারেননি। প্রাচ্য এবং পশ্চিমের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে ম্যাসিগননের অনেক কথাই অন্যান্য ফরাসি প্রাচ্যবাদীদের ধারণার পরিমার্জন এবং পুনরাবৃত্তি ছিল। তবে, আমাদের স্বীকার করতে হবে যে তার ব্যক্তিগত শৈলী, অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত প্রতিভা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক এবং ঐতিহ্যগত প্রভাবগুলিকে অতিক্রম করতে পারে। তবুও, কিছু ক্ষেত্রে, ম্যাসিগননের প্রাচ্য সম্পর্কিত ধারণাগুলি খুবই ঐতিহ্যবাহী/প্রথাগত ছিল এবং তার ভিন্ন ব্যক্তিত্ব এবং অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

সাঈদের এই লেখাটির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার জন্য একটি সাধারণ নিয়ম স্থাপন কর হয়। এই নিয়মটি ম্যাসিগনন এবং মার্ক্স উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এই দুজনের কথা একসঙ্গে বলছি কারণ ‘প্রাচ্যবাদ’ (এখানে এডওয়ার্ড সাঈদের বইটির কথা বলা হয়েছে)-এ এদেরকেই একমাত্র সম্ভাব্য ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এবং এই দুইজনের কাজ একে অপরকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। তারা ‘প্রাচ্যবাদে’ (বই) এ ব্যবহৃত বিশ্লেষণ পদ্ধতি এবং এর লেখকের (এডওয়ার্ড সাঈদ) সামগ্রিক যুক্তি বোঝাতেও সাহায্য করে। এই যুক্তির সমালোচনা করাটা হলো মার্ক্সের কাজের সাঈদীয় ব্যাখ্যার সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

‘প্রাচ্যবাদ’ (বই) যুক্তি দেয় যে, ম্যাসিগনন বা মার্ক্স কেউই এই জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার নিয়ম থেকে মুক্ত নয়। তবে, এই লেখাটি পরে এই দাবিটিকে কিছুটা নমনীয় করে, আরও বিমূর্তভাবে বলছে যে, ব্যক্তিগত প্রতিভার এই নিয়মটি ভঙ্গ করার সম্ভাবনা থাকতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বিরল এবং আকস্মিক হিসেবে দেখা হয়, যা যুক্তি বা যৌক্তিক নীতির দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ব্যক্তিগত প্রতিভাকে এমন কিছু হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যা জাতির চিন্তাধারা থেকে আলাদা, যা প্রভাবশালী চিন্তাধারার রূপ হিসাবে বিবেচিত হয়। এটি মনে হয় যে, সাঈদ পরোক্ষভাবে উনিশ শতকের একটি প্রচলিত ধারণার উল্লেখ করছেন, যা সমাজের মধ্যে শ্রেণিভিত্তিক সংঘর্ষকে প্রতিস্থাপিত করে ভিন্ন ধরনের একটি সংঘর্ষ—ব্যক্তি (individual)  এবং সমাজের মধ্যে কিংবা ব্যক্তি (individual) এবং জাতি বা রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষ।

জাতি ও ব্যক্তির (individual) মধ্যে সংঘাতের ধারণা কেবল জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার যুক্তির মধ্যেই কোনো অর্থ তৈরি করতে পারে। এই ধরনের চিন্তাভাবনায় জাতি সবসময়ই প্রধান অবস্থানে থাকে, আর ব্যক্তি কম গুরুত্বপূর্ণ। এই সংঘাতে জাতির প্রভাবশালী অবস্থান বজায় থাকে কারণ সংঘাতের প্রকৃতিই জাতির পক্ষে। ব্যক্তিগত চিন্তাধারা নিজেকে কখনো আলাদা করার চেষ্টা করে থাকলেও জাতির প্রাধান্য অব্যাহত থাকে।

