বাজারের গূঢ় সত্য: পুঁজিবাদী কাঠামোর সন্ধান

রিচার্ড উলফ

অধ্যাপক উলফ একজন প্রখ্যাত মার্কিন মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসের (অ্যামহার্স্ট) ইমেরিটাস অধ্যাপক। উলফের সাপ্তাহিক শো, "ইকোনমিক আপডেট," ১০০টিরও বেশি রেডিও স্টেশন দ্বারা সম্প্রচারিত এবং ফ্রি স্পিচ টিভির মাধ্যমে ৫৫ মিলিয়ন মানুষের কাছে পৌঁছায়। ডেমোক্র্যাসি অ্যাট ওয়ার্কের সাথে তার তিনটি সাম্প্রতিক বইঃ The Sickness Is the System: When Capitalism Fails to Save Us From Pandemics or Itself, Understanding Marxism, এবং Understanding Socialism।

বাজারব্যবস্থা (Market mechanisms) এবং বাজারভিত্তিক সমাধান (Market solution) —এই শব্দগুলো রাজনীতিবিদ, আমলা, মিডিয়া বিশ্লেষক, এবং একাডেমিকরা এমনভাবে ব্যবহার করতে পছন্দ করেন যেন এগুলো রাজনৈতিক বা মতাদর্শগতভাবে নিরপেক্ষ, পক্ষপাতহীন প্রাকৃতিক কোনো বিষয়। বাস্তবে এই শব্দগুলো মোটেও তা নয়। এই শব্দগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এগুলোই অর্থনৈতিক সমস্যার একমাত্র ন্যায়সংগত এবং সর্বোচ্চ কার্যকর পদ্ধতি। কিন্তু সেটাও সত্য নয়। বাজার মানুষের তৈরি আরো একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র, যা মানব ইতিহাসে বারবার সৃষ্টি এবং পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতোই, যখন কোনো মানবসমাজ বাজারের কার্যক্রম সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে, তখন বাজার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বা ওই বাজার ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের মতো দার্শনিকেরাও তাদের সময়ের বাজারের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং এটিকে নিয়ন্ত্রণ বা বাদ দেয়া নিয়ে বিতর্ক করেছিলেন। তাঁদের পর অনেক সমালোচক এবং বিতার্কিক এসেছেন, যারা বাজারের সমালোচনা করার ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।

বাজার একটি মাধ্যম, যা পণ্য ও পরিষেবাগুলোকে উৎপাদনকারীর কাছে থেকে ভোক্তাদের মধ্যে নিয়ে যায়। যখন কোনো গোষ্ঠী বা সমাজে শ্রম বিভাজন ঘটে, এবং প্রতিটি ব্যক্তি বা পরিবার তাদের প্রয়োজনীয় সব কিছু নিজেরাই উৎপাদন করে না তখনই বাজারের প্রয়োজন পড়ে। বাজার মূলত ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা বিনিময়ের একটি কৌশল, যেখানে পারস্পরিক আদান-প্রদান (quid pro quo) ঘটে। তবে, বাজারের বিকল্প পদ্ধতিও ছিল এবং এখনও আছে। অতীতে, এবং এখনও অনেক সমাজে, বৃদ্ধরা, প্রধানরা, স্থানীয় সরকার, ধর্মীয় নেতারা, বা অন্যান্য সাংস্কৃতিক রীতিনীতির মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিতরণের দায়িত্ব পালন করে। তারা সিদ্ধান্ত নেন, কে কী পরিমাণ পাবে। পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের নিয়ম অনুসারে মা কিংবা বাবা পণ্য বিতরণের ব্যবস্থা করে। অর্থাৎ, সমাজে একেকভাবে, একেক মানুষ বা গোষ্ঠী এর বণ্টন ও নিয়ন্ত্রণ করে।

বাজার প্রক্রিয়া আসলে খুবই সহজ। যাদের কোনো কিছু দরকার, তারা সেই পণ্য বা সেবার মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পণ্য বা সেবার মালিকেরা তাদের মালিকানাধীন পণ্য বা সেবা বিক্রি করার অধিকার পায়, যদি ক্রেতারা (যাদের চাহিদা আছে) কিছু এমন প্রস্তাব করে, যা বিক্রেতা গ্রহণ করতে চায়। দুই পক্ষ — বিক্রেতা এবং ক্রেতা — একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করে এবং ঠিক করে নেয়, একটি পণ্যের কতটুকু পরিমাণ অন্য পণ্যের কতটুকু পরিমাণের সমান হবে। যখন তারা একটি সঠিক বিনিময় মূল্য বা অনুপাত স্থির করতে পারে এবং উভয় পক্ষ সেটি মেনে নেয়, তখন আদান-প্রদান সম্পন্ন হয়। এর ফলে, বাজার সঠিকভাবে কাজ করতে শুরু করে এবং পণ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

