এই প্রবন্ধটিতে সটিরিস একটি নির্দিষ্ট রেল-দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাগুলোর বিশদ অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, এই ধরনের ঘটনাগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, এবং শোষণের সাথে গভীরভাবে জড়িত। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট থেকে এই আলোচনাকে দূরের কোনো বিষয় বলে মনে হলেও, বাস্তবে তা এখানকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথেও সংযুক্ত। পাঠকের সামনে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—আমরা কি এই ঘটনাগুলিকে একইভাবে বিশ্লেষণ করি? যদি না করি, তাহলে কেন? এই অনুবাদ সেই প্রশ্নগুলোকে উস্কে দেওয়ার এক প্রয়াস।
অনুবাদকের কথা
পুঁজি প্রথম খন্ডের দশম অধ্যায়ে মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... লন্ডনে একটি বিচারাধীন রেল-দুর্ঘটনার বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনজন রেলপথ কর্মী যাদের উপর দুর্ঘটনার মূল দায়ভার চাপানো হয়েছিল তাদের একটানা ৪০ ঘন্টাও কাজ করতে হত কোন বিরতি ছাড়া। এই ছোট আলোচনার মাধ্যমে মার্ক্স
কার্ল মার্কসের জন্ম হয... আমাদের এই সিদ্ধান্তে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন যে এই দুর্ঘটনা আসলে কেবলমাত্র একটি ‘দুর্ঘটনা’ নয়। বরং, তা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিভিন্ন ভয়ংকর প্রতিফলনের একটিমাত্র। সেরকমই একটি ‘রেল-দুর্ঘটনা’ এবং তৎপরবর্তী গ্রীস জুড়ে ব্যাপক গণ-আন্দোলন এই প্রতিবেদনটির মূল উপজীব্য। সতিরিস সমসাময়িক গ্রীসের রাজনৈতিক চালচিত্রে এই বিষয়গুলির গভীরে আলোকপাত করতে চেয়েছেন, আমাদের দেখাতে চেয়েছেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও ২০১৫-র অর্থনৈতিক সংকট-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা কিভাবে এই ‘দুর্ঘটনাকে’ সম্ভব করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বসে এই আলোচনা দূর থেকে দেখতে অচেনা মনে হলেও, একটু খুঁজলেই আমাদের সমসাময়িক চারপাশের রাজনীতির সাথে যোগ পাওয়া যাবে। ডানপন্থী রাজনীতি, তাদের পেটোয়া গণমাধ্যম দিয়ে জনমত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা আজকে সবার পরিচিত। সেইসঙ্গে যেমন পরিচিত ইজরায়েলের অবৈধ স্পাইওয়্যার (পেগাসাস) ব্যবহার করে নিজের দল, অন্যের দল, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক সহ আরো অনেকের উপর প্রধানমন্ত্রীর নজরদারি ও আড়িপাতা। রেল-দুর্ঘটনাও দক্ষিণ এশিয়ায় কম হয় না। কিন্তু আমরা কি এই ভাবে ভেবে দেখার চেষ্টা করি? যদি না করে থাকি, তাহলে কেন করি না? করার কোন প্রয়োজনীয়তা কি নেই? এই প্রশ্নগুলিকে উস্কে দেওয়ার জন্যই এই অনুবাদ। কোন গড়পড়তা রাজনৈতিক সমাধান সতিরিস আমাদের বলে দেননি, কিন্তু তিনি তার দিকনির্দেশ করতে চেয়েছেন। সেই দিকনির্দেশনা নিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের প্রেক্ষাপটের জন্য প্রয়োজনীয় কিছুমাত্র খুঁজে পাই, তাহলেই এই আলোচনা সার্থক হবে।
গ্রীসের গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় দিন ছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ঐ দিন বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সাধারণ ধর্মঘটের ডাকে প্রতিটি গ্রীক শহর ও মহানগরে, এমনকি প্রবাসী গ্রীক সমাজেও বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। কেবলমাত্র এথেন্সের সমাবেশে আনুমানিক ৪ লাখ থেকে ৮ লাখ লোক জমায়েত হয়েছিল, যা সবার মতে এথেন্সে আয়োজিত সবচেয়ে বড় গণসমাবেশ ছিল। ঐ দিনের সমাবেশের আগে ২৬ জানুয়ারি, রবিবার, ছিল আরেকটি সর্বাত্মক প্রতিবাদের দিন, যেদিন সারা গ্রীসজুড়ে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশগুলি গত দশকের পর বৃহত্তম গণসমাবেশ ছিল।
