ইসরায়েল বহু বছর ধরে একধরনের কৌশলগত খেলা খেলছে। তারা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এমন চুক্তি করে, যেখানে বিভিন্ন ধাপে কাজ সম্পন্ন করার কথা বলা হয়। প্রথম ধাপে ইসরায়েল তাদের নিজেদের প্রয়োজনীয় লক্ষ্য পূরণ করে—যেমন গাজায় আটক ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তি। কিন্তু এর পরের ধাপগুলো, যা ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যেতে পারত, সেগুলো ইসরায়েল সাধারণত বাস্তবায়ন করে না। এরপর ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায়, যাতে ফিলিস্তিনিরা প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য হয়। এই প্রতিক্রিয়াকে ইসরায়েল “উস্কানি” বলে আখ্যা দেয় এবং যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেঙে নতুন করে সংঘাত শুরু করে। এভাবে ইসরায়েল শান্তির পথ বন্ধ করে সহিংসতা চালিয়ে যায়।
যদি নতুন এই তিন-ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুমোদন হয়—যা ইসরায়েল অনুমোদন করবে কিনা এখনো নিশ্চিত নয়—তাহলে মনে হয় এটি শুধু নামমাত্র একটি উদ্যোগ হবে। ইসরায়েলের কাজকর্ম দেখে কোনোভাবেই মনে হয় না, তারা আসলে এই সংঘাত বা হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে চায়। ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা এখনো যুদ্ধবিরতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। কিন্তু এর মধ্যেই তারা গাজায় বোমা বর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (জানুয়ারি ১৬, ২০২৫) তাদের হামলায় অন্তত ৮১ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছে। এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ইসরায়েল সংঘাত বন্ধ করার চেয়ে সহিংসতা চালিয়ে যেতে বেশি আগ্রহী।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণার পরের দিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, হামাস চুক্তির শর্ত ভেঙেছে। তিনি এটিকে “শেষ মুহূর্তে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা” বলে উল্লেখ করেন। নেতানিয়াহু আরও বলেন, তার মন্ত্রিসভা বৈঠক করবে না, যতক্ষণ না মধ্যস্থতাকারীরা নিশ্চিত করে যে হামাস চুক্তির সব শর্ত মেনে চলছে। এর জবাবে, হামাস নেতানিয়াহুর অভিযোগ অস্বীকার করে। তারা বলে, তারা চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি মানছে এবং কোনো শর্ত ভাঙেনি।
এই চুক্তি তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন হবে। প্রথম ধাপ ৪২ দিন চলবে, যেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে। এই সময়ে হামাস ৩৩ জন ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দেবে। এর মধ্যে থাকবেন ৫ জন নারী, ৫০ বছরের বেশি বয়সী ও অসুস্থ বন্দিরা। এর বদলে ইসরায়েল প্রায় ১,০০০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে। প্রথম দিনেই ইসরায়েলি সেনারা গাজার জনবহুল এলাকা থেকে সরে যাবে। সপ্তম দিনে, যারা উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তারা সেখানে ফিরে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। প্রতিদিন গাজায় ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করবে, যাতে খাবার ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকবে।
চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ শুরু হবে যুদ্ধবিরতির ১৬তম দিনে। এই ধাপে হামাস বাকি ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তি দেবে। একই সময়ে ইসরায়েল গাজা থেকে পুরোপুরি সেনা সরিয়ে নেবে। তবে গাজা ও মিশরের মধ্যকার ফিলাডেলফি করিডোরের কিছু অংশে তারা উপস্থিতি রাখবে। এছাড়া, ইসরায়েল রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং-এর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে, যা গাজা ও মিশরকে সংযুক্ত করে। তৃতীয় ধাপে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার জন্য আলোচনা শুরু হবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে একটি বিবৃতি এসেছে, যা চুক্তি ভাঙার ইঙ্গিত দেয়। সেখানে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ফিলাডেলফি করিডোর থেকে ইসরায়েলি সেনা সরানো হবে না। বরং ইসরায়েল সেখানে অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করবে। তারা আরও অভিযোগ করেছে যে ফিলিস্তিনিরাই চুক্তি ভাঙার চেষ্টা করছে। ফিলিস্তিনিরা সবসময় গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা সরানোর দাবি জানিয়ে আসছে। এদিকে মিশর ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাদের সীমান্ত ক্রসিং নিয়ন্ত্রণের নিন্দা করেছে।