সহজ পাঠঃ মার্ক্সের প্রতিবেশ (Ecology)

ইকোলজি  বা প্রতিবেশ হলো জীব ও তাদের পরিবেশের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা। এটি বোঝায়, কীভাবে গাছপালা, প্রাণী আর মানুষ মাটি, পানি, বাতাসের সঙ্গে মিলে মিশে থাকে এবং কীভাবে এদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হয়। তবে, মানুষের শিল্প ও কৃষির মতো কর্মকাণ্ড এই ভারসাম্য নষ্ট করছে, যা পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ইকোলজির ধারণা শুধু প্রকৃতি নিয়ে নয়, সমাজ আর অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত। কার্ল মার্ক্স তাঁর চিন্তায় দেখিয়েছিলেন, কেমন করে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবেশের ক্ষতি করে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে দেয়। জন বেলামি ফস্টার তাঁর বিভিন্ন লেখায় এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন, যেখানে মার্ক্সের তত্ত্বগুলো পরিবেশগত সমস্যাগুলো বিশ্লেষণে নতুন মাত্রা যোগ করে।

মার্ক্স “মেটাবলিক রিফট” ধারণায় বলেন, মানুষের উৎপাদন আর প্রকৃতির মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক চক্র ভেঙে গেছে। আগে কৃষকরা মাটি থেকে ফসল নিত এবং পশুর গোবর দিয়ে মাটির পুষ্টি ফেরত দিত। এতে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকত। কিন্তু বড় বড় কারখানা আর শিল্প-ভিত্তিক চাষাবাদ এই চক্রকে নষ্ট করেছে। এখন ফসল শহরে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু মাটিতে আর পুষ্টি ফেরত দেওয়া হয় না, ফলে মাটি ক্রমেই উর্বরতা হারায়। জার্মান রসায়নবিদ জাস্টাস ফন লিবিগ-এর তত্ত্ব থেকে মার্ক্স এই ধারণা পেয়েছিলেন। লিবিগ বলেছিলেন, ব্রিটিশ কৃষিকাজ ছিল একপ্রকার “ডাকাতি প্রথা”, যা মাটি থেকে শুধু নিয়ে গেছে, কিছুই ফেরত দেয়নি। এমনকি ব্রিটেন পেরুর গুয়ানো (পাখির বিষ্ঠা) আমদানি করত, যাতে তাদের মাটিতে সারের ঘাটতি পূরণ করা যায়। এই পদ্ধতি প্রকৃতি থেকে শুধু নেওয়ার, কিন্তু কিছু না দেওয়ার—যা মার্ক্সের মতে, পুঁজিবাদের মতোই শোষণমূলক।

মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বড় বড় শিল্প এবং কৃষিকে একত্র করে, যাতে তারা প্রাকৃতিক সম্পদ সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করে এবং প্রচুর বর্জ্য তৈরি করে। তিনি লন্ডনের মতো শহরগুলোর উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, কীভাবে তারা মানুষ এবং শিল্পের বর্জ্য দিয়ে নদীগুলো দূষিত করে। এই ধরণের উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। মার্ক্স মনে করতেন, পুঁজিবাদ শুধু শ্রমিককেই নয়, প্রকৃতিকেও শোষণ করে। শহরগুলো গ্রাম থেকে ফসল নিয়ে নেয়, কিন্তু মাটিতে সেই পুষ্টি আর ফেরত দেয় না। এর ফলে, শহর আর গ্রাম—দুই জায়গাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টেকসই উন্নয়ন বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে ভালো অবস্থায় রেখে যাওয়া এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভব নয়।

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন

পুঁজিবাদী উৎপাদন মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যে প্রাকৃতিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক ছিল, সেটিকে ব্যাহত করে। এই সম্পর্কের পরিবেশ নষ্ট করে দিয়ে, পুঁজিবাদ বাধ্য হয় সেটির নিয়মিত পুনর্গঠন করতে, যা সামাজিক উৎপাদনের একটি নিয়মে পরিণত হয়। এই পুনর্গঠন অবশ্য এমনভাবে করা হয়, যা মানবজাতির পূর্ণ বিকাশের উপযুক্ত।

মার্ক্সের মতে, সমস্যার সমাধান হলো একটি যুক্তিসঙ্গত কৃষি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধুমাত্র এমন এক সমাজেই এটা সম্ভব, যেখানে মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতির যত্নও নেওয়া হবে। উৎপাদনকে যদি মুনাফার জন্য নয়, মানুষের এবং পরিবেশের কল্যাণে পরিকল্পনা করা হয়, তবেই এই ভারসাম্য অর্জন করা সম্ভব। মার্ক্স এমন এক কৃষি-শিল্পের সংমিশ্রণ চেয়েছিলেন, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ টেকসইভাবে ব্যবহৃত হবে। এতে মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে প্রাকৃতিক সার এবং টেকসই পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে, রাসায়নিক সার নয়।

আজকের দিনে মার্ক্সের এই ধারণা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জলবায়ু পরিবর্তন, মাটি দূষণ, এবং বায়ু দূষণ—এসব সমস্যার মূল কারণ সেই একই পুঁজিবাদী শোষণ। আজও শহর এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রকৃতি থেকে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই ফেরত দিচ্ছে না। “মেটাবলিক রিফট” বা এই ভাঙন যত দিন থাকবে, তত দিন সমস্যাগুলো আরও বাড়বে। জন বেলামি ফস্টার মনে করেন, পরিবেশের সমস্যা সমাধান করতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও বদলাতে হবে। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, যদি সেটি মুনাফা বৃদ্ধির জন্যই ব্যবহৃত হয়, তবে পরিবেশের সুরক্ষা সম্ভব নয়।

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন

লেখক

Scroll to Top