বাজারে পণ্য বিতরণের সমস্যা তৈরি হয় যখন বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের পরিকল্পনা মেলে না। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ক্রেতা ১০০ ইউনিট পণ্য কিনতে চায়, কিন্তু বিক্রেতার কাছে মাত্র ৫০ ইউনিট থাকে, তখন বাজার এক বিশেষভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। এটা জানাজানি হয়ে যায় যে ওই পণ্যটির অভাব রয়েছে, অর্থাৎ চাহিদা বেশি, কিন্তু জোগান কম। তখন ক্রেতারা সেই পণ্য পাওয়ার জন্য একে অপরকে হারিয়ে বেশি দাম দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। দাম বাড়ানোর কারণে, যারা বেশি দামে কিনতে পারে না, তারা প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে। এরপর, যারা একটু বেশি দাম দিতে পারে, তারা আবার বাদ পড়ে, কারণ তাদেরও উচ্চ দাম মেটানোর ক্ষমতা কমে যায়।  অবশেষে, ক্রেতাদের সংখ্যা ৫০-এ এসে পৌঁছায় এবং বাজারে “অভাব” দূর হয়ে যায়। তখন পণ্যের দাম এমন একটা পর্যায়ে চলে যায় যেখানে চাহিদা আর জোগান একে অপরের সমান হয়। আবার যদি কোনো পণ্যের চাহিদা জোগানের চেয়ে কম হয়, তবে ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটে।

অতএব, বাজার এমন পণ্য বিতরণ করে, যেগুলোর চাহিদা বেশি, কিন্তু জোগান কম। তবে এই পণ্য বিতরণের পদ্ধতি ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। ধনীরা বেশি সুবিধা পায়, কিন্তু গরীবরা এতে বঞ্চিত হয়। বাজার কখনোই ধনী এবং গরীবের মধ্যে সংঘাত থেকে নিরপেক্ষ থাকে না। এক্ষেত্রে, বিক্রেতা দাম বাড়ানোর পরিবর্তে আরও পণ্য উৎপাদন বা অর্ডার করতে পারতেন। কিন্তু মুক্তবাজার ব্যবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে খুব অল্প মানুষের হাতে, যারা জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ। তারা ঠিক করে যে, পণ্যের অভাবের কারণে দাম বাড়াবে (যা মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করে) নাকি উৎপাদন বাড়াবে। এই সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করে, যাতে তারা বেশি মুনাফা করতে পারে। আমরা, সাধারণ মানুষ, তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করি। বর্তমানে, অনেকেই মনে করেন যে, এই মানুষগুলো মুদ্রাস্ফীতি থেকে বেশি লাভ পাচ্ছে।

বাজার ব্যবস্থার পক্ষপাতীরা মনে করেন, যখন কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন সেটা আসলে উৎপাদকদের জন্য একটা “সংকেত”। এই সংকেত তাদের বলে, বাজারে এই পণ্যের চাহিদা বেশি, তাই আরও বেশি উৎপাদন করলে লাভবান হওয়া যাবে। তাদের মতে, দাম বাড়ার কারণে উৎপাদকরা উদ্বুদ্ধ হয় এবং বাজারে সরবরাহ বাড়ায়, যা শেষ পর্যন্ত দামের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টা এত সরল নয়। ব্যবসায়ীরা খুব ভালো করেই জানে যে যদি তারা দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, তাহলে বাজারে বেশি পণ্য আসবে। এর ফলে দাম কমে যেতে শুরু করবে এবং তাদের লাভও কমে যাবে। এই আশঙ্কা থেকেই অনেক সময় তারা তাড়াহুড়ো করে উৎপাদন বাড়াতে চায় না। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রায়ই দেরি করে পদক্ষেপ নেয়। এদিকে, যখন বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়ে, তখন অন্য বিক্রেতারাও সুযোগ নিতে শুরু করে। তারা নিজেদের পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্য “উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে”—এই ধরনের যুক্তি দেখায়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি অতিরঞ্জিত বা অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমরা সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত দেখি, ব্যবসায়ীরা একে অপরের অজুহাতকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মুনাফা বাড়িয়ে নেয়। এর ফলে বাজারে একের পর এক পণ্যের দাম বেড়ে চলে এবং আমাদের ওপর মুদ্রাস্ফীতির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, কিন্তু ব্যবসায়ীদের মুনাফা বৃদ্ধি পায়। ফলে, বাজার ব্যবস্থার এই “সংকেত” মূলত সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, আর ব্যবসায়ীরা এই সংকেতের সুবিধা নিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে।