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বড় মতপার্থক্য এই চুক্তি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। এমনকি যদি ইসরায়েল চুক্তি মেনেও নেয়, তারপরও এটি টিকে থাকবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। হামাস চায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। কিন্তু ইসরায়েলের নীতিতে তাদের “পুনঃসংযোগের অধিকার” স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, যা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখে। গাজার শাসন কারা করবে, তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা নেই। ইসরায়েল সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হামাসের ক্ষমতায় থাকা তাদের কাছে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। জাতিসংঘের সংস্থা UNRWA, যা বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য খাদ্য ও সাহায্য সরবরাহ করে, তা নিয়ে চুক্তিতে কিছু বলা হয়নি। ইসরায়েল এই সংস্থাকে বেআইনি বলেছে, যদিও গাজার প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ এর সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। গাজা, যা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত, পুনর্গঠনের কোনো পরিকল্পনাও এই চুক্তিতে নেই। আর স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিষয়েও চুক্তিতে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ইসরায়েলের প্রতারণামূলক ও কৌশলী আচরণ আগেও দেখা গেছে, আর এটিও তারই একটি অংশ বলে মনে হয়।
১৯৭৯ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিন ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি সংগঠন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (PLO)-কে এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। চুক্তিতে ইসরায়েল প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তারা জর্ডান ও মিশরের সঙ্গে মিলে ফিলিস্তিনি সমস্যার সমাধান করবে। এ ছাড়াও পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনিদের স্বশাসনের ব্যবস্থা করা এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল কথাতেই রয়ে গেছে; বাস্তবে সেগুলো কখনোই কার্যকর হয়নি।
এরপর ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে PLO ইসরায়েলের অস্তিত্ব মেনে নেয়, আর ইসরায়েল PLO-কে ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৫ সালে অসলো II চুক্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, দখলকৃত পশ্চিম তীর থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং শাসনের দায়িত্ব ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বদলে, ইসরায়েল পশ্চিম তীরকে তিন ভাগে ভাগ করে। এরিয়া এ-তে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কিছু নিয়ন্ত্রণ পায়, এরিয়া বি-তে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, আর এরিয়া সি, যা পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা, পুরোপুরি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফিলিস্তিনিদের জন্য এই চুক্তিগুলো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশার আলো দেখালেও বাস্তবায়িত হয়নি। ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, বসতি নির্মাণ বন্ধ করা, এবং ফিলিস্তিনিদের স্বশাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিগুলো বারবার ভঙ্গ হয়েছে। এর ফলে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিয়ে করা প্রতিশ্রুতিগুলো অমীমাংসিত থেকে গেছে, যা আরও হতাশা এবং ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের যে ঐতিহাসিক ভূমি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, সেখানে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার অধিকার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বীকৃত। কিন্তু PLO নেতা ইয়াসির আরাফাত এই অধিকারের দাবি ত্যাগ করেন। এতে তিনি অনেক ফিলিস্তিনির, বিশেষ করে গাজার মানুষের সমর্থন হারান। কারণ গাজার ৭৫ শতাংশ মানুষই শরণার্থী বা শরণার্থীদের বংশধর। বিখ্যাত লেখক এডওয়ার্ড সাঈদ এই চুক্তিকে “ফিলিস্তিনি আত্মসমর্পণের দলিল” বলে কটাক্ষ করেন এবং আরাফাতকে তীব্র ভাষায় সমালোচনাকান্ত