বিউপনিবেশায়ন: বিপ্লবী সংগ্রামের বিমূর্তায়ন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে “ডিকলোনাইজেশন” (Decolonization) বা বিউপনিবেশায়ন শব্দটি একটি বহুল চর্চিত এবং প্রায় সর্বব্যাপী পরিভাষায় পরিণত হয়েছে। একসময় যে শব্দটি একটি পরাধীন জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে রাষ্ট্রকাঠামো ও অর্থনীতির বাস্তব মুক্তির সমার্থক ছিল, বর্তমানে তা দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি কল্পনাযোগ্য কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে। অসংখ্য গাইড, প্রবন্ধ এবং নির্দেশিকা লেখা হয়েছে নিজের মন, বাসস্থান, কর্পোরেট বোর্ড, বইয়ের তাক, লন, পোশাক এবং এমনকি থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের মতো উৎসবকেও “ডিকলোনাইজ” করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে । এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ ও দৈনন্দিন কাজগুলোকে একটি র‍্যাডিকাল বা বিপ্লবী মোড়কে উপস্থাপন করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলস্বরূপ, এমন নিবন্ধও প্রকাশিত হচ্ছে যার শিরোনাম: “ডিকলোনাইজেশন আন্দোলনকেও ডিকলোনাইজ করার সময় এসেছে!” ।

একটি বাড়ির পেছনের উঠানে দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো কিংবা বইয়ের তাক থেকে পশ্চিমা লেখকদের বই সরিয়ে ফেলা কি সত্যিই শত শত বছরের ঔপনিবেশিক শোষণ ও কাঠামোগত বৈষম্যকে উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? এই প্রশ্নটি বর্তমানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিউপনিবেশায়নের এই আধুনিক ও প্রতীকী ব্যবহার মূলত মূল রাজনৈতিক ও সমষ্টিগত মুক্তির সংগ্রাম থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। এটি সমাজ পরিবর্তনের বৃহত্তর লড়াইকে ব্যক্তিগত, মনস্তাত্ত্বিক এবং ভোগবাদী স্তরে সীমাবদ্ধ করে ফেলে । ফলস্বরূপ, “ডিকলোনাইজেশন” শব্দটি বর্তমানে এমন একটি বিমূর্ত ধারণায় পরিণত হয়েছে, যা শোষণের মূল অর্থনৈতিক কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখেই পুঁজিপতি ও শাসক শ্রেণিকে একটি প্রগতিশীল ভাবমূর্তি গড়ে তোলার সুযোগ করে দিচ্ছে। বর্তমান প্রতিবেদনটি বিউপনিবেশায়নের এই বিবর্তিত রূপ, এর তাত্ত্বিক ত্রুটি, আদিবাসী সমাজ ও বৈশ্বিক কাঠামোর অভ্যন্তরে বিদ্যমান শ্রেণিভেদ এবং প্রকৃত মুক্তির জন্য শ্রেণিসংগ্রামের অপরিহার্যতা নিয়ে একটি বিস্তৃত, পদ্ধতিগত এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: যখন বিউপনিবেশায়ন একটি বাস্তব সংগ্রাম ছিল

বিউপনিবেশায়নের বর্তমান প্রতীকী রূপটি বোঝার আগে এর ঐতিহাসিক ও বাস্তব ভিত্তিটি অনুধাবন করা জরুরি। ১৯৪০-এর দশক থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত “ডিকলোনাইজেশন” বলতে সরাসরি বোঝানো হতো সৈন্য, ঔপনিবেশিক প্রশাসন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার এবং এক দেশের ওপর আরেক দেশের আনুষ্ঠানিক ঔপনিবেশিক শাসনের চূড়ান্ত অবসান । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী উপনিবেশিত অঞ্চলগুলোতে বিপ্লবের ঢেউ আছড়ে পড়ে এবং লক্ষ লক্ষ নিপীড়িত মানুষ ব্রিটেন, ফ্রান্স, ডাচ, পর্তুগাল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাজিত করে নিজেদের জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন করে।

এই প্রক্রিয়াটি কোনো বিমূর্ত বা মনস্তাত্ত্বিক ধারণা ছিল না। এটি ছিল রক্তক্ষয়ী, রাজনৈতিক এবং কাঠামোগত লড়াই। ১৯৪৫ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় তিন ডজনেরও বেশি নতুন রাষ্ট্র ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসকদের হাত থেকে স্বায়ত্তশাসন বা পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে । ইতিহাসবেত্তারা বিউপনিবেশায়নের এই প্রক্রিয়াটিকে তিনটি প্রধান “ঢেউ” বা তরঙ্গে বিভক্ত করেছেন: ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে মাঝারি আকারের ঢেউ, ১৯৬০-এর দশকের আশেপাশে একটি বিশাল ঢেউ এবং ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি একটি ছোট ঢেউ। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ, কেনিয়ার মাউ মাউ বিদ্রোহ, কঙ্গো সংকট এবং ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামগুলো প্রমাণ করে যে, প্রকৃত বিউপনিবেশায়ন অর্জন করতে হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী এবং সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে )। সেই সময়ে একটি জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ এবং বর্তমান সময়ের “ডিকলোনাইজড পোশাক” পরার ধারণার মধ্যে যে যোজন যোজন পার্থক্য রয়েছে, তা ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রমাণিত ।

এক সময় বিউপিনিবেশায়ন একটি বাস্তব সংগ্রাম ছিলো। এখন তা পরিণত হয়েছে পরিচয় ভিত্তিক রাজনীতির হাতিয়ারে।

বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধের মেরুকরণ, নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (Non-Aligned Movement) এবং জাতিসংঘে উপনিবেশিত দেশগুলোর অংশগ্রহণ বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন আকার প্রদান করে। ১৯৪৬ সালে যেখানে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ছিল মাত্র ৩৫টি, সেখানে সদ্য স্বাধীন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর যোগদানের ফলে ১৯৭০ সালের মধ্যে সদস্য সংখ্যা ১২৭-এ পৌঁছায় । ফ্রাঞ্জ ফানোর মতো তাত্ত্বিকরা সেই সময়ে বিউপনিবেশায়নকে একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ওলটপালট হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “দ্য রেচড অব দ্য আর্থ” (The Wretched of the Earth)-এ তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, বিউপনিবেশায়ন মানে সামাজিক অনুক্রমের সম্পূর্ণ পরিবর্তন, যা প্রায়শই একটি সহিংস প্রক্রিয়া হতে বাধ্য। কিন্তু এই রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরও সদ্য স্বাধীন দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে নব্য-উপনিবেশবাদের (Neo-colonialism) শিকলে আটকা পড়ে যায়। ফলে রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটি সামনে আসে, যা মূলত একটি শ্রেণিসংগ্রামের দিকেই ইঙ্গিত করে।

উত্তর-উপনিবেশবাদ ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির উত্থান

১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে যে বিপ্লবী আন্দোলনগুলো দানা বেঁধেছিল, তার অনেকগুলোই সংস্কারবাদী নেতৃত্ব ও স্তালিনপন্থী নীতি-নির্ধারকদের ভুল কৌশলের কারণে পূর্ণাঙ্গ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপ নিতে ব্যর্থ হয় । এই পরাজয়ের ফলে শ্রমিক শ্রেণি ও নিপীড়িত জনগণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শ্রেণিসংগ্রাম তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক—উভয় ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ে। এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে উত্তর-উপনিবেশবাদ (Post-colonialism) এবং পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের (Post-structuralism) প্রভাব বাড়তে থাকে ।

এই নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাটি বস্তুবাদী বিশ্লেষণ (Materialist analysis) বা রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিবর্তে বিষয়গততা (Subjectivity), সংস্কৃতি, ভাষা এবং পরিচয়ের ওপর জোর দেয় । মিশেল ফুকো, এডওয়ার্ড সাইদ এবং সাবলটার্ন স্টাডিজ (Subaltern Studies) গ্রুপের অন্যান্য তাত্ত্বিকদের কাজের ওপর ভিত্তি করে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, সব জ্ঞানই ব্যক্তিনির্ভর এবং ক্ষমতা শুধুমাত্র রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, বরং ভাষার ভেতরেও প্রোথিত (Internationalist Standpoint, n.d.)। ফলে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর সংগ্রামকে অর্থনৈতিক মুক্তি বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লড়াই থেকে সরিয়ে একটি সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করা হয়। সাবলটার্ন স্টাডিজ গ্রুপ মূলত মার্কসবাদী ইতিহাস রচনার পদ্ধতিকে বাতিল করে দেয় এবং দাবি করে যে, উপনিবেশিত সমাজকে শ্রেণি হিসেবে নয়, বরং প্রান্তিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাঠ করতে হবে।

মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা এই ধারাটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, ডিকলোনিয়াল তত্ত্ব সামাজিক উৎপাদনের পরিস্থিতি এবং দৈনন্দিন জীবনকে কাঠামোবদ্ধকারী রাজনৈতিক অর্থনীতিকে অবহেলা করে । এই তত্ত্ব দাবি করে যে ঔপনিবেশিকতা শুধু ভৌত নয়, এটি সাংস্কৃতিক ও মানসিকও, যা নির্ধারণ করে কোন জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে । এই যুক্তির একটি ইতিবাচক দিক থাকলেও, এটি শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকে ব্যক্তিস্তরে নামিয়ে আনে। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার যেমন আদর্শগত কাঠামোকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো থেকে আলাদা করে দেখেছিলেন, তেমনি উত্তর-আধুনিকতাবাদীরাও ভাষা ও ডিসকোর্সকে বাস্তব বস্তুগত অবস্থার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন ।

এর ফলে সামাজিক শ্রেণিসংগ্রামের ধারণাটি ক্রমশ ম্লান হয়ে যায় এবং তার জায়গা দখল করে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি (Identity Politics) । এই রাজনীতি সমষ্টিগত শোষণের চেয়ে ব্যক্তিগত আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির ওপর বেশি মনোযোগ নিবদ্ধ করে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিশ্লেষণে আইডেন্টিটি পলিটিক্স বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে দুটি ধারায় ভাগ করা যায়: সমতাভিত্তিক (Egalitarian) এবং সংরক্ষণবাদী (Preservationist)। সমতাভিত্তিক পরিচয় রাজনীতি প্রান্তিক গোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের কথা বললেও, শেষ পর্যন্ত এটি সমাজের “আমরা” বনাম “তারা” বিভাজনকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে । এর ফলে শ্রমিকদের ঐক্য বিনষ্ট হয় এবং পুঁজিপতিরা এই পরিচয়ের রাজনীতিকে ব্যবহার করে তাদের শোষণমূলক স্বার্থ হাসিল করতে সক্ষম হয়।

বিমূর্ত ও প্রতীকী বিউপনিবেশায়ন: মন, লন, বইয়ের তাক এবং থ্যাঙ্কসগিভিং

বিউপনিবেশায়নের বর্তমান বয়ান কীভাবে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র এবং প্রতীকী কাজগুলোতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, তার কিছু সুনির্দিষ্ট উদাহরণ বিশ্লেষণ করলে এর অসারতা স্পষ্ট হয়। সমাজ পরিবর্তনের মহান লড়াই আজ কীভাবে ব্যক্তিজীবনের লাইফস্টাইল বা ভোগবাদী পছন্দে পরিণত হয়েছে, তা নিচের কয়েকটি ক্ষেত্রের মাধ্যমে বোঝা যায়।