আজকের এই প্রতিবাদের ঢেউ বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে দুই বছর আগে, ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে। ১৫০ কিমি প্রতি ঘণ্টা বেগে আসা একটি থেসালোনিকি-গামি যাত্রীবাহী ট্রেন ও ৯০ কিমি প্রতি ঘণ্টা বেগে আসা একটি এথেন্স-গামি মালবাহী ট্রেন বৃহত্তর তেম্পি উপত্যকায় মুখোমুখি ধাক্কা খায়। গ্রীসের বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক এই রেল দুর্ঘটনায় ৫৭ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়, যার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল থেসালোনিকি থেকে ফেরত আসা ছাত্র-ছাত্রী। বেশিরভাগ মানুষ ট্রেন দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা গেলেও, কিছু মানুষ সংঘর্ষ-পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডে মারা যায়, যা সম্ভবত মালবাহী ট্রেনে (তালিকাবহির্ভূতভাবে) থাকা কোনো এক ধরনের দাহ্য পেট্রোপণ্যের কারণে শুরু হয়েছিল।
আপাতদৃষ্টিতে এই দুর্ঘটনার কারণ ছিল দুটি ট্রেনের একই লাইনে থাকা, যা লারিসা রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টারের সুইচ সেট করার ব্যর্থতার কারণে ঘটে। কিন্তু এই ধরনের দুর্ঘটনাকে সম্ভব করে তোলার পিছনে আসল কারণ ছিল রেলপথ এবং তৎসংলগ্ন অবকাঠামোর প্রতি বহু বছরের চূড়ান্ত অবহেলা, বাজেট হ্রাস, ব্যাপকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী ছাঁটাই, এবং যাত্রীবাহী ও মালবাহী রেল পরিষেবার বেসরকারিকরণ। বর্তমানে, গ্রীসে প্রতি কিলোমিটার রেললাইন পিছু সবচেয়ে কম রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামোগত কর্মী রয়েছে এবং প্রতি কিলোমিটার রেললাইন পিছু রাষ্ট্রীয় ব্যয়ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। লাইনের যে অংশে দুর্ঘটনাটি ঘটে সেটি ছিল ‘ব্লাইন্ড পার্ট’, যেখানে ট্রেন দুটির অবস্থানগত রিয়েল-টাইম তথ্যের কোনো দূরবর্তী ব্যবস্থা ছিল না এবং দুর্ঘটনা রোধ করতে পারার ক্ষমতা রাখা ECTS ব্যবস্থাও, যা বহু বছর ধরে নির্মাণাধীন, কার্যকরী ছিল না। সেই শিফটের অতি সম্প্রতি নিযুক্ত স্টেশনমাস্টার, যিনি লাইন সুইচটিকে স্বাভাবিক অবস্থানে না নিয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ভুলটি করেছিলেন, তিনি সম্পূর্ণ একা তার পদে প্রচুর চাপের মধ্যে ছিলেন। তাকে একাধিক যোগাযোগ সংক্রান্ত বার্তার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আরও একটি খারাপ বিষয় হল, লাইনে ঘন ঘন সমস্যার কারণে, ট্রেন চালকদের বিপরীত লাইনে পাঠানোর অভ্যাস ছিল। এটা থেকে ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে কেন যাত্রীবাহী ট্রেনের চালক সম্ভবত ভেবেছিলেন যে নিম্নগামী লাইনে উপরের দিকে যাওয়া সমস্যাজনক নয়।
নিউ ডেমোক্রেসি (New Democracy) সরকারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্ঘটনা-সম্পর্কিত আখ্যান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা এবং দুর্ঘটনাটিকে শুধুমাত্র মানবিক ত্রুটি হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে স্টেশনমাস্টারের উপর সম্পূর্ণ দোষ চাপানো। তারা সমস্তরকম চেষ্টা করছিল দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত কাজগুলিতে বিলম্বের জন্য দায় অস্বীকার করতে। তারা আরও খারাপ করে স্টেশনমাস্টারের বার্তালাপের রেকর্ডিং গণমাধ্যমে ফাঁস করে দিয়ে, যা ‘মানবিক ত্রুটি’ সংক্রান্ত ব্যাখ্যাটিকে আরও জোর দেয় এবং পরে প্রমাণিত হয় বিকৃত রেকর্ডিং হিসেবে। পরিবহন মন্ত্রী কোস্টাস কারামানলিস (গ্রীসের অন্যতম বড় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য) রেল দুর্ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগে রেলপথের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে সমালোচনাকে অপমান বলে অভিহিত করেন, যদিও রেলওয়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলি বারবার সমসাময়িক রেলপথ পরিচালনার সাথে সম্পর্কিত বিপদগুলির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি দুর্ঘটনার পর মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করলেও, পরবর্তী নির্বাচনে নিউ ডেমোক্রেসির তালিকায় তিনি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং যথাযথভাবে পুনঃনির্বাচিত হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নেতৃত্বে সেই সময়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভ সত্ত্বেও নিউ ডেমোক্রেসি ২০২৩ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে। তারা ৪০.৫৬% ভোট পেয়ে সহজেই সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, যেখানে সিরিজা (SYRIZA) মাত্র ১৭.৮৩% ভোট পেতে সক্ষম হয়। অ্যালেক্সিস সিপ্রাস পদত্যাগ করেন, যার পরবর্তীতে সিরিজা গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়, যার থেকে ক্যাসেলাকিস সম্পর্কিত জটিলতা এবং দলভাগ পর্যন্ত হয়।