চিন্তা বা অন্য যে কোনও ক্ষেত্রে ব্যক্তি (individual) ও জাতির মধ্যে যে কোনও সংঘাত বা দ্বন্দ্ব তৈরি হলে, জাতি সবসময়ই বিজয়ী হয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে (individual)  পিছনে ঠেলে দেওয়া হয়, এমনকি তারা অসাধারণ হলেও। জাতিকে চিরন্তন হিসেবে দেখা হয়, যা নিজেকে ক্রমাগত পুনর্নবীকরণ করে এবং প্রভাবশালী অবস্থানে থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, ইতিহাসকে কেবল জাতির ক্রমাগত নিজেকে ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে প্রমাণ করার গল্প হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসকে অপরিবর্তনীয় মনে করে, কারণ পশ্চিমকে প্রাচীন গ্রিস থেকে বর্তমান পর্যন্ত একইরকম মনে করা হয়। জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা নতুন ধারণাকে স্বাগত জানায় না, কারণ সমস্ত নতুন ধারণা ব্যক্তির কাছ থেকে আসে, কিন্তু ব্যক্তিকে তার জাতির চাপে প্রতিরোধ করতে অক্ষম হিসেবে দেখা হয়। এমনকি ম্যাসিগনন বা মার্ক্সের মতো প্রতিভাবান ব্যক্তিও প্রভাবশালী জাতীয় চিন্তাধারার প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে পারেন না।

এই জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার তত্ত্ব অনুযায়ী, সমস্ত পরিবর্তন বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে ঘটে এবং এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাজ করে। তাই, পরিবর্তন প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তন নয় বরং বিদ্যমান বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোটিকে পুনর্নবীকরণ এবং সংরক্ষণের একটি উপায়। ব্যক্তির (individual) কাছ থেকে আসতে পারতো এমন যে কোনও প্রকৃত পরিবর্তন সবসময়ই প্রভাবশালী জাতীয় চিন্তাধারার দ্বারা পরাভূত হয়, যা ব্যক্তিগত চিন্তাধারার জন্য জাতীয় চিন্তাধারাকে পরিবর্তন করা অসম্ভব করে তোলে- এমনকি যদি এটি আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে।

এডওয়ার্ড সাঈদ তার লেখায় ম্যাসিগনন এবং মার্ক্সকে প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারার ইতিহাসে দুইজন ব্যতিক্রমী চিন্তক হিসেবে উল্লেখ করে তার জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার তত্ত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তার মতে, এই দুই চিন্তকই তাদের হৃদয়ে তাদের জাতির ধারণার বিরোধিতা করেন, কিন্তু মনের দিক থেকে আবারও সেই ধারণাগুলির দিকে ফিরে যান। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাসিগনন তার অনন্য পদ্ধতির মাধ্যমে আধ্যাত্মিকভাবে প্রাচ্যের সাথে যুক্ত হন, যা তাকে প্রথাগত প্রাচ্যবাদী চিন্তাভাবনা থেকে দূরে সরে যেতে সহায়তা করে। তবে, সাঈদ উল্লেখ করেছেন যে প্রাচ্য সম্পর্কে তার চিন্তাধারার একটি ক্ষেত্রে ম্যাসিগনন এই পুরনো কাঠামোর মধ্যে ফিরে আসেন। সাঈদ উল্লেখ করেন যে ম্যাসিগনন বিশ্বাস করেন প্রাচ্য এবং পশ্চিমের মধ্যে মূল পার্থক্য আধুনিকতা এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে। রাজনৈতিক এবং সমসাময়িক বিষয়গুলির উপর তার লেখায় প্রাচ্য-পশ্চিমের বিভাজন একটি অদ্ভুত উপায়ে প্রকাশিত হয়, যা ম্যাসিগননের পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাগুলি প্রকাশ করে।

এই লেখাটিতে সাঈদ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন যে, ম্যাসিগননের চিন্তাভাবনা প্রথাগত এবং প্রাচ্যবাদীই রয়ে গেছে—বিশেষ করে আধুনিকতা এবং রাজনীতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে। এটি উল্লেখ করে সাঈদ যুক্তি দেন যে, কোনও ব্যক্তির পক্ষে নিজ জাতির (পশ্চিমা জাতি) চিন্তাধারার পুরোপুরি বিরোধিতা করা বা এর রাজনৈতিক চাপ প্রতিরোধ করা কঠিন।

