ভারতে হিন্দু রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোটি কারা তৈরি করেছে? আপনার মনে হতে পারে শুধু গেরুয়া জোব্বা বা খাকি শর্টস (রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ বা আরএসএস) পড়া মানুষেরাই এটি তৈরি করেছে। কিন্তু দ্য অয়ারের এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণ বলছে যে দশকের পর দশক ধরে অত্যন্ত খ্যাতিমান, বিপ্লবী ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ, যারা ভারতীয় মনকে উপনিবেশিকতার প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে সংগ্রাম করেছিলেন, তারাই অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই অস্ত্রগুলিকে ধার দিয়েছেন। যা এখন ভারতীয় প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এরকম দাবি অত্যন্ত অস্বস্তিকর এবং একইসাথে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ। মীরা নন্দা তাঁর সাম্প্রতিক প্রকাশিত বই ‘পোস্টকলোনিয়াল থিওরি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব হিন্দু ন্যাশনালিজম’-এ এই বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন।
আমাদের বোঝা উচিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম বা সেমিনার থেকে আসা কোনো একটি তত্ত্ব বা ধারণা কেবল ক্লাসরুমেই আটকে থাকেনা। এগুলো সেমিনার থেকে অ্যাকাডেমিক জার্নাল, বইপত্র ঘুরে রাজনৈতিক বক্তব্যে চলে আসে। একসময় কিছু এরকমই কিছু অ্যাকাডেমিক ধারণা আইন কিংবা রাষ্ট্রের দর্শনে পরিণত হয়ে আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এখানে আমরা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক ধারণা নিয়ে কথা বলবো যেগুলোর উদ্দেশ্য অন্যরকম থাকলেও, প্রায়োগিক দিক বিবেচনা করলে এগুলো হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের ধারণাকে পোক্ত করেছে।
প্রথম অভিযোগ: সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতায় রূপান্তরিত করা।
এই তত্ত্বটি একসময় অত্যন্ত বৈপ্লবিক বলে মনে করা হতো। বছরের পর বছর উত্তর আধুনিকতাবাদী চিন্তকেরা এর পক্ষে যুক্তিও দেখিয়েছেন। যেমন, আশিস নন্দী তাঁর বই ‘ দ্য ইন্টিমেট এনিমি : লস অ্যান্ড রিকভারি অব সেলফ আন্ডার কলোনিয়ালিজম’-এ ঔপনিবেশিকতার সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে ভারতবর্ষের সম্পদ লুট করা নয়, বরং আমাদের মনের উপনিবেশায়নকে বেশী দায়ী করেন। তাঁদের মতে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা, আইনের শাসন ইত্যাদির পশ্চিমা ধারণাগুলো আমাদের মধ্যে একটি মানসিক খাঁচা তৈরি করে। সুতরাং, এসব ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা-ভাবনা এক প্রকার করুণ অনুকরণ প্রবণতা ও মানসিক দাসত্বে ভোগার পরিণাম।
‘মানসিক দাসত্ব’ শব্দটির সাথে আমাদের অনেকেরই হয়ত পরিচয় তৈরি হয়েছে। কারণ এটিই এখন ভারতের সরকারি নীতির মধ্যে পড়ে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রায়ই তার বক্তৃতায় মানসিক দাসত্ব বা তার ভাষায় ‘গোলামি কা মানসিকতা’ পরিত্যাগ করার কথা বলেন। তিনি মুঘল শাসন ও ব্রিটিশ রাজকে একত্রিত করে ১২০০ বছরের দাসত্বের কথা বলে একটি বিভ্রান্তিকর কড়চা দেন। জে সাঁই দীপকের বিপুল জনপ্রিয় বই ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত’ (India That Is Bharat)-এর মোদ্দা কথাও এই ধারণাটি। তিনি ভারতীয় সংবিধানকে কেবল একটি ঔপনিবেশিক দলিল বলে মনে করেন।
ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের এই ধারণাটির সাথে উত্তর আধুনিকতাবাদী বামপন্থিদের সংযোগটি এখানে খুবই স্পষ্ট। উত্তর আধুনিকতাবাদীরা হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের বুদ্ধিবৃত্তিক পাটাতন তৈরি করেছে ও নৈতিক বৈধতা দিয়েছে। তারা বৈশ্বিক বা সার্বজনীন ধারণাগুলোকে বিদেশি বিষ হিসেবে দেখাকে অত্যন্ত কেতাদুরস্ত ব্যাপার হিসেবে প্রতীয়মান করেছিলেন। এর ফলে আপনি যখনই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, আপনাকে ‘মেকলে পুত্র’ বা উপনিবেশবাদী ব্রিটিশ লর্ড মেকলের সন্তান হিসেবে অবহিত করা হবে। যখন আপনি ধর্ম নিরপেক্ষতা পক্ষে যুক্তি দেবেন, তখন বলা হবে আপনার মধ্যে গোলামির মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
ডানপন্থিরা একটি অ্যাকাডেমিক সমালোচনাকে তাদের অস্ত্রে পরিণত করে যে-কোনো বিরুদ্ধমত বা প্রতিবাদকে এন্টি-ন্যাশনাল বা বিজাতীয় বলে চিহ্নিত করে। এরা অ্যাকাডেমিক সমালোচনার জবাব দেওয়ার বদলে, তারা সমালোচকের পরিচয়কে আক্রমণ করে। সামাজিকই মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় যে সমালোচকদের বিদেশি এজেন্ট, দেশদ্রোহী, বিজাতীয় বা ঔপনিবেশিক বলে গালি দেয়া হয়। আইডিয়া বা ধারণা নিয়ে বিতর্ক না করে, তারা মানুষকে অভিযুক্ত করে। এর ফলে প্রকৃত আলোচনা বন্ধ হয়ে যায় এবং ভিন্নমতকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে চিহ্নিত করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগ : বিজ্ঞানকে একপ্রকার ভিন্ন বিশ্বাস-পদ্ধতি বানিয়ে দেওয়া।
কিছু অ্যাকাডেমিক ধারণায় বলা হয়েছে যে আধুনিক বিজ্ঞান কোনো সার্বজনীন সত্য নয়। বন্দনা শিবা, ক্লদ আলভারেজরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান শুধু খ্রিষ্টান ও পশ্চিমা সমাজের এথনোসায়েন্স বা জাতিগত বিজ্ঞান। তাদের মতে, আধুনিক বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠতা আদতে মিথ। আর ভারতীয় শাস্ত্র ও লোকায়ত চিকিৎসাপদ্ধতি কে আধুনিক বিজ্ঞানের মানদণ্ডে বিচার করাও এক ধরনের দাম্ভিকতা। তাদের মতে সমস্ত জ্ঞান পদ্ধতি সমান। তাদের এই অ্যাকাডেমিক বক্তব্যের ফলাফল কী ছিলো?
এই ধারণাকে পুঁজি করে রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই এক উন্মত্ততার মধ্যে লিপ্ত হয়েছে। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে দাবি তোলা হচ্ছে যে প্রাচীন ভারতীয়রা উড়োজাহাজ চালিয়েছে। আয়ুষ মন্ত্রণালয় জনগণের করের টাকায় স্ফীত হয়ে কোভিড-১৯ থেকে শুরু করে ক্যানসার পর্যন্ত সারিয়ে তোলার বিপজ্জনক আর অপ্রমাণিত দাবি করছে। স্কুলে স্কুলে চাপানো হচ্ছে বৈদিক গণিত। এই বৈদিক গণিত আদতে প্রচলিত গণিতের কিছু কৌশল মাত্র, যার না আছে বৈদিক সত্যতা, না আছে গাণিতিক গভীরতা। শুধু প্রাচীন জ্ঞান বলে একে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এখানে যুক্তি দেখানো হচ্ছে যে, যদি বিজ্ঞান কেবলমাত্র পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের (Western way of knowing) একটি বিশেষ পদ্ধতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে বৈদিক বিজ্ঞান কেনই বা ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্বের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হবে না?