একই সময়ে, ট্রেন দুর্ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ন্যায়বিচারের নামে একটা প্রহসনে পরিণত হয়। দুর্ঘটনার কয়েকদিন পরেই ঘটনাস্থলের প্রমাণ ধ্বংস করে জায়গাটার সমতলকরণ হয়, আপাতভাবে ক্রেন চলাচলের জন্য জমি আরও স্থিতিশীল করতে। ময়নাতদন্তগুলি সব ছিল অতি সংক্ষিপ্ত, যেখানে মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে কোনো বিস্তৃত গবেষণা করা হয়নি, এবং সংগৃহীত সব জৈব উপাদান অতি শীঘ্রই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল।
সর্বোপরি, প্রাথমিক তদন্তটি যে ভিত্তিহীন তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে করা হয়েছিল সেটা ছিল যে দুর্ঘটনার পরপরই নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান বিশাল আগুনের গোলাটি বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভের ট্রান্সফরমারে থাকা সিলিকন তেল থেকে তৈরি হয়েছিল। জাতীয় বিমান তদন্ত এবং রেলওয়ে দুর্ঘটনা ও পরিবহন সুরক্ষা (HARSIA) কেবল নামকাওয়াস্তে হিসেবে থাকা এবং দুর্ঘটনার কয়েক মাস পরে তাদের কাজ শুরু করা বিষয়টিকে আরও খারাপ করে তুলেছে। ফলতঃ, দুর্ঘটনাস্থলটি তারা মূলাকারে পরীক্ষাও করতে পারেননি, যা পুরো বিষয়টিকে আরও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়।
একই সময়ে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণগুলি উন্মোচনের জন্য, সত্যপ্রকাশের ও ন্যায়বিচারের দাবিতে, ভুক্তভোগীদের আত্মীয়-পরিজনদের সমিতি বড় সংগ্রাম শুরু করে। এই সাপেক্ষে কোনো বিপদ নেই মনে করে মিতসোটাকিসের সরকার প্রকৃত রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিতে এবং জড়িত মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো অপরাধমূলক দায়বদ্ধতা নিয়ে ভাবতে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে। একই সাথে, দুর্ঘটনা নিয়ে আরও বেশি প্রশ্ন উঠতে শুরু করে কারণ সংগৃহীত মাটির নমুনায় পেট্রোপণ্যের, বিশেষ করে জাইলিনের, প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটা প্রশ্ন তুলে দেয় যে মালবাহী ট্রেনটি অজানা ও তালিকাবহির্ভূতভাবে দাহ্য পদার্থ, সম্ভবত পেইন্ট থিনার যেটা অবৈধ অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করার জন্য প্রায়শই পেট্রলের সাথে মিশ্রিত করা হয় কারণ এগুলির উপর জ্বালানি কর প্রযোজ্য নয়, বহন করছিল কিনা। মালবাহী ট্রেনের লোডিং-এর কোনো ফুটেজ না পাওয়া এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বিচার-বিভাগীয় তদন্তের মতো, দুর্ঘটনাস্থল সমতলকরণ ও পরবর্তী প্রমাণ ধ্বংসের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনতে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব ঘটে। গ্রীক পার্লামেন্টের তদন্ত কমিটি একটা বিদ্রূপের রূপ নেয়, যেখানে নিউ ডেমোক্রেসি নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করে এবং সরকারকে সমস্ত দায়ভার থেকে মূলত অব্যাহতি দিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করে। এই সময়ে ইউরোপীয় পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস ১৮ জন সরকারি কর্মকর্তা সহ ২৩ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে, যা গ্রীক রেলপথে দূরবর্তী ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সিগন্যালিং সিস্টেম পুনরুদ্ধারের জন্য কুখ্যাত ‘চুক্তি ৭১৭’, যেখানে EU-ও অর্থ বিনিয়োগ করেছিল, কার্যকর করার সাথে সম্পর্কিত অপরাধের জন্য। তারাও গ্রীক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অসহযোগিতার অভিযোগ তোলে।
