অর্থনীতিতে নোবেল বলে কোনো নোবেল পুরস্কারই নেই। ১৯০১ সালে প্রথমবারের নোবেল পুরস্কার মতো চালু হওয়ার সময় অর্থনীতি ক্যাটাগরি এর মধ্যে ছিল না। অর্থনীতিতে পুরস্কারটি চালু হয় অনেক পরে। নোবেল কমিটি নয়, বরং ১৯৬৯ সালে, যা সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Sveriges Riksbank) অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তন করে। এটি মূল পুরস্কার ঘোষণার ৬৮ বছর পর চালু করা হয়।
প্রতি বছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় বলে জানা যায় তার মধ্যে
অর্থনীতিও রয়েছে। এই পুরস্কার প্রতি বছরই উচ্ছ্বাস ও আলোচনার ঝড় তোলে। তবে,
সাহিত্য বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের
বাইরে, অর্থনীতি হলো একমাত্র সামাজিক বিজ্ঞান যে বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
এমনকি যারা মূলধারার অর্থনীতি নিয়ে সমালোচক হিসেবে পরিচিত তারাও এই পুরস্কারের
প্রচারে বেশ প্রভাবিত হন। তবে এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা আছে। অনেক সমালোচকদে মতে নোবেল পুরস্কার
প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ, নারী, এবং পুঁজিবাদের সমালোচনাকারী অর্থনীতিবিদদের প্রায়
সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়। এই কারণে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে নতুন করে
ভাবা এবং এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
প্রথমত, অর্থনীতিতে নোবেল বলে কোনো নোবেল পুরস্কারই নেই। ১৯০১ সালে প্রথমবারের নোবেল
পুরস্কার মতো চালু হওয়ার সময় অর্থনীতি ক্যাটাগরি এর মধ্যে ছিল না। অর্থনীতিতে
পুরস্কারটি চালু হয় অনেক পরে। নোবেল কমিটি নয়, বরং ১৯৬৯ সালে, যা সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Sveriges
Riksbank) অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের
প্রবর্তন করে। এটি মূল পুরস্কার ঘোষণার ৬৮ বছর পর চালু করা হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
বিষয় হলো, নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটেও এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে যে,
অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে পুরস্কারটি
একটি নোবেল পুরস্কার নয় (NobelPrize.org, 2018)।
অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বলতে আমরা যা বুঝি তার আলাদা একটি নামও রয়েছে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই পুরস্কারটিকে বলা হয় “Sveriges Riksbank
Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel”। প্রথমদিকে নোবেল কমিটির সদস্যরা,
এমনকি আলফ্রেড নোবেলের পরিবারের
সদস্যরাও, সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া এই পুরস্কারকে নোবেল পুরস্কারের অংশ হিসেবে
স্বীকৃতি দেওয়ার বিপক্ষে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন (Offer
& Söderberg, 2016)।
আলফ্রেড নোবেলের প্রপৌত্র পিটার নোবেল একবার বলেছিলেন,
“নোবেল এমন মানুষদের অপছন্দ
করতেন, যারা সমাজের কল্যাণের চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিত। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে
তিনি কখনো এই ধরনের পুরস্কারকে সমর্থন করতেন।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে,
অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার
চালুর ব্যাপারটি ছিল “অর্থনীতিবিদদের দ্বারা তাদের (সুইস সেন্ট্রাল ব্যাংক) সুনাম
বাড়ানোর একটি পিআর স্টান্ট” (The Local – Nobel Descendant
Slams Economics Prize, 2005)।
সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রবর্তিত ‘অর্থনীতিতে নোবেল’ পুরস্কার নামে
প্রচারিত এই পুরস্কার মূলত নব্য উদারনৈতিক ধারণাগুলিকে,
বিশেষ করে মুক্ত বাজার
অর্থনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমর্থন ও প্রতিষ্ঠা করার একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ
করেছে (Offer & Söderberg, 2016)। এই পুরস্কারের সঙ্গে কুখ্যাত