 

পুঁজিপতিরা অনেক আগেই বুঝে গেছে যে, জোগান ও চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে “অভাব” সৃষ্টি করে বা ধরে রেখে পণ্যের দাম বাড়ানো যায় এবং তাতে মুনাফা বাড়ে। তাই তারা কৌশল হিসেবে চাহিদা বাড়ানোর জন্য বিজ্ঞাপন শিল্পের মতো মাধ্যম তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে আরও বেশি চাহিদা সৃষ্টি করা হয়। একইসঙ্গে, প্রতিটি শিল্পখাত জোগান সীমিত রাখতে নানা উপায়ে সংগঠিত হয়—যেমন উৎপাদকদের মধ্যে গোপন সমঝোতা, অলিগোপলি (হাতেগোণা কতিপয়ের নিয়ন্ত্রণ), মনোপলি (একক নিয়ন্ত্রণ), কার্টেল (যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ) ইত্যাদির মাধ্যমে। তবে, সবকিছুই পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিছু সামাজিক পরিবর্তন বা পরিস্থিতি তাদের পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করে। তখন তারা বাধ্য হয় নতুন কৌশল নিয়ে চাহিদা ও জোগানের এই কৃত্রিম ভারসাম্য বজায় রাখতে। বাস্তবে, বাজার আসলে এমন একটি ব্যবস্থা, যা পুঁজিপতিদের মুনাফা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আদর্শের দিক থেকে বাজারকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন এটি সবার জন্য “সেরা সমাধান” এবং “সর্বোচ্চ দক্ষতার” প্রতীক। পুঁজিপতিরা এই প্রচারণার মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চায়, যদিও এর আসল লক্ষ্য মুনাফা অর্জন।

আধুনিক পুঁজিবাদে শ্রমবাজারও বাজার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। চাকরি খোঁজা, পাওয়া এবং চাকরির প্রস্তাব গ্রহণ—সবকিছুই চাহিদা ও জোগানের উপর নির্ভর করে। যদি চাকরির সুযোগের তুলনায় কাজের খোঁজে থাকা মানুষের সংখ্যা বেশি হয়, তাহলে নিয়োগকর্তারা সহজেই মজুরি কমিয়ে দিতে পারে। কারণ তারা জানে, কর্মহীন মানুষ প্রায়ই কম মজুরিতেও কাজ করতে বাধ্য হবে, যেহেতু বেকার থাকার বিকল্পটা তাদের জন্য আরও কঠিন। এই পরিস্থিতি একসময় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য আন্দোলন শুরু করে এবং আইনগতভাবে তা কার্যকর করতে সক্ষম হয়। তবে, নিয়োগকর্তারা বরাবরই ন্যূনতম মজুরি আইনগুলোর বিরুদ্ধে ছিল। যখন এই আইন কার্যকর হয়, তখনও তারা মজুরি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যায় এবং প্রায়শই এই প্রতিরোধ সফলও হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ ফেডারেল ন্যূনতম মজুরি ২০০৯ সালে প্রতি ঘণ্টায় $৭.২৫ করা হয়েছিল। এর পর থেকে অনেক বছর ধরে এই মজুরি অপরিবর্তিত রয়েছে। একই সময়ে, নিয়োগকর্তারা নানান কৌশল ব্যবহার করে মজুরি বৃদ্ধি ঠেকানোর চেষ্টা করে। যেমন—স্বয়ংক্রিয়করণ বা মেশিনের মাধ্যমে মানুষের কাজ প্রতিস্থাপন, বিদেশে সস্তা শ্রমের সুবিধায় কাজ স্থানান্তর, কিংবা কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ। এই কৌশলগুলোর উদ্দেশ্য হলো শ্রমবাজারে কৃত্রিমভাবে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বদলে ফেলা, যাতে মজুরি বাড়ানো ধীর বা বন্ধ রাখা যায়। নিয়োগকর্তারা শ্রমবাজারকে ঠিক পণ্যের বাজারের মতো নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে তাদের মূল লক্ষ্য সবসময়ই মুনাফা বৃদ্ধি। শ্রমিকদের জন্য এটি একটি অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে তাদের চাহিদা ন্যায্য হলেও নিয়োগকর্তার ক্ষমতার সামনে প্রায়ই চাপা পড়ে।