একরকমভাবে দেখলে, গ্রীক সরকার আড়িপাতা বা নজরদারি কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কৌশল অবলম্বন করছিল এই পরিস্থিতি সামাল দিতে। ২০২২ সালে প্রকাশিত হয় যে পাসোকের (PASOK) নেতা নিকোস আন্দ্রোলাকিস, বিভিন্ন সাংবাদিক, নিউ ডেমোক্রেসি সরকারের নেতা-মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ বিচারক এবং উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা ইসরায়েলি অবৈধ স্পাইওয়্যার মারফত নজরদারির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ‘আইনি’ আড়িপাতার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পরেও। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দ্বারা এটি পরিচালিত হওয়ার প্রচুর প্রমাণ পাওয়া গেলেও সরকার কেবল দায়িত্বই অস্বীকার করে থেমে থাকেনি, সুপ্রিম পেনাল কোর্টের প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের তদন্তটিকেও নস্যাৎ করে দিয়েছে। তারা ঘোষণা করে যে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অন্যায় করা হয়নি।
দুর্ঘটনার পরবর্তী সময় থেকে, টেম্পি ট্র্যাজেডি এমন একটি বিষয় ছিল যা গোটা সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ২০২৪ সালের ১১ই অক্টোবর, এথেন্সে একটি বিশাল কনসার্টের আয়োজন করা হয় যেখানে ৫০,০০০ মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং লক্ষ লক্ষ লোক এটি অনলাইনে দেখছিলেন, যদিও সরকার তখনও প্রকৃত দায় নিতে অস্বীকার করছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই ঘটনাক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারগুলির দ্বারা নিযুক্ত বিশেষজ্ঞদের দল তাদের তদন্ত প্রতিবেদনের অংশ হিসাবে একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যা আগুনের গোলা এবং আগুনের বিস্তারের ফ্রেম-বাই-ফ্রেম বিশ্লেষণকে আইফোন দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরুরি ১১২ লাইনে সংযোগ স্থাপনের সময়কার শব্দ রেকর্ডিংগুলিকে একত্রিত করে বানানো হয়েছিল। এই রেকর্ডিংগুলি স্পষ্ট করে দেয় যে সংঘর্ষের পরেও কিছু ব্যক্তি বেঁচে(১৯২৮-১৯৬৭) আর্জেন্টিন... ছিলেন, যারা পরবর্তীতে অক্সিজেন-গ্রাসী আগুনে মারা যান। “আমার অক্সিজেন নেই,” একজন ভুক্তভোগীকে বলতে শোনা যায়। “আমরা মারা যাব… মার্থি, আমি তোমাকে ভালোবাসি,” একজন শিক্ষার্থীকে তার বন্ধুকে বলতে শোনা যায়। এটি সরকারের পক্ষ থেকে বারংবার দেওয়া বক্তব্যের বিপরীত ছিল, যেখানে বলা হচ্ছিল যে বা যারা দাহ্য পদার্থের উপস্থিতিকে ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ হিসাবে নির্দেশ করছেন তারা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ প্রচার করছেন।
এখান থেকে ঘটনা ঘুরতে শুরু করে। রাজনৈতিক দায়িত্বহীনতা এবং তাকে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা ব্যাপক ও বৃহত্তর ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
ভুক্তভোগীদের পরিবারের সমিতির পক্ষ থেকে এমতাবস্থায় ২৬শে জানুয়ারি, রবিবার, একটি সমাবেশের আহ্বান দেওয়া হয়। আহ্বানটি ২২ জানুয়ারি দেওয়া হয়েছিল, এবং অতি শীঘ্রই স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি সমাজের মধ্যে গভীর ছাপ ফেলেছে। এই সময়ের একটি মতামত জরিপ অনুসারে, ৭০% এরও বেশি মানুষ মনে করছিল যে এটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর ফলস্বরূপ এথেন্স এবং অন্যান্য শহরের পূর্বোল্লিখিত মিছিলগুলি যা ২০১০-এর দশকের পর সবচেয়ে বৃহত্তম জনসমাবেশ ছিল। এটি একটা সন্ধিক্ষণ ছিল।
সরকার এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে বলতে থাকে তারা গ্রীক বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল। তবে একই সময়ে, ভুক্তভোগীদের আত্মীয়স্বজনদের বদনাম করার প্রচেষ্টা চালায় এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ প্রচারের পুরনো অভিযোগ পুনরায় তোলে। অবশেষে, সরকারী ভাষ্যের মূলকথা ছিল যে এই সমাবেশগুলি “অরাজকতা” এবং “অশান্তি” তৈরির ষড়যন্ত্রের অংশ, যা ২০১১ সালের স্কয়ার আন্দোলনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। তবে সরকারের এসব প্রচেষ্টা সফল হয়নি, এবং সমাবেশগুলিকে আগেভাগে বানচাল করার সরকারি প্রয়াস ব্যর্থ হয়।