মিরা নন্দার মতে, এভাবে সত্যকে আপেক্ষিকীকরণ (relativizing truth) করার ফলে জ্ঞানক্ষেত্রে কোনো স্থির মানদণ্ড থাকে না। কী সত্য আর কী মিথ্যা সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে না। একে তিনি বৌদ্ধিক শূন্যতা বলেছেন। এই অবস্থায় সব জ্ঞানপ্রণালীকে সমান করে ফেলা হলো। অর্থাৎ, বিজ্ঞানের বিশেষ মর্যাদা ও যাচাইযোগ্যতার ক্ষমতা কেটে দেওয়া হলো। এতে একদিকে সত্যিই সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যুক্ত কর্তৃত্বের ছায়া দুর্বল হলো। কিন্তু অন্যদিকে, যে শূন্যতা তৈরি হলো সেখানে নতুন আরেক শক্তি প্রবেশের সুযোগ পেল। এই শূন্য জায়গা দখল করলো রাষ্ট্র-সমর্থিত কুসংস্কার। এবং তারা নিজেদের উপস্থাপন করলো বিউপনিবেশায়নের (decolonization) পতাকা উঁচিয়ে। ফলে এমন এক সাংস্কৃতিক ফাঁদ তৈরি হলো। যেখানে কুসংস্কারকে সমালোচনাকান্ত তার আদর্শবাদী দর... করা মানেই হলো বিউপনিবেশায়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
তৃতীয় অভিযোগ : ধর্মনিরপেক্ষতাকে (secularism) একটি বিদেশি ব্যাধি হিসেবে আক্রমণ করা।
দশকের পর দশক ধরে টিএন মদন এবং আশিস নন্দীর মতো প্রখর মেধাবী চিন্তকেরা আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন যে ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতের জন্য একটি বহিরাগত ধারণা। তাদের মতে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি ইউরোপীয় ধারণা, যা কি না পশ্চিমা সমাজের চার্চ ও রাষ্ট্রের মধ্যে লড়াইয়ের একটি ফলাফল। তারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে ভারতের সহনশীল হওয়ার নিজস্ব প্রাকৃতিক ও খাঁটি পথ রয়েছে যার জন্য বিদেশি কোনো ধারণার প্রয়োজন নেই। অ্যাকাডেমিক মহলে এই ব্যাখ্যা যতই পরিশীলিত মনে হোক না কেন, বাস্তবে এখান থেকেই রাজনৈতিক মহলে উঠে এসেছে আজ বহুল ব্যবহৃত পরিভাষা—‘নকল ধর্মনিরপেক্ষতা’ বা সিউডো সেক্যুলারিজম।
হিন্দু দক্ষিণপন্থিরা সরাসরি বলে না যে তারা ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধী। বরং তারা দাবি করে যে তারা ‘সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতা’-র পক্ষে, যা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের বিশ্বাসকে সম্মান করে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (Citizenship Amendment Act)-কে ন্যায্য প্রমাণিত করতেও ঠিক এই একই যুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল।
ভারতের ডানপন্থি নব্য বুদ্ধিজীবী রাজীব মালহোত্রা থেকে কেন্ট স্কুল পর্যন্ত বারবার বলছে যে ধর্মনিরপেক্ষতা খ্রিষ্টান ঐতিহ্যের ধারণা। তাই ধর্মভিত্তিক দেশের জন্য এটি নাকি মানানসই নয়। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— যে ‘প্রাকৃতিক সহনশীলতার কথা বলা হচ্ছে, সেটি আসলে কেমন ছিল? ইতিহাস দেখায়, যেটাকে আমরা ‘প্রাকৃতিক সহনশীলতা’ বলি, সেটি আসলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি সদয় বা সহানুভূতিশীল থাকার ক্ষমতা নয়। বরং এটা বর্ণপ্রথা অনুযায়ী মানুষদের মধ্যে ভেদাভেদ মেনে নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ, আলাদা বর্ণ বা সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে কতটা ‘সহ্য’ করতে পারবে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করেছিল এই প্রথা। অর্থাৎ, যেটিকে আজ ঐতিহ্যগত সহনশীলতা হিসেবে গৌরবান্বিত করা হচ্ছে, বাস্তবে তা ছিল বৈষম্য আর বর্ণভিত্তিক নিয়ন্ত্রণকে টিকিয়ে রাখার এক চমৎকার কৌশল মাত্র। অন্যদিকে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তার অসংখ্য দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতাই থাকলেও আমাদের সেই মৌলিক আশ্বাসটি দেয় যেখানে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর চাপ বা উন্মত্ত জনতার বিরুদ্ধে একজন নাগরিকেরও নিজের অধিকার রক্ষার জায়গা আছে। এই সাংবিধানিক নিশ্চয়তাটিকে বিদেশি বলার চেষ্টা, আমাদের সংখ্যালঘুদের জন্য তৈরি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রাচীরকে দুর্বল করে দেয়।
চতুর্থ অভিযোগ : তথাকথিত খাঁটি ও ঈশ্বরভক্ত সাধারণ মানুষকে রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করা।
সাবঅল্টার্ন, অর্থাৎ সাধারণ, অভিজাত-বহির্ভূত ভারতীয়কে (non-elite Indian) খাঁটি ঐতিহ্যের আসল রক্ষক হিসেবে আদর্শায়িত করা কেতাবি তত্ত্ব থেকেই এই ধারণার সূত্রপাত। ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী তাঁর বহুল আলোচিত বই ‘প্রভিনশিয়ালাইজিং ইউরোপ’-এ মানুষের অলৌকিক বিশ্বাস (supernatural beliefs), তাদের দেবদেবী আর আত্মাদের শুধু রূপক (metaphors) নয় বরং বাস্তবতা হিসেবেই মেনে নিতে আমাদের আহ্বান জানান। এই ব্যাখ্যার ভেতর দিয়ে ধর্মনিষ্ঠতাকে এক রকম মহৎ প্রতিরোধ হিসেবে দেখানো হয় যেন এটি আধুনিক রাষ্ট্রের যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে মানুষের প্রাণবন্ত দাঁড়িয়ে থাকা। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন ওঠে যে, এই রোমান্টিকীকরণ কি সত্যিই সাধারণ মানুষের মুক্তি দেখায়, নাকি উলটো কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসকে রাজনৈতিক বৈধতা দিয়ে ফেলে?
মূলত এই ধারণাটিই আজকের হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থার জনতুষ্টিমূলক প্রচারণার হুবহু প্রতিফলন। তাদের দাবি তারাই একমাত্র খাঁটি মানুষের কণ্ঠস্বর, ইংরেজি বলা অভিজাতদের বিপরীতে সহজ-সরল, ঈশ্বরভক্ত হিন্দুর প্রতিনিধি। এই তত্ত্বের পাটাতনে দাঁড়িয়েই হিন্দুত্ববাদীরা অযোধ্যা থেকে কাশী পর্যন্ত গোটা মন্দির আন্দোলনকে পরিচালিত করছে।
এই ‘খাঁটি বিশ্বাস’-কে রোমান্টিক রূপ দিয়ে এর অন্ধকার দিকগুলো (যেমন, জাতপাতের লৌহকপাট, নারীর অবদমন, আর কুসংস্কারের সহিংসতা) ইচ্ছে করেই আড়াল করেছেন এর প্রবক্তারা। তারা এমন এক মিথ্যা বিভাজন তৈরি কর