লন বা বাড়ির উঠান ডিকলোনাইজ করা

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একটি নতুন ধারার উদ্ভব হয়েছে, যেখানে বাড়ির পেছনের উঠান বা লন পরিবর্তন করাকে ডিকলোনাইজেশনের অংশ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রবন্ধে একজন অধ্যাপক বলেছেন: “একটি বড় লনসহ বাড়ির পেছনের উঠান আসলে ঔপনিবেশিকতা এবং পরিবেশবিরোধিতার এক ধরনের শ্রেণিকক্ষ”। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, ভিনদেশি ঘাসের বদলে দেশীয় বা স্থানীয় গাছপালা (Native plants) লাগানো পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে একটি বড় পদক্ষেপ । বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪০ মিলিয়ন একর ঘাসের লন রয়েছে, যার রক্ষণাবেক্ষণে বছরে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন গ্যালন গ্যাসোলিন ব্যবহৃত হয় এবং নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে।

পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেশীয় উদ্ভিদের ব্যবহার এবং রাসায়নিক সার কমানোর যুক্তিটি অবশ্যই বিজ্ঞানসম্মত এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু একে “ডিকলোনাইজেশন” বা ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করা মূলত একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক শব্দকে তার প্রকৃত অর্থ থেকে বিচ্যুত করার সামিল । লন পরিবর্তন করা কোনোভাবেই কর্পোরেট পুঁজিবাদ বা আদিবাসী উচ্ছেদের কাঠামোগত নীতিকে ব্যাহত করে না। এটি একটি পরিবেশবান্ধব নাগরিক দায়িত্ব হতে পারে, কিন্তু একটি বাড়ির উঠানে দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগালেই বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন বা নব্য-উপনিবেশবাদী শোষণ বন্ধ হয়ে যায় না।

থ্যাঙ্কসগিভিং ডিকলোনাইজ করা

একইভাবে, পশ্চিমা বিশ্বে থ্যাঙ্কসগিভিং উৎসব “ডিকলোনাইজ” করার ব্যাপক প্রচারণা চলছে। থ্যাঙ্কসগিভিং ডিনারে টার্কির বদলে আদিবাসী ঐতিহ্যের “তিন বোন” বা Three Sisters (ভুট্টা, শিম এবং স্কোয়াশ) পরিবেশন করা এবং আদিবাসী ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করাকে ডিকলোনাইজেশন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে । বিভিন্ন গাইডে বলা হচ্ছে, পিউরিটান সেটেলার এবং ওয়াম্পানোয়াগ (Wampanoag) উপজাতির প্রকৃত ইতিহাস শিশুদের শেখানো এবং থ্যাঙ্কসগিভিংকে “National Day of Mourning” বা জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করা উচিত । এটি সত্য যে, আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস ও কৃষিব্যবস্থা (যেমন, বীজ রোপণের সময় মাছের অবশিষ্টাংশ সার হিসেবে ব্যবহার করা) বিজ্ঞানসম্মত ছিল এবং তা আমেরিকান কৃষিতে ব্যাপক অবদান রেখেছে। কিন্তু এই ইতিহাস জানা এবং থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের মেন্যু পরিবর্তন করাকে বিপ্লব মনে করা এক প্রকার মোহ। একটি নির্দিষ্ট দিনে খাবার পরিবর্তন করে ঔপনিবেশিকতার যে গাঠনিক ক্ষত, তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন বা কর্পোরেট বোর্ডে আদিবাসী সদস্য নিয়োগের দাবিকে ডিকলোনাইজেশনের বড় অর্জন হিসেবে দেখানো হয় । কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরনের বৈচিত্র্যমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া (Diverse hiring practices) সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বা পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রামে কোনো বড় প্রভাব ফেলে না। উদাহরণস্বরূপ, কানাডায় জাস্টিন ট্রুডোর সরকার মেরি সাইমনকে প্রথম আদিবাসী হিসেবে গভর্নর জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়। কিন্তু এই নিয়োগের পেছনে আসল উদ্দেশ্য ছিল সরকারের আদিবাসী-বিরোধী নীতিগুলোকে একটি প্রগতিশীল পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রাখা।

বইয়ের তাক ডিকলোনাইজ করা

“ডিকলোনাইজ ইওর বুকশেলফ” (Decolonize Your Bookshelf) নামে একটি জনপ্রিয় আন্দোলন বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে । এর মূল কথা হলো, বইয়ের তাকে শুধু পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গ লেখকদের বই না রেখে আদিবাসী, কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর লেখকদের বই রাখা। এই আন্দোলন দাবি করে যে, সাহিত্য পঠনে বৈচিত্র্য আনলে ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে । এটি পাঠকদের অন্য সংস্কৃতির প্রতি সহানুভূতিশীল করতে সাহায্য করলেও, শেষ পর্যন্ত এটি একটি ভোগবাদী পছন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। প্রকাশনা সংস্থাগুলো এটিকে বাজারজাতকরণের একটি কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে, যেখানে “বৈচিত্র্যময়” সাহিত্য বিক্রি করে তারা মুনাফা অর্জন করছে । একটি বই কেনা বা পড়া সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু এটি নিজেই পূর্ণাঙ্গ বিউপনিবেশায়ন নয়।

বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও একাডেমিক ডিকলোনাইজেশন

গ্লোবাল হেলথ বা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য পরিসরেও ডিকলোনাইজেশনের ব্যাপক আলোচনা চলছে। “ইট’স টাইম টু ডিকলোনাইজ দ্য ডিকলোনাইজেশন মুভমেন্ট” শীর্ষক একটি গবেষণা প্রবন্ধে গবেষক ইজেওমা নোডিম ওপারা বলেছেন যে, ডিকলোনাইজেশন শব্দটি এখন একটি “হাল ফ্যাশনের” (topic du jour) বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি সেমিনার, ওয়েবিনার এবং জার্নালে এটি নিয়ে কথা বলা হচ্ছে । কিন্তু বাস্তবে এই আন্দোলনগুলো পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্ব এবং কর্পোরেট ফান্ডিং দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আদিবাসীদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে শুধুমাত্র ভাষা পরিবর্তন (যেমন, ‘তৃতীয় বিশ্ব’-এর বদলে ‘গ্লোবাল সাউথ’ ব্যবহার করা) এবং বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি (DEI) নীতিমালার মাধ্যমে এই আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে । ওপারার মতে, “মালিকের হাতিয়ার দিয়ে মালিকের ঘর ভাঙা সম্ভব নয়” । পশ্চিমা এনজিও এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলোর ফান্ডিংয়ের ওপর নির্ভরশীল থেকে প্রকৃত বিউপনিবেশায়ন অর্জন করা একটি অবাস্তব কল্পনা।

তুলনার ক্ষেত্র ঐতিহাসিক বিউপনিবেশায়ন (১৯৪৫-১৯৭০) প্রতীকী বিউপনিবেশায়ন (বর্তমান যুগ)
মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ভূমি পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক মুক্তি ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, মানসিক প্রশান্তি এবং ভাষাগত পরিমার্জন।
আন্দোলনের মাধ্যম গণআন্দোলন, সশস্ত্র সংগ্রাম, শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ জনগণের ঐক্যবদ্ধ লড়াই। ভোগবাদী পছন্দ (পণ্য কেনা), ব্যক্তিগত লন পরিবর্তন, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন।
আকাঙ্ক্ষিত ফলাফল নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভব, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের পতন ও কাঠামোগত পরিবর্তন। কর্পোরেট ভাবমূর্তি উজ্জ্বলকরণ, ডাইভার্সিটি কোটা পূরণ এবং মূল পুঁজিবাদের টিকে থাকা।
চিহ্নিত শত্রু সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র, দখলদার সামরিক বাহিনী ও তাদের স্থানীয় শোষক শ্রেণি। পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্ব, পাঠ্যক্রম এবং সাধারণ অ-আদিবাসী জনগণ (“Settlers”)।

পুঁজিবাদের সহযোজন: আদিবাসী পুঁজিপতি শ্রেণির উদ্ভব ও টোকেনিজম

প্রতীকী বিউপনিবেশায়নের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি অত্যন্ত সহজেই পুঁজিবাদের দ্বারা শোষিত বা কো-অপ্ট (Co-opt) হয়ে যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান এবং কর্পোরেশন এই ধারণাকে ব্যবহার করে নিজেদের অত্যন্ত প্রগতিশীল হিসেবে উপস্থাপন করে, যদিও বাস্তবে তারা একই শোষণমূলক কাঠামো বজায় রাখে ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন বা কর্পোরেট বোর্ডে আদিবাসী সদস্য নিয়োগের দাবিকে ডিকলোনাইজেশনের বড় অর্জন হিসেবে দেখানো হয় । কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরনের বৈচিত্র্যমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া (Diverse hiring practices) সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বা পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রামে কোনো বড় প্রভাব ফেলে না। উদাহরণস্বরূপ, কানাডায় জাস্টিন ট্রুডোর সরকার মেরি সাইমনকে প্রথম আদিবাসী হিসেবে গভর্নর জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়। কিন্তু এই নিয়োগের পেছনে আসল উদ্দেশ্য ছিল সরকারের আদিবাসী-বিরোধী নীতিগুলোকে একটি প্রগতিশীল পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রাখা। একই সরকার এবং রাষ্ট্রযন্ত্র ওয়েট’সুয়েট’এন (Wet’suwet’en) আদিবাসীদের ভূমিতে কর্পোরেট পাইপলাইন বসানোর জন্য সশস্ত্র পুলিশ (RCMP) পাঠায় এবং আদিবাসী আবাসিক স্কুল সারভাইভারদের ক্ষতিপূরণ বাধাগ্রস্ত করতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে । অর্থাৎ, রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে একজন আদিবাসীর উপস্থিতি সেই রাষ্ট্রের দমনমূলক ও পুঁজিবাদী চরিত্রকে বিন্দু পরিমাণ পরিবর্তন করতে পারে না।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নিজেকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সুপরিকল্পিতভাবে একটি “আদিবাসী পুঁজিপতি শ্রেণি” (Indigenous Bourgeoisie) তৈরি করছে । ঐতিহাসিকভাবে আদিবাসী সমাজগুলোতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং মুনাফার উদ্দেশ্যে উৎপাদনের ধারণা ছিল না। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝতে পেরেছে যে, আদিবাসী আন্দোলনকে স্তিমিত করতে হলে তাদের মধ্য থেকেই একটি ধনিক শ্রেণি তৈরি করতে হবে । কানাডার নোভা স্কটিয়ায় ‘ক্লিয়ারওয়াটার ডিল’ (Clearwater deal) বা ট্রান্স মাউন্টেন পাইপলাইনের জন্য ‘প্রজেক্ট রিকনসিলিয়েশন’ এর বড় প্রমাণ। ক্লিয়ারওয়াটার চুক্তিতে একটি বিশাল ফিশিং কোম্পানিকে মিকম্যাক (Mi’kmaq) আদিবাসী গোষ্ঠী এবং বিসি কোম্পানি প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডসের কাছে বিক্রি করা হয়, যেখানে সরকার অর্থায়নে সহায়তা করে । একইভাবে, প্রজেক্ট রিকনসিলিয়েশনের মাধ্যমে বহুল বিতর্কিত ট্রান্স মাউন্টেন পাইপলাইনের মালিকানা আদিবাসীদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এসব প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লাভজনক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ আদিবাসী শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না । ক্লিয়ারওয়াটার ফিশারিতে কর্মরত শ্রমিকরা আগের মতোই শোষিত হচ্ছেন, মালিকানা আদিবাসী নাকি শ্বেতাঙ্গদের হাতে, তাতে তাদের মজুরি বা কাজের পরিবেশের কোনো উন্নতি হচ্ছে না । বরং, আদিবাসী পুঁজিপতিরা সাধারণ শ্রমিকদের শোষণ করেই নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করছে । আদিবাসী ধনকুবের বা টাইকুনরা, যেমন কেন হিল, চরম বিলাসবহুল জীবনযাপন করেছেন, যেখানে তাদের নিজেদের কমিউনিটির সাধারণ মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে ভুগেছে। এই আদিবাসী পুঁজিপতিরা সরকারের “লুকানো হাত” হিসেবে কাজ করে এবং সাধারণ আদিবাসীদের বিপ্লবী আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়।

ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়ার অনেক দেশেও এই আদিবাসী এলিট বা শাসক শ্রেণির উপস্থিতি দৃশ্যমান, যারা রাষ্ট্রের শোষক কাঠামোর সাথে হাত মিলিয়ে নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষদেরই অধিকার বঞ্চিত করছে । ল্যাটিন আমেরিকায় প্রায় ৪০ মিলিয়ন আদিবাসী বসবাস করে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০% এবং বলিভিয়ায় এই হার ৫৪% । ঐতিহাসিকভাবে তারা দারিদ্র্য ও ভূমিহীনতার শিকার হলেও, এদের মধ্যে এমন একটি এলিট শ্রেণি গড়ে উঠেছে যারা পশ্চিমা পুঁজির সাথে হাত মিলিয়ে খনি ও কৃষিজ সম্পদ লুণ্ঠনে সহায়তা করে। বলিভিয়া, পেরু এবং মেক্সিকোতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভেতরেই চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজমান । এ থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, শুধুমাত্র “পরিচয়” বা “জাতিগত” পরিবর্তন প্রকৃত মুক্তি আনতে পারে না। সমাজের মূল বিভাজনটি জাতিগত নয়, বরং শ্রেণিভিত্তিক। একজন আদিবাসী পুঁজিপতি এবং একজন শ্বেতাঙ্গ পুঁজিপতির মধ্যে শোষণের সমীকরণে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির নেতা ফ্রেড হ্যাম্পটনের ভাষায়, “আমরা কালো পুঁজিবাদ দিয়ে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়ব না, আমরা লড়ব সংহতি দিয়ে”।

গ্লোবাল সাউথ এবং এশিয়া: অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের গতিশীলতা

উপনিবেশবাদ, বিউপনিবেশায়ন এবং শ্রেণিসংগ্রামের এই বৈশ্বিক গতিশীলতা গ্লোবাল সাউথ (Global South) এবং বিশেষভাবে এশীয় প্রেক্ষাপটেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। ১৯৬৯ সালে কার্ল ওগলসবি প্রথম “গ্লোবাল সাউথ” শব্দটি ব্যবহার করেন গ্লোবাল নর্থের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের শিকার দেশগুলোকে বোঝাতে । কিন্তু গ্লোবাল সাউথের ভেতরেও এক ধরনের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ (Internal colonialism) কাজ করে, যেখানে স্বাধীন রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রক জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজ দেশের আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে শোষণ করে ।

এশিয়ার দেশগুলোতে আদিবাসীদের সংগ্রাম মূলত ভূমি অধিকার এবং রাষ্ট্র কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া উচ্ছেদ নীতির বিরুদ্ধে। মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত এবং ফিলিপাইনে রাষ্ট্রযন্ত্র আদিবাসীদের ভূমি দখল করে সেখানে খনি, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, একফসলি কৃষিক্ষেত্র এবং সামরিক জোন গড়ে তুলছে । মজার বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় আদিবাসী সমাজের অভিজাত অংশ বা স্থানীয় নেতারা রাষ্ট্রের সাথে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে এবং সাধারণ আদিবাসীদের সম্পদ হরণ করে।

দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষিত ও বদরুদ্দীন উমরের বিশ্লেষণ