এই উদ্ধৃতিটি আরও একটি উদ্বেগজনক ধারণা তুলে ধরে: ম্যাসিগননের আধুনিকতা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি প্রাচ্যের প্রাক-আধুনিক ঐতিহ্য সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির থেকে ভিন্ন। যদি তার আধুনিকতা সম্পর্কে ধারণা প্রাচ্যবাদী হয়, তবে প্রাচ্যের ঐতিহ্য সম্পর্কে তার ধারণা তাদের বিষয়বস্তুকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করে। এটি নির্দেশ করে যে কেবল একটি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিই এই বিষয়ের সাথে সত্যিকারের সংযোগ স্থাপন করতে পারে।

এখানে একটি প্রশ্ন তৈরি হয় যে, বক্তব্যটি কি প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমাদের প্রথাগত ধারণাকে সমর্থন করছে না, যা আধ্যাত্মিক প্রাচ্যকে বস্তুবাদী পশ্চিম থেকে আলাদা করে? এর অর্থ কি সাঈদের সমালোচনা সম্পূর্ণভাবে প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারা থেকে মুক্ত নয় বরং এখনও এটি দ্বারা প্রভাবিত?

সাঈদের সমালোচনায়, মার্ক্সকেই বেশী সমালোচিত হতে হয়েছে এবং তিনি ম্যাসিগননের মতো কোনও প্রশংসা পাননি। সাঈদের মতে, প্রাচ্য নিয়ে মার্ক্সের লেখাগুলি আপাতদৃষ্টিতে প্রাচ্যবাদী চিন্তাধারার ব্যতিক্রম মনে হলেও,  প্রকৃতপক্ষে কোনও ব্যতিক্রম নয়। সাঈদ তার যুক্তি মার্ক্সের একটি মাত্র লেখার উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন এবং তার বক্তব্যকে কোনোরকম সন্দেহ ছাড়াই আত্মবিশ্বাসের সাথে উপস্থাপন করেছেন। তিনি মার্ক্সের শব্দগুলোকে সেই একই যুক্তি ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করেন যা তিনি প্রাচ্যবাদ এবং এর বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর সামগ্রিক বিশ্লেষণে প্রয়োগ করেছেন। নিচে সেই নির্দিষ্ট লেখাটি দেওয়া হলো যেটির উপর সাঈদ তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন:

এশিয়ার অনেক পরিশ্রমী, শান্তিপ্রিয় গ্রামকে ভেঙে যেতে এবং তাদের মানুষদের প্রাচীন জীবনধারা ও জীবিকার উপায় হারাতে দেখা খুব কষ্টের। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এই গ্রামগুলোই (এখানে গ্রাম বলতে প্রাচীন পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক সংগঠন বুঝানো হয়েছে) ছিল পূর্বের অত্যাচারী শাসনের ভিত্তি। তারা মানুষের চিন্তাভাবনাকে সীমাবদ্ধ করেছিল, তাদেরকে কুসংস্কারে আটকে রেখেছিল, আর তাদেরকে ঐতিহাসিক অগ্রগতির পথ থেকে দূরে রেখেছিল।

ইংল্যান্ড ভারতে সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিল তাদের স্বার্থপর উদ্দেশ্যে এবং ভুলভাবে করা। তবে সেটাই মূল বিষয় নয়। আসল প্রশ্ন হলো: এশিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়া কি মানবজাতি তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে? যদি না পারে, তাহলে ইংল্যান্ড যত অন্যায়ই করুক, তারা এই বিপ্লব আনার জন্য ইতিহাসের অজান্তেই এক হাতিয়ার ছিল।

তাই, যদিও একটি প্রাচীন সমাজের পতন আমাদের জন্য দুঃখের, ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের গ্যেটের মতো বলার অধিকার আছে:

“তাহলে কি এই যন্ত্রণা আমাদের কষ্ট দেবে, 

যদি তা আনন্দ নিয়ে আসে?