মন্ট পেরলিন সোসাইটির সদস্যদের জড়িত থাকার বিষয়টিও সুপরিচিত (Mirowski,
2020)। উল্লেখ্য যে, মন্ট পেরলিন সোসাইটির আটজন সদস্য এখন পর্যন্ত এই পুরস্কার
লাভ করেছেন। এরা হলেন, —ফ্রিডরিখ হায়েক, মিল্টন ফ্রিডম্যান, জর্জ স্টিগলার, মোরিস আলেইস, জেমস এম. বুকানন, রোনাল্ড কোস, গ্যারি বেকার এবং ভার্নন স্মিথ।
অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের মতোই (যেমন রাষ্ট্রবিজ্ঞান,
সমাজতত্ত্ব,
দর্শন ও নৃতত্ত্ব) অর্থনীতিও
নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ মতবাদ ও পদ্ধতিতে পুঁজিবাদের কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করে। এই
বৈচিত্র্যময় মতবাদ ও পদ্ধতিগুলোকে সাধারণভাবে শুধু ‘অর্থনীতি’ বলা হয়। কিন্তু গত
৬৮ বছরে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার থাকলেও, রাজনৈতিক অর্থনীতির মার্কসীয় ধারায় তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক
গবেষণা করা কোনো অর্থনীতিবিদ এই পুরস্কার পাননি। পল মার্লর সুইজি,
মোরিস ডব,
সামির আমিন,
অস্কার ল্যাংগে,
জোসেফ স্টেইন্ডল,
মিখাইল ক্যালেকি,
জন রোমার,
আনোয়ার শেখ,
প্রভাত পটনায়েক এবং আরও অনেক
প্রভাব বিস্তারকারী অর্থনীতিবিদেরা এই পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সবচেয়ে
যোগ্যতম পোস্ট-কেইনসিয়ান অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসন-ও নোবেল পাননি,
যা অবশ্য আশ্চর্যের কিছুই নয়।
অন্যদিকে, নোবেল কমিটি উদারভাবে মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কাহনেম্যান,
গণিতবিদ লয়েড শ্যাপলি এবং
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হার্বার্ট এ. সাইমনের মতো অর্থনীতির বাইরের গবেষকদের পুরস্কৃত
করেছে। এই ধরনের বর্জনমূলক আচরণ থেকে বোঝা যায়, নির্বাচক কমিটির মতাদর্শগত পক্ষপাত কতটা গভীরে প্রোথিত,
এবং তারা কিভাবে পুঁজিবাদবিরোধী
যে কোনো জ্ঞান বা চিন্তাধারাকে সেন্সর করার প্রবণতা পোষণ করে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে এমন নীতিগতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট পুরস্কার শুধু পুঁজিবাদপন্থী
মতবাদকে সমর্থন করা অর্থনীতিবিদদেরই স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে নোবেল পুরস্কার
পুঁজিবাদবিরোধী সব ধারা ও চিন্তাভাবনাকে প্রান্তিক করে তুলেছে,
যা অর্থনীতির বৈচিত্র্য ও
সমালোচনামূলক চিন্তাধারার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ছদ্ম-নোবেল পুরস্কার কিছু নির্দিষ্ট মতবাদের ব্যক্তিকে অর্থনীতির
‘মুখপাত্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় যেখানে আদর্শভাবে কোনো এমনটা হওয়ার কথা না (Offer
& Söderberg, 2016)। মূলত কেবল নব্য-ধ্রুপদী (Neo-classical) ধারার অর্থনীতিবিদদের এই পুরস্কার দেওয়ার ফলে অর্থনীতির
ভেতরে বৈচিত্র্য কমে যায় এবং কিছু ব্যক্তিকে ইচ্ছেমতো পুরো অর্থনীতি বিষয়টিরই
মুখপাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ,
গণমাধ্যম,
শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং
নীতিনির্ধারকরা পুরস্কার বিজয়ীদের মতামত ও পরামর্শে অযথাভাবে প্রভাবিত হন।
প্রকৃতপক্ষে, অর্থনীতি একটি নীতি-নির্ভর বিষয়, যা কর আরোপ, ভর্তুকি প্রদান, সরকারি ব্যয় এবং বিধিনিষেধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের
সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু নব্য-ধ্রুপদী ধারার (Neo-classical)
মুখপাত্ররা মুক্ত বাজারের (বড়
ব্যবসার স্বার্থে) নীতি সমর্থন করেন এবং কল্যাণ রাষ্ট্রের নীতির প্রতি বিরূপ
মনোভাব পোষণ করেন, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো প্রায়ই এই নোবেল বিজয়ীদের মতবাদগুলোর
ব্যবহারিক প্রয়োগ করতে চায়, যার ফলে শ্রমজীবী শ্রেণি ও সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াই কঠিন হয়ে যায়। এসব নীতির
মধ্যে রয়েছে—শ্রমিক-বান্ধব শ্রম আইন বাতিল করা, সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারিকরণ,
কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে কর ছাড়