তার আদর্শবাদী দর... করেন। অসলো চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলি সেনারা পশ্চিম তীর থেকে সরে যাবে বলে কথা ছিল, কিন্তু সেটা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। চুক্তিতে ইহুদি বসতি নির্মাণ বন্ধ করার কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, শুধু একতরফা কাজ নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়। চুক্তির সময় পশ্চিম তীরে প্রায় ২,৫০,০০০ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী ছিল। আজ সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৭,০০,০০০ হয়েছে। অসলো চুক্তি ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখালেও, চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি আজও হয়নি। এসব অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়েছে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা আরও দুর্বল করেছে।
সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক অসলো চুক্তিকে কঠোর ভাষায় সমালোচনাকান্ত তার আদর্শবাদী দর... করেছিলেন। তিনি বলেন, এটি আসলে “একটি নাটক, একটি মিথ্যা,” যা ইয়াসির আরাফাত ও PLO-কে তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের অর্জনগুলো ছেড়ে দিতে বাধ্য করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তার মতে, এই চুক্তি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ভুয়া আশা জাগিয়েছিল এবং তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে দুর্বল করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। অসলো চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইয়িতজাক রবিন ১৯৯৫ সালের ৪ নভেম্বর একটি সমর্থন সমাবেশ শেষে হত্যা হন। তাকে গুলি করে হত্যা করে ইগাল আমির নামের এক চরমপন্থী ডানপন্থী ইহুদি আইন ছাত্র। রবিনের বিরুদ্ধে তখন অনেক ডানপন্থী নেতা হুমকি দিয়েছিলেন, যার মধ্যে বর্তমান ইসরায়েলি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও ছিলেন। রবিনের স্ত্রী, লিয়া রবিন, তার স্বামীর হত্যার জন্য বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সমর্থকদের দায়ী করেন। নেতানিয়াহুর সমর্থকরা সমাবেশে রবিনকে নাৎসি পোশাক পরানো অবস্থায় দেখিয়ে লিফলেট বিতরণ করেছিল। ইয়িতজাক রবিনের হত্যা দেখিয়ে দেয় যে, ইসরায়েলের ভেতরে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ কতটা কঠিন এবং বিভাজনপূর্ণ ছিল। এটি শুধু শান্তি প্রক্রিয়ার গতি থামিয়েই দেয়নি, বরং চরমপন্থা এবং রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
ইসরায়েল গাজায় বারবার বড় ধরনের সামরিক হামলা চালিয়েছে, যাকে তারা বিদ্রূপ করে “ঘাস কাটা” বলে। এসব হামলায় বহু নিরীহ মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে, আর গাজার দুর্বল অবকাঠামো আরও ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব অভিযানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো অপারেশন রেইনবো (২০০৪), অপারেশন ডেজ অফ পেনিটেন্স (২০০৪), অপারেশন সামার রেইনস (২০০৬), অপারেশন অটাম ক্লাউডস (২০০৬), এবং অপারেশন হট উইন্টার (২০০৮)। ২০০৮ সালের জুন মাসে মিশরের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। কিন্তু ইসরায়েল সেই চুক্তি ভেঙে সীমান্তে হামলা চালায়, যেখানে ছয়জন হামাস সদস্য নিহত হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে ইসরায়েল মূলত হামাসকে প্রতিক্রিয়ায় হামলা চালাতে উসকে দেয়। হামাস এরপর রকেট ও মর্টার দিয়ে ইসরায়েলে আঘাত হানে।
ইসরায়েল এই প্রতিক্রিয়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রতিবারের মতো, ইসরায়েল এসব হামলাকে “আত্মরক্ষা” বলে দাবি করে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই ধরনের হামলা ও সংঘাত কেবল গাজার মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে এবং শান্তির পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
অপারেশন কাস্ট লিড ২০০৮-২০০৯ সালে ইসরায়েল গাজায় যে সামরিক অভিযান চালায়, তা ২২ দিন ধরে চলে। এই অভিযানে ইসরায়েল গাজায় ১,০০০ টনেরও বেশি বোমা ফেলে। ইসরায়েলের মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেম জানিয়েছে, এতে ১,৩৮৫ জন মানুষ মারা যায়। তাদের মধ্যে ৭৬২ জন ছিলেন সাধারণ মানুষ, আর এর মধ্যে ৩০০ জন ছিল শিশু। অন্যদিকে, হামাসের রকেট হামলায় চারজন ইসরায়েলি নিহত হন। একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলের নয়জন সেনাও মারা যায়, যাদের মধ্যে চারজন নিজেদের বাহিনীর ভুল গুলিতে প্রাণ হারান। পরে ইসরায়েলের একটি পত্রিকা হারেৎজ জানায়, এই অভিযান শুরু করার পরিকল্পনা ছয় মাস আগেই করা হয়েছিল। এই অভিযান গাজার মানুষদের জন্য ভয়াবহ ধ্বংস ও মানবিক সংকট নিয়ে আসে, বিশেষ করে সাধারণ মানুষ ও শিশুদের জন্য।
ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ আভি শ্লাইম, যিনি একসময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন, বলেন যে ইসরায়েলি সেনাদের নিষ্ঠুরতা এবং তাদের নেতাদের মিথ্যা কথা বলা একে অন্যের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি ইসরায়েলের প্রচারণাকে “মিথ্যার সমষ্টি” বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর গাজায় অভিযান চালিয়ে ছয়জন হামাস সদস্যকে হত্যা করে ইসরায়েলই যুদ্ধবিরতি ভেঙেছিল, হামাস নয়। আভি শ্লাইম আরও বলেন, ইসরায়েলের আসল লক্ষ্য শুধু নিজেদের জনগণকে রক্ষা করা নয়। তারা গাজার সাধারণ মানুষকে হামাসের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে, হামাস সরকারের পতন ঘটাতে চায়।
ইসরায়েল বারবার গাজার ওপর হামলা চালিয়েছে। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে তারা অপারেশন পিলার অফ ডিফেন্স নামে একটি সামরিক অভিযান করে। এরপর ২০১৪ সালের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাত সপ্তাহ ধরে অপারেশন প্রোটেক্টিভ এজ পরিচালনা করে। এতে ২,২৫১ ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাদের মধ্যে অনেকেই সাধারণ মানুষ ছিলেন। অন্যদিকে, ৭৩ জন ইসরায়েলি নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই সেনা সদস্য। ২০১৮ সালে গাজার সীমানায় দ্য গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন নামে ফিলিস্তিনিদের এক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হয়। তবে, ইসরায়েলি সেনারা সেই প্রতিবাদে গুলি চালিয়ে ২৬৬ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে এবং আরও ৩০,০০০ জনকে আহত করে। ২০২১ সালের মে মাসে, জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে প্রার্থনা করা ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি পুলিশ হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজায় বড় ধরনের হামলা করে, যাতে ২৫৬ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। এরপর, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে, আল-আকসা মসজিদে আবারও ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানো হয়।
৭ অক্টোবর, ২০২৩-এ ঘটে এক ভয়াবহ ঘটনা। সেদিন গাজার নিরাপত্তা ব্যারিয়ার, যা ফিলিস্তিনিদের ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে একপ্রকার খোলা আকাশের বন্দিশিবিরে আটকে রেখেছিল, ভেঙে ফেলা হয়। এরপর ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীরা হামলা চালায়, যেখানে প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত হয়। এর মধ্যে অনেকেই নিজেদের ভুল গুলিতে প্রাণ হারায়। এই ঘটনার পর ইসরায়েল গাজায় বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু করে, যা তারা সোয়ার্ডস অব আয়রন নামে চালায়। তারা গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার অজুহাত খুঁজছিল, আর এই হামলাটি সেটি করার সুযোগ দেয়।
কিন্তু এখানেই এই ভয়াবহতার শেষ নয়। ইসরায়েলের লক্ষ্য এখনও পরিষ্কার – ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজ ভূমি থেকে মুছে ফেলা। এখন যে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হচ্ছে, সেটিও হয়তো আরেকটি নির্মম অধ্যায় হতে পারে, যা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবু আমরা এই মুহূর্তে একটাই আশা করি – এই হত্যাযজ্ঞ যেন শেষ হয়, মানুষ যেন শান্তি ফিরে পায়।
স্বত্ত্বঃ লেখাটি ক্রিস লিন হেজে’সের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে সংগ্রহকৃত।
অনুবাদঃ খায়রুল হাসান।
লেখকবৃন্দ
পুলিৎজার পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক।
খায়রুল হাসান জাহিন ক্রিমসন থিওরির উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন। বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থায় তরুণ গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তার আগ্রহের বিষয় স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফর্মেশন, ইকোলজিক্যাল ইকোনমিক্স।








