Sustainability বা টেইসইতা একটি বহুমাত্রিক ধারণা। এর মধ্যে রয়েছে টেইসইতার পরিবেশগত, প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী জন বেলেমি ফস্টারের মতে, টেকসইতা হলো এমন একটি চর্চা, যেখানে মানুষ সচেতনভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে জীবনযাপন করে। এর অর্থ হলো, আমাদের দৈনন্দিন কাজ এবং ব্যবহার এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে তা প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট না করে। এই চর্চার মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান সময়ের চাহিদা পূরণ করা, কিন্তু এমনভাবে যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সহজে পেতে পারে।
টেকসইতা হলো এমন একটি চর্চা, যেখানে মানুষ সচেতনভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে জীবনযাপন করে। এর অর্থ হলো, আমাদের দৈনন্দিন কাজ এবং ব্যবহার এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে তা প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট না করে। এই চর্চার মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান সময়ের চাহিদা পূরণ করা, কিন্তু এমনভাবে যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সহজে পেতে পারে।
জন ফস্টার
ফস্টারের ধারণা অনুযায়ী, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রকৃতির নিয়ম-নীতির সঙ্গে আমাদের কর্মকাণ্ডকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের পরিবেশ থেকে যতটা সম্পদ নিই—যেমন গাছ কাটা, পানি ব্যবহার বা মাটি চাষ—তা এমন পরিমাণে নেওয়া উচিত যাতে প্রকৃতি এগুলোকে পুনরায় তৈরি বা পূরণ করতে পারে। যদি আমরা অযথা সম্পদ নষ্ট করি, তাহলে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক এই সম্পদগুলো ফুরিয়ে যাবে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর সেগুলো ব্যবহার করতে পারবে না।
সহজভাবে বলতে গেলে, পরিবেশগত টেকসইতা (Environmental Sustainability) তখনই সম্ভব, যখন আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ—যেমন বন, পানি, মাটি—এই সম্পদগুলোর উৎপাদনশীলতা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে। অর্থাৎ, আমরা যদি এখন এমনভাবে কাজ করি যাতে প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা সম্ভব হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মও এই সম্পদগুলো ব্যবহার করে জীবনধারণ করতে পারবে।
অর্থনৈতিক টেকসইতা (Economic Sustainability) হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ব্যয়ের মাত্রা বা খরচ দীর্ঘ সময় ধরে টেকানো যায়। অর্থাৎ, অর্থনীতিতে এমন ভারসাম্য থাকতে হবে যাতে সরকার, প্রতিষ্ঠান, এবং ব্যক্তি পর্যায়ে আয়-ব্যয় ঠিকভাবে পরিচালিত হয়। যদি কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অল্প কিছুদিন ভালো চলে, কিন্তু পরে ভেঙে পড়ে, তাহলে সেটি টেকসই নয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি দেশ এমনভাবে ঋণ নেয় যা পরবর্তীতে শোধ করা সম্ভব হয় না, তাহলে সেই অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ভেঙে পড়বে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে হলো এমনভাবে ব্যয় করা যাতে ভবিষ্যতেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
সামাজিক টেকসইতা (Social Sustainability) হলো এমন এক অবস্থা, যেখানে সমাজে সব মানুষ ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা পায় এবং সামাজিক বৈষম্য কমে আসে। অর্থাৎ, সবাই যেন সমান সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, এবং জীবিকা অর্জনের পথ পায়। যদি কিছু মানুষ খুব ধনী হয় এবং বাকি সবাই দারিদ্র্যে ভোগে, তাহলে সেই সমাজ টেকসই হতে পারে না। টেকসই সমাজ গড়তে হলে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমাতে হবে এবং সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক টেকসইতা (Institutional Sustainability) বলতে বোঝায় প্রতিষ্ঠানের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা যদি অল্প সময়ের জন্য ভালো কাজ করে কিন্তু কিছুদিন পর অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি টেকসই নয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা যদি সঠিক পরিকল্পনা এবং পরিচালনা না করে, তাহলে তা ভবিষ্যতে ব্যর্থ হবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এমন কাঠামো তৈরি করতে হবে যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত প্রয়োজন মেটাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকে।
ফস্টার বলেছেন যে, টেকসইতা (Sustainability) শুধু কোনো প্রযুক্তিগত লক্ষ্য নয়, বরং এটি শিক্ষার, সংস্কৃতির এবং ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি মানসিকতা। এর মানে হলো, টেকসই উন্নয়ন আমাদের চিন্তাভাবনা ও জীবনযাপনের পদ্ধতির পরিবর্তন এনে প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে চলার শিক্ষা দেয়।
টেকসই উন্নয়নের দুটি মূল ধারণা রয়েছে। প্রথমটি হলো অপারেশনাল বা কার্যগত টেকসইতা (Operational Sustainability)। এটি বোঝায়, আমরা যেন আমাদের কাজকর্মের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিই। মানুষকে এমনভাবে জীবনযাপন করতে হবে যাতে তারা পৃথিবীর “ধারণ ক্ষমতার” মধ্যে থাকে—অর্থাৎ, যতটা সম্পদ ব্যবহার করা হয়, তা প্রকৃতি আবার পুনরায় উৎপাদন করতে পারে। অপারেশনাল টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দূষণ কমাতে হবে এবং সম্পদ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে পরিবেশ বিপর্যয় এড়ানো যায়।
তবে ফস্টার গভীর টেকসইতা (Deep Sustainability) নামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তুলে ধরেন। এটি আরও গভীর এবং মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়। এই ধারণা বলে যে, টেকসই উন্নয়ন শুধু নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য নয়, বরং আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজে প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে চলার অভ্যাস গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। এজন্য ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সচেতনতা, চিন্তাভাবনা এবং নতুন জিনিস শেখার আগ্রহ তৈরি হওয়া দরকার।
ফস্টারের মতে, টেকসই উন্নয়ন কেবল কিছু পরিবেশ নীতি মেনে চলার মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য এমন শিক্ষার প্রয়োজন যা মানুষকে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা করতে, নতুন ধারণা তৈরি করতে এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত টেকসই উন্নয়নকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে না দেখে, একে একটি চলমান আলোচনা এবং অনুসন্ধানের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা। শিক্ষা মানুষকে তার মূল্যবোধ এবং কাজের ধরন নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে, যা টেকসই উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ সম্পর্কে আরো জানতে পড়তে পারেন-
Education as Sustainability, John Foster (2001)
লেখক