দেওয়া, সামাজিক খাতে ব্যয় কমানো, পরোক্ষ কর বৃদ্ধি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ
শিথিল করা।
এই ধরনের নীতিগুলো মূলত আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সংস্থা এবং বিশ্বব্যাপী
পুঁজিবাদী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। উদাহরণস্বরূপ, নোবেল বিজয়ী মিল্টন ফ্রিডম্যান চিলিতে গণতান্ত্রিকভাবে
নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের সরকার উৎখাতের পক্ষে ছিলেন এবং একনায়ক
পিনোচেটের নব্য-উদারনৈতিক নীতিগুলোর বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন (Fischer, 2009;
Frank, 1976; Klein, 2007)। এই ধরনের নীতির প্রইয়োগ সরাসরি শ্রমজীবী মানুষ এবং সাধারণ
নাগরিকদের জীবনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ফেলে, আর বিশেষ সুবিধা পায় বড় কর্পোরেশন এবং পুঁজিবাদী শ্রেণি।
নোবেল বিজয়ীদের বিভিন্ন তত্ত্ব ও মতবাদ—যেমন Efficient Market
Hypothesis, Black-Scholes সূত্র, এবং বিশেষ করে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্তির পক্ষে
অবস্থান—নিয়ন্ত্রিত নয় এমন বাজারের তথাকথিত জাদুকরী দক্ষতার (Efficiency)
বিশ্বাসকে সমর্থন করেছে। এসব
ধারণা আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ২০০৭ সালের মহা আর্থিক
সংকটের দিকে নিয়ে গেছে (Bresser-Pereira, 2010; Crotty, 2017)। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, অর্থনীতিতে এই ছদ্ম-নোবেল পুরস্কার অর্থনৈতিক মতামতের বৈচিত্র্যকে বাধা দেয়
এবং বিষয়টিতে নির্দিষ্ট কিছু মুখপাত্র তৈরি করে, যারা আসলে বাজারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে। ফলে,
এই পুরস্কার ক্রমশ বিশ্বজুড়ে
নব্য-উদারনৈতিক নীতিগুলিকে প্রচার ও বৈধতা দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে
পরিণত হয়েছে।
তাছাড়াও, অর্থনীতিতে ছদ্ম-নোবেল পুরস্কার মূলত বৈশ্বিক উত্তরের (Global
North) কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে
কেন্দ্রীভূত। বেশিরভাগ নোবেলজয়ী উত্তর আমেরিকার কিছুসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের
সঙ্গে যুক্ত (Totska, 2023)। ১৯৬৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে
অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া ৯৬ জনের মধ্যে প্রায় ৪৬% যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র চারটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন—শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়,
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ
টেকনোলজি (MIT), হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের
মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ০.১২%, ইউরোপের ০.০২%, এবং বিশ্বের মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ০.০০০১২%
প্রতিনিধিত্ব করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই
অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত পটভূমি থেকে আসেন (Stansbury
& Schultz, 2023)। এ ধরনের কেন্দ্রীকরণ অর্থনীতির বৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন
অঞ্চলের চিন্তাধারা তুলে ধরার সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করে।
দেখা গেছে, অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা নিজেদের মধ্যে অধ্যাপক-শিক্ষার্থীর ঘনিষ্ঠ
নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত (Tol, 2022), এবং এতে স্বজনপ্রীতির সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়
না (Zuckerman, 1977)। এই ফলাফল অপ্রত্যাশিত নয়,
কারণ নোবেল পুরস্কারের নির্বাচন
কমিটি পূর্ববর্তী নোবেলজয়ীদের পরবর্তী বছরের প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ
দেয় (NobelPrize.org, 2018)। এমনকি পূর্বের কোনো বিজয়ীর
দ্বারা মনোনীত হলে, পুরস্কার জেতার সম্ভাবনা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায় (Economist