ঋণের বাজারও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে ঋণদাতা এবং ঋণগ্রহীতা একটি চুক্তিতে আসে, যেখানে তারা নির্ধারণ করে কী সুদের হারে ঋণ দেওয়া বা নেওয়া হবে। এই চুক্তি নির্ভর করে বাজারের চাহিদা ও জোগানের ওপর। বর্তমানে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটছে। তাদের লক্ষ্য হলো অর্থনীতির চাহিদা কমিয়ে মুদ্রাস্ফীতি ধীর করা। তবে এর একটি বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। সুদের হার বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো সব ধরনের ঋণের খরচও বেড়ে যাওয়া—যেমন গৃহঋণ (মর্গেজ), গাড়ি ঋণ, ক্রেডিট কার্ডের ঋণ ইত্যাদি। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি। দরিদ্র মানুষ, যারা এমনিতেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত, তাদের জন্য এই উচ্চ সুদের হার আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের অনেক সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোর জন্য ঋণ নিতে হয়, কিন্তু সুদের হার বাড়ায় সেই ঋণ শোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত শ্রেণিও বাড়ি বা গাড়ি কেনার মতো বড় খরচের জন্য ঋণ নেওয়ার সময় উচ্চ সুদের চাপে পড়ে। অন্যদিকে, ধনী ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হয়। তাদের জীবনের মান বজায় রাখতে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কম, এবং তারা অনেক ক্ষেত্রেই ঋণদাতার ভূমিকায় থাকে। ফলে, উচ্চ সুদের হার তাদের জন্য লাভজনক হয়, কারণ তারা ঋণের মাধ্যমে আরও বেশি সুদ পায়। এইভাবে, ঋণের বাজারেও দেখা যায়, ধনীরা উচ্চ সুদের হার থেকে উপকৃত হয়, যেখানে দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি আরও বেশি চাপের মুখে পড়ে। এটি অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তোলে এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ফাঁক আরও বাড়িয়ে দেয়।

১৯৭১ সালে, প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মজুরি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি একটি সময়ের জন্য বাজারকে দাম নির্ধারণ বা প্রভাবিত করতে বাধা দিয়েছিলেন। এর ফলে সাময়িকভাবে হলেও মুদ্রাস্ফীতি কমে এসেছিল এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কিছুটা লাঘব হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে, ফেড প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে নিক্সনের এই পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি করতে চাপ দিতে পারত, যা দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য উপকারী হতো। যদি এই ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা আবারও আরোপ করা হয়, তাহলে বাজারের মাধ্যমে পরিচালিত দামের অস্থিরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারত। মজুরি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরা বাজারের চাপ থেকে কিছুটা রেহাই পেত, যা উচ্চ সুদের হার এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপে তাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন একটি উদ্যোগ হতে পারত, যা ধনী শ্রেণির পরিবর্তে দরিদ্র এবং মধ্যবিত্তদের রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখত।

তবে, বাইডেন প্রশাসন থেকে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম মনে হয়। যদিও প্রশাসন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, কিন্তু মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিউলিবারেল অর্থনৈতিক নীতি এবং বাজারের প্রতি অন্ধবিশ্বাস এখনো প্রভাবশালী। সিনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস উভয় ক্ষেত্রেই এই চিন্তাধারা গভীরভাবে প্রোথিত। ফলস্বরূপ, প্রশাসন ও কংগ্রেস উভয়ই বাজারের “স্বাভাবিক কার্যক্রম” বাধাগ্রস্ত করার মতো পদক্ষেপ নিতে ইতস্তত বোধ করতে পারে। এটি স্পষ্ট করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক নীতি এখনও মূলত পুঁজিপতি এবং ধনী শ্রেণির স্বার্থের দিকে ঝুঁকে থাকে, যেখানে দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমস্যাগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তা শ্রেণি প্রায়ই বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থগিত করে বা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানান্তরিত করে। যখন বাজারের মাধ্যমে লাভজনকতা বজায় রাখা খুব ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তখন পুঁজিপতিরা নতুন কৌশল গ্রহণ করে। তারা প্রায়ই একে অপরের সাথে একীভূত হয় (মার্জার) বা ছোট উদ্যোগগুলো অধিগ্রহণ করে (অ্যাকুইজিশন)। এর ফলে তাদের মধ্যে স্বাধীন বাজার প্রতিযোগিতার সম্পর্ক বিলুপ্ত হয় এবং বাহ্যিক বাজার সম্পর্কগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। এর পরিবর্তে, তাদের কার্যক্রম অভ্যন্তরীণভাবে পরিচালিত হয়। একীভূত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সরাসরি পরিকল্পিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এখানে পণ্য ও সেবার বিতরণ বাজারের মাধ্যমে আদান-প্রদানের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। এটি একটি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার মতো কাজ করে, যেখানে বাজার সম্পর্ক প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়া দেখায় যে, বাজারব্যবস্থা পুঁজিপতিদের জন্য শুধু একটি হাতিয়ার। যখন বাজার তাদের জন্য আর লাভজনক থাকে না, তখন তারা এটিকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প উপায় গ্রহণ করে। এটি বাজারের তথাকথিত “স্বাধীনতা” এবং “অদৃশ্য হাতের” ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। পুঁজিপতিরা প্রয়োজন অনুযায়ী বাজারকে পরিবর্তন করে বা অকার্যকর করে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বাজারের “ন্যায্যতা” ধারণাকে আরও অস্পষ্ট করে তোলে।