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় প্রকৃত শ্রেণিসংগ্রামকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের নিচে চাপা দেওয়া হয়েছিল । প্রখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতভাগের সময় ধর্ম বা সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল যাতে শ্রমিক ও কৃষকদের শ্রেণিসংগ্রামকে বিভ্রান্ত করা যায়।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯৪৬-৪৭ সালের তেভাগা আন্দোলন ছিল মূলত একটি নিখাদ শ্রেণিসংগ্রাম, যা হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে মুসলিম কৃষকদের অধিকার আদায়ের লড়াই ছিল। কৃষকরা ফ্লুড কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবিতে একজোট হয়েছিল । কিন্তু ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী এবং স্থানীয় হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগের মতো বুর্জোয়া দলগুলো এই অর্থনৈতিক লড়াইকে একটি সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়। পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তান সৃষ্টির পরও শাসক শ্রেণি নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখতে ধর্মের মোড়কে শোষণের নতুন রূপ তৈরি করে। উমরের মতে, ১৯৪৭ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর প্রকৃত বিউপনিবেশায়ন ছিল না, বরং তা ছিল জাতীয় বুর্জোয়াদের দ্বারা সাম্রাজ্যবাদের শাসন অব্যাহত রাখার একটি প্রক্রিয়া মাত্র । ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও, বামপন্থীদের ভুল নীতি এবং স্তালিনবাদী ও মাওবাদী দলগুলোর মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে এখানেও সমাজতান্ত্রিক মুক্তি আসেনি (Dhanda & Singh, n.d.)। উমরের মতে, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশেও লুটেরাদের একটি নতুন শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে পুঁজি সঞ্চয় করতে থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম: উপনিবেশিক সুরক্ষার মিথ ও আদিবাসী অভিজাতদের ভূমিকা

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম (Chittagong Hill Tracts – CHT) এই নব্য-উপনিবেশবাদ, অভ্যন্তরীণ শোষণ এবং আদিবাসী অভিজাতদের দ্বারা সাধারণ জুম্ম জনগণকে শোষণের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৯০০ সালের রেগুলেশন অ্যাক্ট (Regulation 1 of the 1900 Act) এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয় (Seeing the Woods, 2014)। ব্রিটিশদের দাবি ছিল, তারা আদিবাসীদের সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং সমতলের বাঙালিদের শোষণের হাত থেকে তাদের রক্ষা করার জন্যই এই নীতি গ্রহণ করেছে (Seeing the Woods, 2014)।

কিন্তু আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ব্রিটিশদের এই ‘রক্ষণশীল’ (Protectionist) নীতি ছিল একটি মিথ বা ভ্রান্তি । এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ের বিপুল বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন- শিপিং ও রেলওয়ের জন্য কাঠ) বিনা বাধায় লুণ্ঠন করা এবং একটি অনুগত পাহাড়ি এলিট (Tribal chiefs) শ্রেণি তৈরি করা । চাকমা, বোমাং এবং মং রাজাদের ক্ষমতা প্রদান করে ব্রিটিশরা মূলত সাধারণ পাহাড়ি জুম চাষিদের ওপর কর আরোপ এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল । ব্রিটিশদের এই নীতির মোড়কে পাহাড়ি সাধারণ জনগণ এবং সমতলের বাঙালি বুর্জোয়াদের মধ্যে একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করা হয়েছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়িদের আরও প্রান্তিক করে তোলে।

পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে ১৯৬০ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ফলে পাহাড়ের বাস্তুসংস্থান এবং সমাজকাঠামোতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। এই বাঁধের কারণে প্রায় ১ লাখ পাহাড়ি আদিবাসী (যাদের একটি বড় অংশ জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল) তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু (Climate refugees) হয়ে পড়ে (Seeing the Woods, 2014)। এর মধ্যে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ত্রিদিব রায়ও ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এই কাঠামোগত বঞ্চনা ও পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ হয়নি। সামরিকীকরণ, বনভূমি ধ্বংস, জুম চাষিদের উচ্ছেদ এবং বহিরাগতদের বসতি স্থাপনের মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর এক ধরনের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ।

এক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ জুম্ম জনগণ এবং সমতলের খেটে খাওয়া শ্রমিক—উভয়ই শাসক গোষ্ঠী ও কর্পোরেট পুঁজির দ্বারা শোষিত হচ্ছে। পাহাড়ের আদিবাসী এলিটদের অনেকেই এই শাসন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন, যা আবারও প্রমাণ করে যে আদিবাসী সমাজেও শ্রেণিভেদ রয়েছে এবং শুধু জাতিগত অধিকারের বুলি আওড়িয়ে কাঠামোগত শোষণের অবসান ঘটানো সম্ভব নয় (Pure, n.d.)।

সেটলার বনাম আদিবাসী শ্রমিকের মিথ্যা বিভাজন এবং মার্কসবাদী বিকল্প

আধুনিক বিউপনিবেশায়নের তাত্ত্বিকরা অনেক সময় দাবি করেন যে, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য হওয়া উচিত অ-আদিবাসী বা “সেটলার” (Settler) জনগোষ্ঠীকে তাদের সুবিধাজনক অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া বা দরিদ্র করা। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ওয়েন ইয়াং তার “Decolonization is not a metaphor” (বিউপনিবেশায়ন কোনো রূপক নয়) প্রবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন যে, সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনগুলোর লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের ৯৯ শতাংশ অ-আদিবাসী বা সেটলার জনগণকে সমৃদ্ধ করার বদলে তাদের দরিদ্র বা ক্ষমতাহীন করা ।

এটি একটি অত্যন্ত বিভেদমূলক এবং প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি। এই তত্ত্বের মূল সংকট হলো, এটি সমাজকে পুঁজিপতি বনাম শ্রমিক হিসেবে না দেখে আদিবাসী বনাম সেটলার হিসেবে বিভক্ত করে । এর ফলে একজন শ্বেতাঙ্গ বা অ-আদিবাসী বিলিয়নিয়ার এবং একজন অ-আদিবাসী কারখানার শ্রমিককে একই কাতারে ফেলা হয়。

বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য, মাদকাসক্তি, গৃহহীনতা এবং বেকারত্বের মতো সমস্যাগুলো আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোতে প্রকট হলেও, এর সমাধান সাধারণ অ-আদিবাসী শ্রমিক বা খেটে খাওয়া মানুষকে আরও দরিদ্র করার মধ্যে নিহিত নেই (Communist Revolution, n.d.)। একজন সাধারণ অ-আদিবাসী কারখানার শ্রমিক, দিনমজুর বা নার্স এবং একজন আদিবাসী দিনমজুর উভয়েই পুঁজিবাদের শিকার। বিশ্বজুড়ে সম্পদের কোনো অভাব নেই, অভাব রয়েছে এর সুষম বণ্টনের। বৈশ্বিক পুঁজিপতি শ্রেণি সংকটের মধ্যেও (যেমন কোভিড-১৯ মহামারি বা যুদ্ধ) তাদের সম্পদ বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মহামারির সময়ে কানাডার বিলিয়নিয়াররা তাদের সম্পদ প্রায় ৭৮ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করেছে।

সুতরাং, যদি ডিকলোনাইজেশন মানে হয় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দারিদ্র্য বৃদ্ধি, তবে তা একটি মানবিক বিপর্যয়ের পথ খুলে দেয়। অ-আদিবাসী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হলে তা আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে গড়ে আনবে না। এর পরিবর্তে, প্রকৃত মুক্তির জন্য প্রয়োজন সম্পদ পুনর্বণ্টন করা—তাও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নয়, বরং সেইসব পুঁজিপতি ও বিলিয়নিয়ারদের কাছ থেকে যারা শ্রমিকদের শোষণের মাধ্যমে ধনী হয়েছে ।

আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো প্রায়শই জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র (UNDRIP) ব্যবহার করে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রক্ষার চেষ্টা করে, কিন্তু আন্তর্জাতিক কাঠামোগুলো মূলত গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর স্বার্থই রক্ষা করে। ট্রান্সন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজগুলো আদিবাসী ভূমিতে খনি ও জ্বালানি প্রকল্প গড়ে তোলে, এবং তাদের এই আগ্রাসন ঠেকাতে শুধু সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতা এবং উৎপাদনের উপায়গুলোর ওপর শ্রমিক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য ।

বিউপনিবেশায়ন আন্দোলনকে বিউপনিবেশিত করার প্রয়োজনীয়তা

সময়ের সাথে সাথে “ডিকলোনাইজেশন” বা বিউপনিবেশায়নের অর্থ আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় যা ছিল একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই, বর্তমানে তা প্রায়শই এমন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে যার রাজনৈতিক গুরুত্ব নগণ্য এবং যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে । যখন কোনো শব্দকে তার রাজনৈতিক ও কাঠামোগত শোষণের প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধুমাত্র ব্যক্তিজীবনের মানসিক প্রশান্তি, ভোগবাদী পছন্দ বা সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা আসলে শোষক পুঁজিপতি শ্রেণিকেই লাভবান করে।

আজকের দিনে “ডিকলোনাইজেশন আন্দোলনকেও ডিকলোনাইজ করার সময় এসেছে” । এর অর্থ হলো, বিউপনিবেশায়নকে পশ্চিমা একাডেমিয়া, কর্পোরেট বোর্ডরুম, এনজিও ফান্ডিং এবং ভোগবাদী লাইফস্টাইলের বৃত্ত থেকে বের করে আনতে হবে। ব্যক্তিগত লন পরিবর্তন করে দেশীয় গাছ লাগানো, থ্যাঙ্কসগিভিং ডিনারের মেন্যু বদলানো, কিংবা বইয়ের তাকে বৈচিত্র্য আনা ব্যক্তিগত আত্মতুষ্টি দিতে পারে, কিন্তু এগুলো রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত শোষণ এবং পুঁজিবাদের ভিত্তিকে নাড়াতে সম্পূর্ণ অক্ষম।

প্রকৃত মুক্তির জন্য প্রয়োজন একটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তন কেবল তখনই সম্ভব, যখন জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিভেদ ভুলে আদিবাসী ও অ-আদিবাসী সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এবং শ্রমিক শ্রেণি ঐক্যবদ্ধ হবে । পুঁজির কোনো নির্দিষ্ট বর্ণ, ধর্ম বা জাতি নেই; এটি আদিবাসী পুঁজিপতি এবং অ-আদিবাসী পুঁজিপতি উভয়ের মাধ্যমেই একইভাবে কাজ করে। তাই, শুধুমাত্র পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি বা ভাষা পরিবর্তনের মধ্যে মুক্তি খুঁজলে তা মরীচিকার মতোই অধরা থেকে যাবে।

ইতিহাস সাক্ষী, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হলো সমষ্টিগত লড়াই। প্রয়োজন একটি সামষ্টিক শ্রেণিসংগ্রাম, যা শোষণের মূল ভিত্তি—পুঁজিবাদী উৎপাদন, ভূমি দখল ও অসম বণ্টন ব্যবস্থাকে—সমূলে উৎপাটন করবে। তবেই সত্যিকারের বিউপনিবেশায়ন, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও বৈশ্বিক মানবমুক্তির পথ প্রশস্ত হবে। প্রতীকী ডিকলোনাইজেশনের মোড়ক থেকে বেরিয়ে এসে কাঠামোগত বদলের বাস্তব লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়াই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দাবি।


তথ্যসূত্র (Works Cited)