তিমুরের শাসন কি অসংখ্য জীবন গ্রাস করেনি,

তবুও ইতিহাস এগিয়ে যায় এবং টিকে থাকে।”

এই উদ্ধৃতিটি তিনটি অনুচ্ছেদ নিয়ে গঠিত। প্রথম দুটি অনুচ্ছেদে, মার্ক্স ইংরেজ ঔপনিবেশিকতা এবং ভারতের মধ্যে সম্পর্ক এবং এটি কীভাবে ভারতীয় সমাজে প্রভাব ফেলেছে তা ব্যাখ্যা করেছেন। তৃতীয় অনুচ্ছেদে, তিনি তার যুক্তিকে সমর্থন করার জন্য গ্যেটের একটি কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এই উদ্ধৃতির সঠিক ব্যাখ্যার জন্য প্রথম দুটি অনুচ্ছেদের ওপর নির্ভর করতে হবে, কারণ সেগুলো গ্যেটের কবিতা উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহারের অর্থের একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়।

তাহলে মার্ক্স এই অনুচ্ছেদগুলোতে কী বলছেন? যদি আমরা এই প্রশ্নটি করি, এর উত্তর মার্ক্সের নিজের কথায় নিহিত, গ্যেটের উদ্ধৃতিতে নয়। যদি আমরা পাঠ এবং উদ্ধৃতির সম্পর্ক উল্টে দিই, তবে উভয়ের অর্থ বিকৃত হয়ে যায়।  কিন্তু এডওয়ার্ড সাঈদ ঠিক এই কাজটিই করেছেন। সাঈদ প্রথম দুটি অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করে কেবল গ্যেটের উদ্ধৃতি থাকা তৃতীয় অনুচ্ছেদের উপরই মনোযোগ দেন, এবং এটি মার্ক্সের চিন্তাধারার প্রেক্ষাপট থেকে সরিয়ে তার নিজের প্রেক্ষাপটে বসিয়ে দেন, যার ফলে এটি একটি ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে। এতে করে মার্ক্সের ভাবনাগুলোকে গ্যেটের কবিতা দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে, এবং সাঈদ এটিকে মার্ক্সের চিন্তার প্রেক্ষাপটে না রেখে নিজের চিন্তার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছেন।

যখন আমরা মার্ক্সের মূল পাঠ্যে ফিরে যাই, তখন আমরা দেখতে পাই যে প্রথম দুটি অনুচ্ছেদে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সাধারণ দ্বান্দ্বিক গতিশীলতা স্পষ্ট হয়। আমরা প্রথম দুটি অনুচ্ছেদে একটি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের উপর ভিত্তি করে একটি দ্বান্দ্বিক যুক্তি দেখতে পাই, যেখানে তিনি আলোচনা করছেন কীভাবে ইংরেজ ঔপনিবেশিকতা এবং পুঁজিবাদী সম্প্রসারণ ভারতের ‘পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক সংগঠন’ গুলোকে ধ্বংস করেছে। তিনি ঔপনিবেশিকতাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে “বেদনাদায়ক” বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু এটি শুধুমাত্র ধ্বংসাত্মক প্রভাবের বর্ণনা নয়। বরং, মার্ক্সের মূল প্রশ্ন হলো, “এশিয়ার সমাজে একটি মৌলিক বিপ্লব ছাড়া কি মানবজাতি তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে?” এই বিপ্লব এবং মানবমুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপরই তার লেখার মূল গুরুত্ব।

যদি আমরা এই পাঠ্যের প্রথম অনুচ্ছেদটি শান্তভাবে এবং যুক্তিযুক্তভাবে পড়ি, তবে আমরা দেখব যে, মার্ক্সের মতে, এশিয়ায় “পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক সংগঠনগুলি,” যা সর্বদা দমনমূলক শাসকদের সমর্থন করেছে এবং এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক শক্তিকে ক্ষয় করেছে, সেগুলি মানুষের মুক্তির পথে বড় বাধা। মার্ক্স যুক্তি দেন যে ইতিহাসকে এগিয়ে নিতে এবং মানবতাকে মুক্ত করতে হলে এই সমাজগুলিকে ভেঙে ফেলতে হবে। এটি ইতিহাসের একটি অপরিহার্য অংশ—বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা। মার্ক্স এশীয় সমাজগুলির ধ্বংস এবং ভাঙনকে ‘ঐতিহাসিক পরিবর্তনের অনিবার্য পথে’ থাকা একটি অংশ হিসেবে দেখেন ইতিহাসের অভীষ্ট গতিপথের কারণে, নৈতিক বা মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে নয়।

তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাকে এই বিপ্লব শুরু করার জন্য ইতিহাসের ‘অচেতন হাতিয়ার’ হিসেবে দেখেন। এখানে লক্ষণীয় যে এই বাক্যাংশটির আরবি অনুবাদ সঠিক নয়। মূল ইংরেজিতে বলা হয়েছে ‘বিপ্লব আনা’, ‘বিপ্লব সফলভাবে অর্জন করা’ নয়, যেমনটি আরবি অনুবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। সাঈদের ব্যাখ্যায় মার্ক্সের লেখাকে যদি বিকৃত না করা হতো, তাহলে এই অমিলটি হয়তো এতটা গুরুত্বপূর্ণ হতো না। তবে, এই ভুল অনুবাদ সাঈদের ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। বিপ্লব আনা এবং তা সফলভাবে সম্পন্ন করার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যটি ইতিহাসের বস্তুগত, অভীষ্ট গতিশীলতার এবং একটি আদর্শবাদী ইতিহাসের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্যকে তুলে ধরে, যেখানে পুরোনোকে ধ্বংস করে নতুন কিছু সৃষ্টি করা হয়। অন্যদিকে আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বস্তুগত বৈপরীত্যগুলোকে উপেক্ষা করে এবং ইতিহাসকে কেবলমাত্র একটি “নির্জীব এশিয়ার পুনর্জন্ম” হিসেবে দেখে, যা সাঈদের ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত একটি বাক্যাংশ।

মার্ক্স ইংল্যান্ডকে “ইতিহাসের অচেতন হাতিয়ার” হিসেবে যেভাবে দেখেন এবং সাঈদ যেভাবে এটি ব্যাখ্যা করেন, তার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। মার্ক্সের দৃষ্টিতে, ইংল্যান্ড একটি উদ্দেশ্যমূলক, বস্তুগত প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে ইতিহাস একটি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী যুক্তি অনুসরণ করে এবং মানব চেতনা বা ইচ্ছার পরোয়া না করেই এগিয়ে যায়। অন্যদিকে, সাঈদের ব্যাখ্যায় ইংল্যান্ডকে ইতিহাসের একটি মূল খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ঘটনাগুলি ইচ্ছাকৃত, আদর্শগত যুক্তির ভিত্তিতে ঘটে, যা ওরিয়েন্টালিস্ট বা ঔপনিবেশিক চিন্তাধারায় নিহিত। এই পার্থক্যটি ইতিহাসের একটি বস্তুবাদী এবং আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বৈপরীত্যকে তুলে ধরে। মার্ক্সের লেখাকে দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি (আদর্শবাদী) থেকে ব্যাখ্যা করা ভুল, যেমনটি এডওয়ার্ড সাঈদ করেন। এটি বিশেষ করে মার্ক্সের পাঠ্যের তৃতীয় অনুচ্ছেদে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে তিনি গ্যেটের উদ্ধৃতি দেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে তিনি “ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে” কথা বলছেন, একটি বাক্যাংশ যা পুরো পাঠ্যের অর্থকে সংক্ষিপ্ত করে এবং মার্ক্স কীভাবে গ্যেটের কবিতার লাইনগুলিকে বোঝেন তা ব্যাখ্যা করে। সাঈদের ব্যাখ্যা কেবল মার্ক্সের পাঠ্যের প্রথম দুটি অনুচ্ছেদকে উপেক্ষা করে না, বরং শেষ অনুচ্ছেদের এই গুরুত্বপূর্ণ বাক্যাংশকেও বাদ দেয়, যা মার্ক্সের বার্তাটি বোঝার জন্য অপরিহার্য।

এটি বিবেচনা করে, সাঈদের ব্যাখ্যাটি আসলে কী বলে? আসুন এটি আরও গভীরভাবে দেখি। সাঈদ বলেন:
যে উদ্ধৃতিটি মার্ক্সের ‘যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আনন্দ পাওয়ার’ ধারণাকে সমর্থন করে, সেটি  Westölicher Diwan থেকে নেওয়া হয়েছে এবং এটি ওরিয়েন্ট সম্পর্কে মার্ক্সের ধারণার উৎস চিহ্নিত করে। এই ধারণাগুলি রোমান্টিক এবং কিছুটা মেসিয়ানিক (উদ্ধারমূলক), যেখানে ওরিয়েন্টের মানুষের গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়েছে, যেন তারা শুধু রোমান্টিক মুক্তির একটি অংশ। যদিও মার্ক্স মানুষের কষ্ট এবং দুর্ভোগের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণগুলো এই প্রচলিত ওরিয়েন্টালিস্ট চিন্তাভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। শেষ পর্যন্ত, রোমান্টিক ওরিয়েন্টালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি জয়ী হয় এবং মার্ক্সের সামাজিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্ব এই প্রচলিত ধারণার মধ্যে হারিয়ে যায়:

‘ইংল্যান্ডকে ভারতে দুটি কাজ করতে হবে: একদিকে এশিয়ার পুরনো সমাজকে ধ্বংস করা এবং অন্যদিকে সেখানে পশ্চিমা সমাজের ভিত্তি স্থাপন করা।’

এশিয়াকে একটি ‘নিষ্প্রাণ’ অঞ্চল হিসেবে পুনর্জীবিত করার ধারণাটি নিখাদ রোমান্টিক ওরিয়েন্টালিজমের উদাহরণ, কিন্তু একই লেখক, যিনি মানুষের কষ্ট সহজে ভুলতে পারেননি, তার কাছ থেকে এই মন্তব্যটি আশ্চর্যের। এটি আমাদের প্রথমে এই প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: কীভাবে মার্ক্সের নৈতিক সমালোচনা, যেখানে তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা করেছিলেন, আবার পূর্ব-পশ্চিমের পুরনো বৈষম্যের দিকে ফিরে গেল? দ্বিতীয়ত, আমরা জিজ্ঞাসা করতে পারি: সেই মানবিক সহানুভূতি কোথায় গেল, যখন প্রাচ্যবাদী চিন্তাভাবনা তার জায়গা নিল?

নৈতিক বিচার

আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে মার্ক্সের আসল লেখা এবং সাঈদের ব্যাখ্যা উভয়কেই পুরোপুরি উদ্ধৃত করেছি। সাঈদের পুরো ব্যাখ্যাটি মূলত মার্ক্সের একটি মাত্র লেখার ওপর ভিত্তি করে, এবং Orientalism বইতে সাঈদের মতামতকে সমর্থন করার জন্য মার্ক্সের অন্য কোনো লেখা উল্লেখ করা হয়নি। সাঈদের বিশাল প্রকল্পের গঠন বিবেচনা করে, আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এমন একটি বড় সমালোচনা কি শুধুমাত্র একটি লেখা থেকে করা যেতে পারে? Orientalism-এ আরও লেখার উল্লেখ না করে, আমরা কেবল পাঠকদের অনুরোধ করি যে তারা মার্ক্সের লেখা অংশের সঙ্গে সাঈদের ব্যাখ্যার তুলনা করে নিজেরা বিচার করুন।

মার্ক্সের লেখায়, পাঠকরা ইতিহাসকে বস্তুগতভাবে দেখার একটি দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পাবেন, যেখানে মানুষের ইচ্ছার পরিবর্তে ইতিহাসের কার্যক্রমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাঈদের “যন্ত্রণা থেকে আনন্দ” তত্ত্বের সাথে একেবারেই মিলছে না। সাঈদের ব্যাখ্যা শুরু থেকেই একটি বড় ভুল ধারণা দেয়, শুধু এই নির্দিষ্ট লেখার নয়, পুরো মার্ক্সবাদী চিন্তাধারার ক্ষেত্রেও। কারণ সাঈদ মার্ক্সের চিন্তার ভিত্তিতে থাকা বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দেন, যা আসলে প্রাচ্যবাদী চিন্তার বিপরীতে মার্ক্সের দৃষ্টিভঙ্গির নতুনত্বকে অস্বীকার করে।