সরকারী HARSIA তদন্তের ফলাফল প্রকাশ ক্ষোভের আগুনে আরও ঘি ঢালে। তাদের প্রতিবেদনে রেলপথ ব্যবস্থার করুণ চিত্র ফুটে ওঠে, যা চরম অর্থাভাব, জনবল সংকট এবং নিরাপত্তার অভাবে জর্জরিত। প্রতিবেদনে এটাও উল্লেখ করা হয় যে প্রমাণ নষ্ট করার ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এটাও ব্যাখ্যা করা হয় যে অগ্নিগোলকের সৃষ্টি সিলিকন তেল থেকে হয়নি, বরং একটি ট্রেনে বহন করা পেট্রোপণ্য থেকে হয়েছিল।
২৮ ফেব্রুয়ারির সকাল নজিরবিহীন দৃশ্যের জন্ম দেয়। এথেন্স ও থেসালোনিকির কেন্দ্রস্থল থেকে শুরু করে গ্রিসের প্রতিটি শহর ও মহানগরে মানুষের ঢল নেমে আসে। এটি ছিল সত্যিকারের এক সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘটএটি একটি ধর্মঘট, যেখান...; যেদিন বেশিরভাগ দোকান বন্ধ ছিল এবং যারা সাধারণত এ ধরনের সমাবেশে অংশ নিতে পিছপা হন, তারাও মনে করছিলেন যে সেখানে উপস্থিত হওয়া তাদের নৈতিক দায়িত্ব। ট্রেড ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, স্কুল অভিভাবক সমিতি, দোকানমালিক সমিতি, পৌরসভা এবং ক্রীড়া ক্লাবগুলো মানুষকে ব্যাপকভাবে সমাবেশে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। সমাবেশগুলোর ব্যাপকতা এবং আকার যতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, তার চেয়েও গভীর ছিল সেই দায়িত্ববোধের অনুভূতি — যেখান থেকে মানুষ মনে করছিল, “আমাকেও সেখানে থাকতে হবে”। সেদিন এই দায়িত্ববোধের অনুভূতি থেকেই ইতিহাস রচিত হয়েছিল।
এসব সমাবেশ নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য ক্ষতিকর ছিল। এগুলো কোনো বিরোধী দলের আয়োজন করা সমাবেশ ছিল না, এমনকি এগুলোকে “বিরোধীদলপন্থী” বলেও চিহ্নিত করা যায় না। বরং এসব ছিল ন্যায়বিচার, নিরাপদ গণপরিবহনের — যা জনসাধারণের মৌলিক অধিকার — পক্ষে এবং রেলপথের বেসরকারিকরণের বিপক্ষে আয়োজিত সমাবেশ। পাশাপাশি, এগুলো ছিল এমন এক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যাকে সমাজ প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা চালাতে দেখছিল। সম্ভবত এ কারণেই শেষ পর্যন্ত সরকার দমনপীড়নের পথ বেছে নেয়। শুধু দমনপীড়নের ভাবমূর্তি তৈরি করতেই নয়, বরং মানুষকে ভয় দেখানোটাই উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু তার জন্য গ্রীসজুড়ে এত মানুষের রাস্তায় নামার তাৎপর্য কমে যায় না। প্রতিবাদ ও সমাবেশ খুব কেতাদুরস্ত নয় — এ নিয়ে আমাদের নিজেদের বিভ্রান্তি রেখে লাভ নেই। গ্রীক সমাজ ঘোরতরভাবে বিভক্ত এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। প্রতিবাদী সমাবেশ নিয়ে প্রায়ই শোনা যায়, “ওখানে যেও না, বিশৃঙ্খলা হবে,” এবং অনেকের কাছেই সেই কথা বিশ্বাসযোগ্য। তদুপরি, সরকার ও তাদের ‘অনুগত গণমাধ্যম’ — যা সমাজের বড় অংশের কাছে জনপ্রিয় — স্পষ্টভাবে প্রচার করেছিল যে এই সমাবেশগুলো হল সরকারের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে সাজানো একটি “ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা”।
তবু মানুষ সমস্ত বাধা অগ্রাহ্য করে এমন অভূতপূর্ব সংখ্যায় সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিল — সেইসব বাধা, যা সাধারণত এই ধরনের সম্মিলিত কার্যক্রমকে মাথা তুলতে দেয় না। তারা সমাবেশে এসেছিল কারণ ‘সরকারি ব্যবস্থাপনা’ বলে যেটা তাদের সামনে চালানো হচ্ছিল, তারা সেটাকে আর বিশ্বাস করতে পারছিল না।
আর বিষয়টি শুধু এটাই নয় যে তারা সমাবেশে এসেছিল; বরং তারা দীর্ঘদিন মনে রাখবে যে তারা সেই দিন সমাবেশে ছিল। তারা অনুভব করবে যে এই অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে গভীর ছাপ রেখে গেছে। তারা অনুভব করবে যে সেদিন তারা ইতিহাসের অংশ ছিল। সেই উপলব্ধিই তাদের ভাবনাকে এই মুহূর্ত থেকে ভিন্নভাবে গড়ে তুলবে।
এটা কেন গ্রীসে ঘটছে? এই দেশটিকেই ইউরোপের নয়া-উদারনৈতিক স্থিতিশীলতার মডেলগুলির মধ্যে আদর্শ উদাহরণ হিসেবে প্রচলিতভাবে তুলে ধরা হয়। যতই হোক, ৪০%-এর বেশি নিরাপদ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইউরোপের বেশির ভাগ মধ্য-দক্ষিণপন্থী দলগুলোর কাছে এখনো স্বপ্নকল্পনা মাত্র। বিশেষ করে যখন এই সাফল্য এসেছে শুধু তেম্পির দুর্ঘটনা আর গোপনে আড়িপাতার কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে নয়, এমনকি ইউরোপে মহামারির সময়ে অন্যতম বাজে ব্যবস্থাপনার পরে।