  • Aculturame (2021) How I Decolonized my Thanksgiving Day. [online] Available at: <https://aculturame.com/2021/11/25/how-i-decolonized-my-thanksgiving-day/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Alternative Viewpoint (n.d.) Bangladesh: Identity and Class Conflict. [online] Available at: <https://altviewpoint.in/bangladesh-identity-and-class-conflict/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • BIPSS (n.d.) Identity Politics: The Pathway to Growing Extremism. [online] Available at: <https://www.bipss.org.bd/images/pdf/Paper%20on%20Identity%20Politics.pdf> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Britannica (n.d.) Decolonization | Definition, Examples, & Facts. [online] Available at: <https://www.britannica.com/topic/decolonization> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • BSS (n.d.) True history of Liberation War has not been written: Badruddin Umar. [online] Available at: <https://www.bssnews.net/interview/309351> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Carnegie Endowment for International Peace (2024) A Closer Look at the Global South. [online] Available at: <https://carnegieendowment.org/research/2024/05/global-south-colonialism-imperialism> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Communist Revolution (n.d.) ‘Decolonization’ doesn’t mean anything. [online] Available at: <https://www.marxist.ca/article/decolonization-doesnt-mean-anything> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Communist Revolution (n.d.) The Liberal project to create an Indigenous bourgeoisie. [online] Available at: <https://www.marxist.ca/article/the-liberal-project-to-create-an-indigenous-bourgeoisie> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Dhanda, M. & Singh, P. (n.d.) Left Perspectives in South Asia. [online] Available at: <https://www.sacw.net/left/leftperspectives01.html> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Diva-portal.org (n.d.) RESEARCH REPORTS. [online] Available at: <https://www.diva-portal.org/smash/get/diva2:616669/FULLTEXT02.pdf> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Harvard Law Review (n.d.) The Double Life of International Law: Indigenous Peoples and Extractive Industries. [online] Available at: <https://harvardlawreview.org/print/vol-129/the-double-life-of-international-law-indigenous-peoples-and-extractive-industries/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Hira, S. (2024) Marxist critique of decolonial theory. [online] Available at: <https://www.sandewhira.com/wp-content/uploads/2024/07/Episode-049.pdf> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Hrčak (n.d.) MOVING UP THE INCOME LADDER? WHAT ARE THE OBSTACLES: A CASE STUDY OF INDIGENOUS PEOPLE IN LATIN AMERICA. [online] Available at: <https://hrcak.srce.hr/file/9222> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Internationalist Standpoint (n.d.) 3rd ISp Conference: Post colonialism and identity politics-a Marxist Critique. [online] Available at: <https://www.internationaliststandpoint.org/3rd-isp-conference-post-colonialism-and-identity-politics-a-marxist-critique/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • IUP (2021) Make Your Thanksgiving More Meaningful with History You Never Knew. [online] Available at: <https://www.iup.edu/news-events/news/2021/11/make-your-thanksgiving-more-meaningful-with-history-you-never-knew.html> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • IWGIA (n.d.) EnslavEd PEoPlEs in thE 1990s – indigenous Peoples, debt Bondage and human Rights. [online] Available at: <https://iwgia.org/iwgia_files_publications_files/0142_ENSLAVED_PEOPLES_IN_THE_90.pdf> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • IWGIA (2025) The Struggle for Indigenous Self-Governance in Asia: A Democratic Alternative to Authoritarianism. [online] Available at: <https://iwgia.org/en/news/5815-debates-2025-the-struggle-for-indigenous-self-governance-in-asia.html> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Marxist Left Review (n.d.) Marxism and post-colonial theory. [online] Available at: <https://marxistleftreview.org/articles/marxism-and-post-colonial-theory/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Office of the Historian (n.d.) Decolonization of Asia and Africa, 1945–1960. [online] Available at: <https://history.state.gov/milestones/1945-1952/asia-and-africa> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Oxford Research Encyclopedia (n.d.) Decolonization and US Foreign Relations. [online] Available at: <https://oxfordre.com/americanhistory/display/10.1093/acrefore/9780199329175.001.0001/acrefore-9780199329175-e-356> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Paperbacks & Frybread Co. (2023) Decolonize Your Bookshelf Reading Challenge for 2023. [online] Available at: <https://paperbacksandfrybread.com/blogs/news/decolonize-your-bookshelf-reading-challenge-for-2023> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Pure (n.d.) The myth of colonial ‘protection’ of indigenous peoples. [online] Available at: <https://pure-oai.bham.ac.uk/ws/portalfiles/portal/44699611/5._The_Myth_of_Colonial_Protectionism_The_Case_of_the_CHT_Tina_Edit.pdf> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Seeing the Woods (2014) Socio-Politico-Economic Problems in the Hilly Areas of Bangladesh: the Case of the Chittagong Hill Tracts. [online] Available at: <https://seeingthewoods.org/2014/07/15/socio-politico-economic-problems-in-the-hilly-areas-of-bangladesh-the-case-of-the-chittagong-hill-tracts/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Speaking of Medicine and Health (2021) It’s Time to Decolonize the Decolonization Movement. [online] Available at: <https://speakingofmedicine.plos.org/2021/07/29/its-time-to-decolonize-the-decolonization-movement/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Today’s Parent (n.d.) Decolonize your bookshelf: 18 kids books featuring characters of colour. [online] Available at: <https://www.todaysparent.com/family/books/decolonize-your-bookshelf-kids/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • Trucha RGV (n.d.) Decolonize Your Lawn: The Case for Native Plants and Ecological Resilience. [online] Available at: <https://truchargv.com/decolonize-your-lawn-the-case-for-native-plants-in-the-rgv/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • UBC (n.d.) Chakma Tribal Forest Management in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh. [online] Available at: <https://cases.open.ubc.ca/chakma-tribal-forest-management-in-the-chittagong-hill-tracts-of-bangladesh/> [Accessed 5 Apr. 2026].
  • United Nations (n.d.) STATE OF THE WORLD’s INDIGENOUs PEOpLEs. [online] Available at: <https://digitallibrary.un.org/record/674514/files/SOWIP_web.pdf> [Accessed 5 Apr. 2026].

লেখক

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন

Scroll to Top