যারা প্রাথমিকভাবে মার্ক্সবাদ সম্পর্কে জানেন, তাদের কাছে সাঈদের এই বিকৃতি চিন্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক হওয়া উচিত। মার্ক্সবাদের মূল ধারণা হলো যে ইতিহাস বস্তুগত শক্তি ও আইন দ্বারা চালিত হয়, যা বিপ্লবী পরিবর্তনকে অপরিহার্য করে তোলে। মার্ক্সের মতে, ইতিহাস মানুষের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষ ইতিহাসকে নয়। সাঈদ এই মৌলিক ধারণাটিকে চিন্তায় নেন না। হয়তো তিনি বোঝেন না—বা ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করেন—মার্ক্সের বিপ্লবের ধারণাটি কতটা নতুন এবং ভিন্ন ছিল, বিশেষত সেই সময়ের আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুলনা করলে যা বিপ্লবকে শুধু রোমান্টিক বা খ্রিস্টান মিশন হিসেবে দেখত, যেখানে মানব আত্মাকে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়।

মার্ক্সবাদী চিন্তাধারাকে খ্রিস্টান বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে বলার ধারণাটি আসলে একটি পুরনো তত্ত্ব। এটি বুর্জোয়া সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শ ব্যবহার করেছে, যাতে বিপ্লবী চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়। আজকের দিনে অধিকাংশ গবেষক এই তত্ত্বকে গ্রহণ করেন না। তাহলে কেন Orientalism-এর লেখক সাঈদ এটিকে এত উৎসাহের সাথে সমর্থন করেছেন? সাঈদের প্রাচ্যবাদ এবং অন্যান্য সমালোচনার মাধ্যমে এর কারণ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

এখানে আমরা বলতে চাই যে সাঈদের ব্যাখ্যা শুধু মার্ক্সের প্রাচ্য সম্পর্কিত মতামতকেই নয়, পুরো মার্ক্সবাদী তত্ত্বের কাঠামোকে অভিযুক্ত করে। সাঈদ যখন মার্ক্সের ধারণাগুলোর বস্তুবাদী ভিত্তি অস্বীকার করেন, তখন তিনি মার্ক্সবাদের বিপ্লবী নতুনত্ব এবং প্রভাবশালী বুর্জোয়া চিন্তাধারার বিরোধিতাকেও অস্বীকার করেন। সাঈদের ব্যাখ্যা মার্ক্সবাদী চিন্তাধারাকে মূলধারার বুর্জোয়া কাঠামোর মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, যেন এটি সেই সিস্টেমেরই আরেকটি অংশ।

বুর্জোয়া চিন্তাধারার এই পুরনো ধারণাকে আবার সামনে এনে, সাঈদের ব্যাখ্যা বলছে যে এমনকি মার্ক্সও তার জাতির প্রভাবশালী চিন্তাধারা থেকে মুক্ত হতে পারেন না। এই যুক্তি অনুযায়ী, যদি বিকল্প কোনো ধারণা থাকেও, তাও প্রভাবশালী কাঠামোর মধ্যেই আটকে যাবে, চাইলেও তা পুরোপুরি ছাড়াতে পারবে না। এই ধারণায় বিপ্লব আর একটি প্রয়োজনীয় ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। বরং, এটি আরেকটি রোমান্টিক ভাবনা হয়ে যায় যা প্রভাবশালী চিন্তাধারার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে—যেন এটি মানুষের আত্মাকে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আনন্দ এনে মুক্তি দেওয়ার আরেকটি খ্রিস্টান প্রকল্প।

বৈরুত: দার আল-ফারাবি, ৩য় সংস্করণ, ২০০৬ (প্রথম প্রকাশ ১৯৮৫ সালে)।

লেখকবৃন্দ

দক্ষিণ লেবাননের হারুফ গ্রামে জন্ম নেন হাসান হামদান, যিনি পরবর্তীতে মাহদী আমেল নামে পরিচিত হন। শৈশবে পরিবারসহ বৈরুতে পাড়ি দিয়ে তিনি শিক্ষা লাভ করেন আল-মাকাসিদ স্কুলে, পরে প্যারিসে উচ্চশিক্ষার জন্য যাত্রা করেন। লিঁও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি অর্জনের পর তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি রাজনীতির সক্রিয় পরিসরে যুক্ত হন।

মাহদী আমেল কেবল একজন শিক্ষক বা দার্শনিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সংগ...

খায়রুল হাসান জাহিন ক্রিমসন থিওরির  উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন। বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থায় তরুণ গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তার আগ্রহের বিষয় স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফর্মেশন, ইকোলজিক্যাল ইকোনমিক্স।

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন

Scroll to Top