কিন্তু সমসাময়িক কালে গ্রীস এক গভীরতর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যদিও কেউ দেখাতে পারে যে গ্রীসের প্রবৃদ্ধি বেশিরভাগ ইউরোজোন দেশগুলোর তুলনায় বেশি, কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি মূলত নাগরিক ব্যয়, পর্যটন এবং রিয়েল এস্টেটের উপর নির্ভরশীল — উচ্চ মূল্য সংযোজিত (high value-added) খাতে বিনিয়োগের উপর নয়। শ্রমিকদের মজুরি আপাতভাবে বৃদ্ধি পেলেও, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার নিরিখে গ্রীসের মজুরি ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন, যা জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট (cost-of-living crisis) তৈরি করেছে। এই সংকটকে আরও তীব্রতর করেছে আবাসন সংকটের (housing crisis) ক্রমবর্ধমান লক্ষণগুলো, বিশেষ করে এথেন্সের মতো বড় শহরগুলোতে, যেখানে এয়ারবিএনবি (Airbnb) এবং ক্রমবর্ধমান রিয়েল এস্টেট মুনাফাবাজি (real-estate speculation) পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট, যা দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও অর্থের ঘাটতিতে ভুগছে এবং ক্রমাগত আক্রমণের মুখে রয়েছে। এসব সমস্যা এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও অসন্তোষের অনুভূতি বাড়িয়ে তুলেছে, যা গত দুই মাসের জনমত জরিপে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তবে ক্রমবর্ধমান বৈধতার সংকটের (crisis of legitimacy) পরেও, এই অসন্তোষ কোনো রাজনৈতিক বিকল্প বা প্রতিবাদের স্পষ্ট পথ খুঁজে পায়নি। ফলস্বরূপ, গ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির যে বৈপরীত্য তা হলো — শাসক দল নিউ ডেমোক্রেসি সবচেয়ে সুসংহত ভোটভিত্তি ধরে রাখতে পেরেছে। তবে সেটি একটি সংখ্যালঘু ভিত্তি, যা মূলত তাদের নিয়েই গঠিত যারা মনে করে যে পরিস্থিতি সঠিক পথে এগোচ্ছে অথবা যারা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল। এখনো পর্যন্ত মিতসোতাকিস সরকারের স্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হলো বিরোধী পক্ষের অনৈক্য এবং তাদের দুর্বলতা। নিউ ডেমোক্রেসির ভোট অনুমান করা হচ্ছে ৩০% এর কম, পাসোক ১৪%, সিরিজা ৬-৭%, কমিউনিস্ট পার্টি প্রায় ৯%, এবং উগ্র-দক্ষিণপন্থী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৫-২০% এর মধ্যে অবস্থান করছে, যা প্রক্ষেপণের ওপর নির্ভরশীল।
এই সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তেম্পি দুর্ঘটনা একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এবং সেই প্রেক্ষাপটের এমন একটি উপমা হয়ে ওঠে, যা গভীরতর সামাজিক নিরাপত্তার মূল কারণগুলির প্রতিনিধিত্ব করে। মানুষের মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে যায় যে সরকারী নীতিগুলি শুধু দুর্ঘটনাটিকে সম্ভব করে তুলেছে তাই নয়, বরং সরকার এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার জন্যও দায়ী। এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ — বহু দশক ধরে নয়া-উদারনৈতিক নীতি চালু থাকা সত্ত্বেও এখনো জনগণের মনে এই বিশ্বাস গভীরভাবে প্রোথিত যে রাষ্ট্র কিছু মৌলিক পরিষেবা, যেমন রেলপথ নিরাপত্তা, নিশ্চিত করতে সক্ষম। এই বিশ্বাসেই চিড় ধরে ট্রেন দুর্ঘটনার পর, যখন সরকার দায় নিতে অস্বীকার করে এবং প্রমাণ লোপাটের প্রচেষ্টা সামনে আসে। গোপনে আড়িপাতা বা নজরদারি কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে যেখানে জনগণের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করেছিল — “ক্ষমতাবানরা এমনটাই করে থাকে” — সেখানে তেম্পির দুর্ঘটনা ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এটি জনগণের কাছে রাষ্ট্রের এক মৌলিক সামাজিক চুক্তির প্রতি অবমাননা হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই ক্ষোভ আরও তীব্র হয় কারণ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন নিহতদের আত্মীয়স্বজনেরা, বিশেষত তাদের বাবা-মায়েরা, এবং এটি সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর নৈতিক ও সামাজিক দাবিতে পরিণত হয়। ন্যায়বিচার, সত্য এবং “প্রশ্বাস” (oxygen) এর এই দাবি এমন এক জায়গা তৈরি করে যেখানে মানুষজন গণসমাবেশে একত্রিত হয়ে নিজেদের ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের সুযোগ পায়।