Data Team, 2021)। এছাড়া, গ্লোবাল সাউথ উৎপাদিত জ্ঞানকে একেবারে উপেক্ষা করে পশ্চিমা
বিশ্বের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা নোবেল পুরস্কারের
বর্জনমূলক চরিত্রকে আরও তীব্র করে তোলে। এর ফলে জ্ঞান উৎপাদনের একচেটিয়া অধিকার
কিছু নির্দিষ্ট কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা অর্থনীতির উপনিবেশমুক্তকরণকে (Decolonise)
প্রায় অসম্ভব করে তোলে।
এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দারন আসেমোগ্লু (MIT),
সাইমন জনসন (MIT),
এবং জেমস রবিনসন (শিকাগো
বিশ্ববিদ্যালয়)। নোবেল কমিটি বলছে, তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে প্রতিষ্ঠান (institutions)
এবং সমৃদ্ধির মধ্যে গভীর
সম্পর্ক রয়েছে। তাঁরা এমন তাত্ত্বিক ধারণাও তৈরি করেছেন,
যা ব্যাখ্যা করে কেন কিছু
প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন একইরকম থাকে এবং কীভাবে সময়ের সাথে এগুলো পরিবর্তন হতে পারে।
তাঁদের সকল গবেষণা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা কঠিন, তাই এখানে তাঁদের অন্যতম প্রভাবশালী ও বহুল উদ্ধৃত কাজগুলোর
একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হলো।
আসেমোগ্লুর যে কাজটি তাঁর এ বছরের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রেখেছে তার একটি সমালোচনাকান্ত তার আদর্শবাদী দর… ক্যাভেগ্রাভেনের কাজে পাওয়া যায় (Kvangraven
et al. 2024)। আসেমোগ্লুর গবেষণা নিউ ইনস্টিটিউশনাল ইকোনমিকস ধারায় পড়ে।
তিনি দেখিয়েছেন যে প্রতিষ্ঠান( যেমন কোনো দেশের আইন বা সামাজিক নিয়ম,
যা মানুষের অর্থনৈতিক কাজকর্মকে
নিয়ন্ত্রণ করে) একটি দেশের উন্নতি বা অবনতিতে বড় ভূমিকা রাখে। তাঁদের গবেষণার
মূল কথা হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য ‘সঠিক প্রতিষ্ঠান‘ খুঁজে বের করা। তবে, তাদের সুপারিশ করা তথাকথিত ‘সঠিক প্রতিষ্ঠান‘গুলোর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এগুলো আসলে পুঁজিপতিদের সম্পত্তির আধিপত্য কায়েম ও শক্তিশালী করার
জন্য তৈরি। এর ফলে বাজারের কার্যকারিতা (Market Efficiency)
বাড়ে এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলো
লাভবান হয়।
তাঁদের অন্যতম আলোচিত প্রবন্ধ “The Colonial
Origins of Comparative Development: An Empirical Investigation – American
Economic Association”-এ তাঁরা
যুক্তি দিয়েছেন যে ঔপনিবেশিক শাসকেরা শোষণমূলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক যেসব
প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছে, তা প্রাক্তন উপনিবেশগুলির উপনিবেশ-পরবর্তী অর্থনৈতিক
ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে। অর্থাৎ, কোনো দেশ কীভাবে উন্নতি করবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে তাদের অতীতে প্রতিষ্ঠিত ঐসব
শাসনব্যবস্থার ধরন ও প্রকৃতির ওপর।
তবে, তাঁদের গবেষণায় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে,
তা হলো—ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাই এমন
জটিল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছিল, যা গ্লোবাল সাউথ থেকে সম্পদ লুট করে গ্লোবাল নর্থে
স্থানান্তরের সুযোগ করে দিয়েছিলো। শোষণমূলক প্রতিষ্ঠানের শিকার প্রাক্তন
উপনিবেশগুলোকে দরিদ্র ও অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে রেখে,
সেটলার উপনিবেশগুলো (যেখানে
সহায়ক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছিল) বিপুল সম্পদ আহরণে সক্ষম হয়েছিল (Amin,
1988; Frank, 2013)।
একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো, ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে ভারতীয় উপনিবেশ থেকে
যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ স্থানান্তরিত হয়েছিল (Patnaik,
2017)। এছাড়া, ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে গ্লোবাল সাউথ থেকে গ্লোবাল