লেন যেখানে আপনি হয় জনগণের সঙ্গে এবং তাদের বিশ্বাসের পক্ষে, নয়তো আপনি পাশ্চাত্যকৃত শত্রু। সেই ফাঁক গলেই হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থা প্রবেশ করল এবং ঘোষণা দিল—“আমরাই জনগণ, আমরাই বিশ্বাস।”
এখান থেকেই তৈরি হয় সবচেয়ে অস্বস্তিকর সতর্কবার্তা : ভাইমারের সাথে তুলনা।
গবেষক মিরা নন্দা আমাদের মনে করিয়ে দেন, ১৯২০-৩০-এর দশকে জার্মানির ভাইমার প্রজাতন্ত্রও এমন এক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। মিরা বলেন, আজকের ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক আবহ অনেকটা ১৯২০-এর দশকের জার্মানির ভাইমার প্রজাতন্ত্রের মতো। তখনও দেখা গিয়েছিল হাইডেগারের মতো দার্শনিক কিংবা কার্ল শ্মিটের মতো আইনবিদরা উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে ঘৃণা করতেন। তারা দাবি তুলেছিলেন এক ‘খাঁটি জার্মান সংস্কৃতির’, যেখানে যুক্তি, বিজ্ঞান আর এনলাইটেনমেন্টের চেতনার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ চালানো হচ্ছিল। তাদের স্বপ্ন ছিল এক রোমান্টিক ইউটোপিয় সমাজ গড়া। কিন্তু বাস্তবে যা দাঁড়াল তা হলো যুক্তিবাদের প্রতি গভীর বিরাগ আর গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা। আর সেই বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহই নাজিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার পথ মসৃণ করে দিল।
এটাই মূল সতর্কবার্তা। বিপদ এই নয় যে, বামপন্থী এই বুদ্ধিজীবীরা নিজেরাই ফ্যাসিস্ট। এমন অভিযোগ সরলীকৃত এবং একেবারেই ভুল। প্রকৃত বিপদ হলো, তাদের ধারণাগুলো যদি রাজনৈতিক পরিণতির বিষয়ে সতর্কতা ছাড়া অন্ধভাবে চালিয়ে নেওয়া হয়, তবে তা এক শূন্যতার মাঠ তৈরি করে, যেখানে টিকে থাকে শুধু দানবেরা।
তাহলে নাগরিকদের, করণীয় কী? উত্তর খুব সহজ— ভাবতে হবে। যুক্তিকে রক্ষা করা মানে পশ্চিমের দাস হওয়া নয়; বরং তা মানে আমাদের নিজেদেরই মহৎ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করা যে ঐতিহ্য বুদ্ধ থেকে লোকায়ত পর্যন্ত, কিংবা ফুলকারের মতো সাহসী কণ্ঠ যারা তাদের সময়ে দেবতাকেও প্রশ্ন করেছেন।
ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষা করা মানে ‘পশ্চিমপন্থী’ হয়ে যাওয়া নয়; বরং এর মানে দাঁড়ায় সেই একমাত্র নীতিকে রক্ষা করা, যা দেড়শ কোটি মানুষের ভারতে নানান ধর্মবিশ্বাসী এবং ধর্মহীন মানুষকে, আইনের চোখে সমান মর্যাদা দেয়। সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য দরকার আরও বেশি সমালোচনামূলক চিন্তা, প্রমাণ-ভিত্তিক যুক্তি, যা এই তথাকথিত কেতাদুরস্ত তত্ত্বগুলো ছুড়ে ফেলে দিতে পারে। আমাদের প্রজাতন্ত্রগুলোর স্থাপত্য ক্ষতিগ্রস্ত, নড়বড়ে হলেও, এটাই আমাদের একমাত্র আশ্রয়। ‘শুদ্ধ অতীত’-এর ইউটোপিয়ার জন্য সেই আশ্রয়কেই ভেঙে ফেলার চেষ্টা, আমাদের এক ভয়ানক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিবে। তাই একটাই পথ খোলা আছে। আমাদের ভাবতে হবে কঠোর সততা আর দ্বান্দিকতা দিয়ে।
লেখক