বাজার পুঁজিবাদের জন্মের আগে থেকেই ছিল, কিন্তু পুঁজিবাদ বাজারকে এমন একটি রূপ দিয়েছে যা তাকে সর্বব্যাপী এবং প্রায় সর্বজনীন করে তুলেছে। কার্ল মার্কসের ভাষায়, পুঁজিবাদ বাজার ও তার দামের প্রতি একধরনের “উচ্চতম মর্যাদা” দিয়েছে এবং তাকে আদর্শগত গুরুত্ব দিয়েছে। এই মূল্যায়ন প্রায়ই এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে তা হাস্যকর বলে মনে হয়।

R.H. Tawney তার Religion and the Rise of Capitalism বইয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন যে, ইউরোপের প্রাথমিক পুঁজিবাদকে “ন্যায্য মূল্য” ধারণা থেকে মুক্তি পেতে কতটা সংগ্রাম করতে হয়েছিল। এই ধারণাটি মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক চার্চ থেকে উদ্ভূত, যেখানে “ন্যায্য মূল্য” ঈশ্বরের আইন এবং খ্রিস্টের শিক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। এটি বাজারের “বাজারমূল্য” থেকে আলাদা ছিল, যা চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ওঠানামা করত।

পুঁজিবাদের প্রবক্তারা বুঝতে পেরেছিলেন, যদি তারা বাজারের মূল্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে তাদের চার্চের ন্যায্য মূল্যের ধারণাকে প্রতিস্থাপন করতে হবে। এই লক্ষ্যে, তারা বাজার এবং তার দামের ধারণাকে ঘিরে একধরনের “সেকুলার ধর্ম” তৈরি করেছিল। তারা বাজারকে দক্ষতা, ন্যায়বিচার এবং ভারসাম্যের মতো ঈশ্বরীয় গুণাবলীর সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করল। এর ফলে বাজার একটি অবাস্তব কিন্তু শক্তিশালী আদর্শে পরিণত হয়, যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে।

কিন্তু আজকের দিনে, পুঁজিবাদ যখন ক্রমাগত সংকটে পড়ছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে, তখন এই বাজারকেন্দ্রিক মিথগুলোর প্রতি প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। পুঁজিবাদের এই “মিথ্যা দেবতা”দের উচ্ছেদ করার সময় এসেছে। এখন আমাদের দরকার এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা যা শুধু ধনী শ্রেণির মুনাফার জন্য কাজ করবে না, বরং সবার জন্য একটি ন্যায্য, মানবিক, এবং কার্যকর সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমেই আমরা একটি সত্যিকার অর্থে ভালো এবং ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।

অনুবাদঃ তাওহীদুর রহমান।
কৃতজ্ঞতাঃ মিডওয়েস্টার্ন মার্ক্স। 

লেখকবৃন্দ

অধ্যাপক উলফ একজন প্রখ্যাত মার্কিন মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসের (অ্যামহার্স্ট) ইমেরিটাস অধ্যাপক। উলফের সাপ্তাহিক শো, "ইকোনমিক আপডেট," ১০০টিরও বেশি রেডিও স্টেশন দ্বারা সম্প্রচারিত এবং ফ্রি স্পিচ টিভির মাধ্যমে ৫৫ মিলিয়ন মানুষের কাছে পৌঁছায়। ডেমোক্র্যাসি অ্যাট ওয়ার্কের সাথে তার তিনটি সাম্প্রতিক বইঃ The Sickness Is the System: When Capitalism Fails to...

সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ছেন। ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন, জগৎ দেখার ইচ্ছা আছে।

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন

Scroll to Top