এই প্রক্রিয়াটিই স্পষ্ট করে দেয় যে নিউ ডেমোক্রেসি সরকার আসলে একটি সংখ্যালঘু অবস্থানে রয়েছে। কারণ এখন এর বিরোধিতা করা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী শুধুমাত্র জনমত জরিপের একটি পরিসংখ্যানগত গড় নয়, যার বিপরীতে সরকার এখনো দাবি করতে পারত যে ‘আমি স্থিতিশীলতার প্রতিনিধিত্ব করি’। বরং, এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখন অনস্বীকার্য বাস্তব — যা গণবিক্ষোভের বিপুল জনসমাগমে রূপ লাভ করেছে।
অন্যভাবে বললে, এখন গ্রীক সরকার আর দাবি করতে পারে না যে এই সরকারই একমাত্র বিকল্প — যে সরকার বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এবং দুর্বল বিরোধী দলগুলিকে মোকাবিলা করতে সক্ষম। এটার কারণ এটা নয় যে বিরোধী দলগুলো বিভক্ত ও অকার্যকর থাকেনি, বরং বিক্ষোভ ও সমাবেশগুলোই প্রমাণ করেছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এখন অন্য কিছু চায়, তারা মনে করছে তাদের সেই দাবি স্পষ্টভাবে জানাতে হবে — এবং নিশ্চিতভাবেই তারা এই সরকারকে আর চায় না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার তার প্রকৃত বৈধতা একেবারেই হারিয়েছে, যা পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।
নিঃসন্দেহে, মিতসোতাকিস সরকার তার সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে শাসন চালিয়ে যাবে। সম্ভাবনা আছে যে আগামী সপ্তাহে অনাস্থা প্রস্তাবেও তারা টিকে যাবে (যা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে – অনুবাদক)। যদি এই প্রতিবাদ বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে, তাহলে সরকার হয়তো দমন-পীড়ন আরও বাড়িয়ে তুলবে। তারা বিরোধী দলগুলির সমস্যাপূর্ণ অবস্থা থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবে। সরকার কিছু ‘রফা’ করার চেষ্টা করবে — যেমন প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ২০২৭ সালের মধ্যে রেলপথ সম্পূর্ণরূপে আধুনিক ও নিরাপদ করা হবে। সরকার আশা করবে যে মানুষ আবার তাদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায় ফিরে যাবে (যদিও প্রকৃতপক্ষে এই দৈনন্দিন সমস্যাগুলিই তো জনগণের অসন্তোষের আগুনে ঘি দিয়েছে)। তারা কিছু লোককে হয়তো ‘বলির পাঁঠা’ সাজাবে। দুর্ঘটনাস্থল সমতলকরণের জন্য দায়ী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংসদের মাধ্যমে ফৌজদারি তদন্তও শুরু করা হতে পারে এই কারণে।
কিন্তু তবুও, এটি এমন একটি সরকার যার প্রকৃত বৈধতা খুবই কম থাকবে। আর সমাজের বিভিন্ন অংশ, বিশেষত তরুণরা ক্রমশ আরও বেশি প্রশ্ন করবে — “আপনারা আমার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পেলেন কীভাবে?”। সম্ভাবনা আছে যে, এখন থেকে সরকারের আইনপ্রণয়নের প্রস্তাবগুলো রাস্তায় আরও তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়বে, কারণ সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষ এখন মনে করে যে তাদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা আছে।
মূল বিষয় হল, সরকারের পক্ষ থেকে গোঁয়ারের মতো মূল সমস্যাটিকে অগ্রাহ্য করে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ছোটা হবে। অর্থাৎ সমাজ থেকে উঠে আসা গভীরতর পরিবর্তনের দাবির জবাব না দিয়ে সরকার তার নিজস্ব কাজকর্ম ‘ত্বরান্বিত’ করতে চাইবে, এমন এক পথে যা বাস্তব বৈধতা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত এবং যা জনগণের চোখে এক অদ্ভুত ‘ক্যু’ (coup) বলে প্রতিভাত হবে। সরকার এটাকে সময় কাটানোর উপায় হিসেবে দেখতে পারে — কিন্তু বাস্তবে এটি কেবল বৈধতার সংকট ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস আরও গভীর করবে। এটি সেই অনুভূতিকে আরও তীব্র করবে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি সমাজের দাবির প্রতি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা (এবং প্রায়শই সদিচ্ছাও) হারিয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিন্যাস