সিআইএ ও ফ্রাঙ্কফুট স্কুলের এ্যান্টি-কমিউনিজম: গ্লোবাল থিওরি ইন্ডাস্ট্রির শিকড়ে

এই প্রবন্ধটি গ্যাব্রিয়েল রকহিলের "সিআইএ ও ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের এ্যান্টি-কমিউনিজম" শিরোনামের সাতটি অংশের প্রথম পর্ব। এখানে তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের প্রথম প্রজন্মের দুই প্রধান চিন্তাবিদ থিওডর আদর্নো ও ম্যাক্স হর্কহাইমারের কার্যক্রম এবং তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেছেন। রকহিল দাবি করেছেন যে, আদর্নো ও হর্কহাইমার পশ্চিমা বিশ্বের অ্যান্টি-কমিউনিস্ট প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন

গ্যাব্রিয়েল রকহিল

গ্যাব্রিয়েল রকহিল (জন্ম ১৯৭২) একজন আমেরিকান দার্শনিক, লেখক, এবং সাংস্কৃতিক সমালোচক। তিনি ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক এবং ক্রিটিকাল থিওরি ওয়ার্কশপ/আতেলিয়ার দে থিওরি ক্রিটিক-এর পরিচালক। এছাড়াও তিনি পূর্বে কলেজ ইন্টারন্যাশনাল দে ফিলোজফি-তে প্রোগ্রামের পরিচালক ছিলেন। রকহিল ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে তার কাজের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি কাউন্টারপাঞ্চ, ব্ল্যাক এজেন্ডা রিপোর্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস, লিবারেশন, এবং লস অ্যাঞ্জেলেস রিভিউ অফ বুকস-এর মতো বিভিন্ন প্রকাশনায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। তিনি আইওয়ার গ্রিনেল কলেজ থেকে স্নাতক এবং প্যারিসের সোশ্যাল সায়েন্সের অ্যাডভান্সড স্টাডিজ স্কুল থেকে জ্যাক দেরিদা ও লুস ইরিগারির অধীনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে, তিনি আলাঁ বাদিউর অধীনে প্যারিস ৮ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং এছাড়াও এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে আরেকটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। রকহিলের কাজ রাজনৈতিক এবং নন্দনতত্ত্বের সম্পর্ককে পুনর্বিবেচনা করে, যেখানে তিনি ইতিহাসের বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিল্প ও রাজনীতিকে সামাজিক অনুশীলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

ফরাসি তত্ত্বের পাশাপাশি ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের সমালোচনামূলক তত্ত্ব—বিশ্বব্যাপী থিওরি ইন্ডাস্ট্রিতে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই দুই তত্ত্ব একসঙ্গে পোষ্টকলোনিয়াল ও ডিকলোনিয়াল তত্ত্ব, কুইয়ার তত্ত্ব, আফ্রো-পেসিমিজম এবং আরও অনেক সমালোচনামূলক তত্ত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যা বর্তমানে পুঁজিবাদী বিশ্বের একাডেমিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে। তাই, ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমা বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।

সামাজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রথম প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে থিওডর আদর্নো ও ম্যাক্স হর্কহাইমার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই প্রবন্ধে তাদেরকেই প্রধানভাবে আলোচনা করা হবে। তারা পশ্চিমা বা সাংস্কৃতিক মার্কসবাদের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ। যারা জার্গেন হাবারমাসের নেতৃত্বে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ থেকে সরে আসার বিষয়টি জানেন, তাদের জন্য এই প্রথম দিকের কাজগুলো সমালোচনামূলক তত্ত্বের এক সোনালী যুগ বলে মনে হয়। সেই সময়ে এই তত্ত্ব, যদিও কিছুটা নিষ্ক্রিয় বা হতাশাবাদী ছিল, তবু কোনো না কোনোভাবে র‍্যাডিকাল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। যদি এই ধারণায় কিছু সত্য থাকে, তবে তা কেবল তখনই, যখন প্রথম দিকের ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলকে পরবর্তী প্রজন্মের সাথে তুলনা করা হয়। কারণ, পরবর্তী প্রজন্ম সমালোচনামূলক তত্ত্বকে র‍্যাডিকাল উদারনৈতিক বা সরাসরি উদারনৈতিক মতবাদে রূপান্তর করেছে। তবে, এই তুলনা আসলে অনেক নিচু মানের, এবং এর মাধ্যমে রাজনীতিকে শুধু একাডেমিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ করা হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের প্রথম প্রজন্ম বিংশ শতাব্দীর বড় বড় শ্রেণি সংগ্রামের সময় বেঁচে ছিল, যখন কমিউনিজমের মানে আর গুরুত্ব নিয়ে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বযুদ্ধ চলছিল।