নর্থে প্রায় ২৪২ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ স্থানান্তরিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয় (Hickel
et al., 2022)।
এই লুটপাট এবং সম্পদের বৈষম্যমূলক স্থানান্তর প্রমাণ করে যে,
উন্নত বিশ্বের সমৃদ্ধি
অনেকাংশেই গ্লোবাল সাউথে করা শোষণের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আসেমোগ্লু ও
তাঁর সহকর্মীরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, উন্নত বিশ্বের আজকের চাকচিক্য গ্লোবাল সাউথের মানুষের
দুরবস্থার ওপর দাঁড়িয়েই তৈরি হয়েছে (Amin, 1988)। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অর্থায়নের নামে ঋণ বা বিনিয়োগের চাপ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নিজেদের নীতি
গ্রহণের ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে (Patnaik, 2005, 2018)। তাঁরা এটাও বোঝাতে ব্যর্থ হন যে বিশ্বজুড়ে পুঁজির প্রবাহ একটি স্বয়ংক্রিয়
বৈশ্বিক প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে (Grinberg, 2018)।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং জাতীয়করণমতো নীতি পুঁজিবাদের বাইরে মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার
সমাধান দিতে পারে। তবে আসেমোগ্লু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা,
সমন্বয় এবং জাতীয়করণ
ইত্যাদিকে শোষণমূলক মনে করেন। বাস্তবে, ভারত ও চীন-এর মতো দেশগুলো শিল্পায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও
অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ব্যবহার করেছে এবং সফলও হয়েছে।
তবে আসেমোগ্লু কিছু সামাজিক গণতান্ত্রিক সমাধানের কথা বলেন,
যেমন ন্যূনতম মজুরি,
একচেটিয়া ব্যবসা ভাঙা,
বৈষম্য কমানো,
শ্রমিক ইউনিয়নের সমর্থন এবং
গণতন্ত্রের প্রসার। কিন্তু এসব প্রস্তাবের সবই পুঁজিবাদের কাঠামোর মধ্য থেকেই
দেওয়া সাময়িক সমাধান।
আসেমোগ্লু ও তাঁর সহকর্মীদের নোবেল পাওয়া আবারও দেখায় যে এই পুরস্কার
পুঁজিবাদকে প্রশ্ন না করা গবেষকদেরই স্বীকৃতি দেয়।
পুঁজিবাদ এখন মানবতার জন্য বড় সংকট তৈরি করছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা
নজিরবিহীনভাবে বৈষম্য বাড়াচ্ছে, সাধারণ মানুষকে নব্য-উদারনৈতিক কঠোর নীতির ফাঁদে ফেলছে এবং
এর ফলে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন স্থানে ডানপন্থী নব্য-ফ্যাসিস্টদের উৎসাহিত করছে।
এমন সময়ে, পুঁজিবাদকে সমর্থন করা এবং তার সমালোচনাকে স্তব্ধ করার জন্য নোবেল পুরস্কারের
উদযাপন রোমের সম্রাট নিরোকেও লজ্জায় ফেলতে পারে। তাই,
এখনই সময় এসেছে অর্থনীতিতে
নোবেল পুরস্কারকে অন্ধভাবে প্রশংসা করা বন্ধ করার এবং ৫০ বছর আগে গুনার মিরডালের
করা অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বাতিলের দাবি আহ্বানকে নতুন করে তুলে ধরার তোলার (Brittan,
2009)।
[ড. দাওয়া শেরপা‘র এই লেখাটি ডেভলাপিংইকোনমিক্সডটওআরজি ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহকৃত। মূল লেখাটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।]
অনুবাদকঃ খায়রুল হাসান।
রেফারেন্স
·
Acemoglu, D.
(2005). Institutions as the Fundamental Cause of Long-Run Growth. Handbook
of Economics Growth.
·
Acemoglu, D.,
Johnson, S., & Robinson, J. A. (2001). The colonial origins of comparative
development: An empirical investigation. American Economic Review, 91(5),
1369–1401.
·
Acemoglu, D.,
& Robinson, J. A. (2013). Why nations fail: The origins of power,
prosperity, and poverty. Crown Currency.
·
Altman, M. (2004).
The Nobel Prize in behavioral and experimental economics: A contextual and
critical appraisal of the contributions of Daniel Kahneman and Vernon
Smith. Review of Political Economy, 16(1), 3–41.
·
Amin, S. (1988).
Accumulation on a World Scale: Thirty Years Later. Rethinking Marxism.
·
Brittan, S. (2009,
June 30). The not so noble Nobel Prize – Samuel Brittan: The Financial
Times 19/12/03.
·
Crotty, J. (2017).