ও কাঠামোর — যা স্মারকচুক্তির যুগে স্পষ্ট রূপ নেয় এবং ২০১৯ সালের পর আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে — সীমাবদ্ধতাগুলি পরিষ্কার। এটা প্রমাণিত যে কাঠামোগতভাবে এই ব্যবস্থা কেবলমাত্র কিছু নির্দিষ্ট পুঁজিবাদী স্বার্থ রক্ষা ছাড়া আর কিছু করতে অক্ষম। এই ব্যবস্থা না পারে সমাজকে অনুপ্রাণিত করতে, না পারে জনগণের সৃজনশীল শক্তিকে উজ্জীবিত করতে। এই ব্যবস্থা বর্তমান সংকটের বলপূর্বক পুনরুৎপাদন ছাড়া ভবিষ্যতের কোনো ভিন্ন দিকনির্দেশনা করতেও অপারগ। এটি আসলে সেই ‘পুরানোর মৃত্যু’ — যার কথা আন্তোনিও গ্রামশি বলেছিলেন।
এর অর্থ হলো, বর্তমান সরকার যতদিন ক্ষমতাকে আঁকড়ে পড়ে থাকবে, যতদিন ‘নতুন ভূমিষ্ট হতে পারবে না’, ততদিন সমাজ-রাজনৈতিক জীবনে, গ্রামশির কথা অনুযায়ী, ‘রুগ্ন পরিস্থিতি’ জারি থাকবে। আসলে, সরকার যে কার্যত তেম্পি দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত করতে অস্বীকার করছে, কিংবা যেভাবে তারা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনসেবা ব্যবস্থার প্রতি এক অদ্ভুত বিদ্বেষ প্রকাশ করছে — এসব আর কীই বা হতে পারে তার বাইরে?
তবে একই সময়ে, যা সমাজ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে, ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করছে, সেটা হল বিপুলসংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাস্তায় নেমে আসা। এটি ন্যায়বিচার ও সত্যের দাবি, গণতান্ত্রিক ‘প্রশ্বাস’ (oxygen)-এর দাবি, এবং এক ভয়হীন জীবনের জন্য আকাঙ্ক্ষা। এখানেই প্রশ্নগুলো কঠিন হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন বিরোধী দল বা বামপন্থীদের (যেভাবেই একে সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন) অবস্থার দিকে তাকানো হয়। সিরিজা (এবং কিছুটা হলেও নিউ লেফট) সমাজের প্রান্তিক ও নিম্নবর্গের বড় অংশের আস্থা হারিয়েছে এবং তারা সরকার পরিচালনার জন্য কার্যকরী বিকল্প কৌশল উপস্থাপন করতে অনেকটাই অক্ষম। পাসোক, নামমাত্র বৃহত্তম বিরোধী দল হলেও, প্রকৃত বিকল্প কোনো পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এমনকি নির্বাচনে অনিশ্চিত ফলাফল এলে নিউ ডেমোক্রেসির সঙ্গে জোট সরকার গঠনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। কমিউনিস্ট পার্টির, যারা গত কয়েক মাসে বিক্ষোভ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, পুঁজিবাদবিরোধী ও একচেটিয়া-মুনাফাবিরোধী কথা বলছে, কাছেও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কার্যকর কৌশল এই মুহূর্তে অনুপস্থিত। র্যাডিকাল বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো আরও বিভক্ত এবং তারা একটি সুসংহত কৌশলগত আলোচনার অভাবে ভুগছে।
রাজনীতি চিরকালই একটি পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া। যদি কেউ পরীক্ষা করতে চায় এই ন্যায়বিচার ও সত্যের দাবিকে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অনুশীলনে পরিণত করা যায় কিনা, তাহলে এই নজিরবিহীন গণআন্দোলন সেই পরীক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। তবে উদ্দেশ্য হতে হবে তার ‘প্রতিনিধিত্ব’ করা নয়, বরং তার কাছ থেকে শেখা।
আর এখানেই শুরু কঠিন অধ্যায়ের। সত্যিকার পরিবর্তন কি কখনোই অত সহজে এসেছে?
লেখকঃ পানাইয়োটিস সটিরিস।
অনুবাদকঃ শৌনক বৈদ্য, পিএইচডি শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লী।
কৃতজ্ঞতাঃ হিস্টোরিক্যাল ম্যাটেরিয়ালিজম ডট ওআরজি।
ইংরেজিতে মূল লেখাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখকবৃন্দ
পানাইয়োটিস সটিরিস (১৯৭০) প্যানথিওন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেছেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন গ্রীক বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক এবং রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি "Crisis, Movement, Strategy: The Greek Experience" (ব্রিল/হিস্টোরিক্যাল ম্যাটিরিয়ালিজম বই সিরিজ, ২০১৮) এর সম্পাদক।
সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের পিএইচডি শিক্ষার্থী।