ইতিহাস বা পশ্চিমা একাডেমির সংকীর্ণ চিন্তার শিকার হওয়া এড়াতে, সামাজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের কাজকে আন্তর্জাতিক শ্রেণি সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে নতুন করে বোঝা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণি, তাদের সরকার এবং পুঁজিবাদী মতাদর্শধারীরা বামপন্থাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার মরিয়া চেষ্টা। সিআইএ এজেন্ট থমাস ব্রাডেনের ভাষায়, তারা বামপন্থাকে “সঙ্গতিপূর্ণ” অর্থাৎ অ-কমিউনিস্ট বামপন্থা হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। ব্রাডেন এবং অন্যরা বিস্তারিতভাবে বুঝিয়েছেন, এই সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ফাউন্ডেশনের টাকা ও সিআইএ-সংশ্লিষ্ট সংগঠন, যেমন কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডম (CCF), ব্যবহার করে অ্যান্টি-কমিউনিজম প্রচার করা। এতে বামপন্থীদের আসল সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্রলুব্ধ করা হতো।

হর্কহাইমার হামবুর্গে CCF আয়োজিত অন্তত একবারের ভ্রমণে যোগ দিয়েছিলেন। আদর্নো সিআইএ-অর্থায়িত পত্রিকা ডের মোনাত-এ লেখালেখি করতেন, যা ইউরোপের অন্যতম বড় পত্রিকা ছিল। তার লেখা আরও দুইটি সিআইএ-সমর্থিত ম্যাগাজিন এনকাউন্টার এবং টেম্পো প্রেজেন্তে-তেও ছাপা হয়েছিল। তিনি সিআইএ এজেন্ট মেলভিন লাস্কির সাথে তার বাড়িতে দেখা করেছিলেন, যিনি জার্মানির অ্যান্টি-কমিউনিস্ট প্রচারের শীর্ষ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। আদর্নো তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও কাজ করতেন। ডের মোনাত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক মেলভিন লাস্কি, যিনি সিআইএ-এর CCF-এর পরিচালনা কমিটির সদস্যও ছিলেন, আদর্নোকে বলেছিলেন যে তিনি সামাজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের যেকোনো কাজের জন্য সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এর মধ্যে তাদের লেখা দ্রুত প্রকাশ করা সহ অন্য যেকোনো ঘোষণা ছাপানোর প্রস্তাবও ছিল। আদর্নো তার প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং ১৯৪৯ সালে হর্কহাইমারের ইক্লিপস অব রিজন সহ চারটি অপ্রকাশিত লেখা তাকে পাঠান।

হর্কহাইমারের দীর্ঘদিনের সহযোগী আদর্নো পশ্চিম জার্মানিতে CCF নেটওয়ার্কের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তার নাম ১৯৫৮/৫৯ সালের একটি নথিতে পাওয়া যায়, যেখানে সারা জার্মানির জন্য একটি CCF কমিটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আরও মজার ব্যাপার হলো, ১৯৬৬ সালে জানা যায় যে এই আন্তর্জাতিক সংগঠনটি আসলে সিআইএ-এর একটি মুখোশ, তবুও আদর্নো CCF-এর প্যারিস অফিসের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হয়েছিলেন। কারণ, মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন জার্মানির অংশে সব আগের মতোই চলছিল। এটি শুধু শুরু, আর এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ আদর্নো ও হর্কহাইমার অ্যান্টি-কমিউনিস্ট বামপন্থার অভিজাত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন

Scroll to Top