The Realism of Assumptions Does Matter: Why Keynes-Minsky Theory Must Replace
Efficient Market Theory as the Guide to Financial Regulation Policy. In Capitalism,
Macroeconomics and Reality (pp. 13–38). Edward Elgar Publishing.
·
Economist Data
Team. (2021). The best way to win a Nobel is to get nominated by another
laureate. The Economist, 1.
·
Fischer, K.
(2009). The Influence of Neoliberals in Chile before, during, and after
Pinochet. The Road from Mont Pèlerin: The Making of the Neoliberal
Thought Collective, 305–346.
·
Frank, A. G.
(1976). Economic genocide in Chile: Open letter to Milton Friedman and Arnold
Harberger. Economic and Political Weekly, 880–888.
·
Frank, A. G.
(2013). The development of underdevelopment. In Sociological Worlds (pp.
135–141). Routledge.
·
Grinberg, N.
(2018). Institutions and Capitalist Development: A Critique of the New
Institutional Economics. Science & Society, 82(2), 203–233.
·
Hickel, J.,
Dorninger, C., Wieland, H., & Suwandi, I. (2022). Imperialist appropriation
in the world economy: Drain from the global South through unequal exchange,
1990–2015. Global Environmental Change, 73, 102467.
·
Klein, N.
(2007). The Shock Doctrine: The Rise of Disaster Capitalism.
Metropolitan Books.
·
Kvangraven, I. H.,
& Kesar, S. D. (2024). The Colonial Origins of Economics. Economic
and Political Weekly, 59(42).
·
MacLean, N.
(2017). Democracy in Chains. The Deep History of the Radical Right’s
Stealth Plan for America.
·
Maxton, G., &
Randers, J. (2016). Reinventing prosperity: Managing economic growth to
reduce unemployment, inequality, and climate change. Greystone Books.
·
Mirowski, P.
(2020). The neoliberal Ersatz Nobel prize. Nine Lives of Neoliberalism,
219–254.
·
Myrdal, G. (1977).
The Nobel Prize in Economic Science. Challenge, 20(1), 50–52.
·
Nature. (2024).
Nobel prizes are globally unrepresentative—The nomination process must be
opened up. Nature, 634(8033), 266–266.
·
NobelPrize.org.
(2018, July 4). Nomination and selection of economic sciences laureates. NobelPrize.Org. https://www.nobelprize.org/nomination/economic-sciences/
·
Offer, A., &
Söderberg, G. (2017). The Nobel Factor: The Prize in Economics, Social
Democracy, and the Market Turn. Princeton University Press.
·
Patnaik, P.
(2018). Reflections on contemporary capitalism. In The Changing Face of
Imperialism (pp. 15–36). New York and Oxford: Routledge.
·
Patnaik, U.
(2017). Revisiting the ‘Drain,’ or transfers from India to Britain in the
context of global diffusion of capitalism. In Chakrabarti, S., & Patnaik,
U. (Eds.), Agrarian and other histories: Essays for Binay Bhushan
Chaudhuri. Tulika Books.
·
Stansbury, A.,
& Schultz, R. (2023). The Economics Profession’s Socioeconomic Diversity
Problem. Journal of Economic Perspectives, 37(4), 207–230.
·
The Local—Nobel
descendant slams Economics prize. (2005, September
28).
·
Tol, R. S. J.
(2022). Rise of the Kniesians: The professor-student network of Nobel laureates
in economics. The European Journal of the History of Economic Thought,
29(4), 680–703.
·
Tol, R. S. J.
(2023). Nobel begets Nobel (arXiv:2207.04441).
·
Tol, R. S. J.
(2024). The Nobel family. Scientometrics, 129(3), 1329–1346.
·
Totska, O. L.
(2023). Nobel Prize in Economics: Retrospective analysis and prediction of
laureates. Journal of Management & Technology [Revista Gestão &
Tecnologia], 23(2), 10–28.
·
Zuckerman, H.
(1977). Scientific Elite: Nobel Laureates in the United States. The
Free Press.
প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন
লেখকবৃন্দ
ড. দাওয়া শেরপা, সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, কুরসিয়ং কলেজ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।
খায়রুল হাসান জাহিন ক্রিমসন থিওরির উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন। বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থায় তরুণ গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তার আগ্রহের বিষয় স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফর্মেশন, ইকোলজিক্যাল ইকোনমিক্স।










