সম্পদ ও দারিদ্র্যের দ্বান্দ্বিকতা

প্রভাত পাটনায়েক বলছেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য আলাদা কোনো বিষয় নয়; বরং তারা একে অপরের পরিপূরক। ঔপনিবেশিক শাসন ও পুঁজিবাদী নীতির মাধ্যমে কিছু অঞ্চলের সম্পদ শোষণ করে অন্যদের ধনী করা হয়েছে। এই ইতিহাস আমাদের বর্তমান বৈষম্যের চিত্রকে আরো স্পষ্ট করে তোলে এবং প্রবৃদ্ধির একচেটিয়া ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সম্পদ ও দারিদ্রতা

প্রভাত পট্টনায়েক

প্রভাত পট্টনায়েক (জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫) একজন ভারতীয় মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তিনি জাওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ সোশ্যাল সায়েন্সেসের ইকোনোমিক স্টাডিজ অ্যান্ড প্ল্যানিং সেন্টারে শিক্ষকতা করেছেন।

এই বছরের তিনজন মার্কিন অর্থনীতিবিদকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার (সঠিকভাবে বলতে গেলে রিক্সব্যাংক পুরস্কার) প্রদান করা হয়েছে। তাদের গবেষণার বিষয় ছিলো কোন ব্যাপারগুলো কোন দেশের সম্পদ বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে বা বাধা দেয়। তাদের মতে কোন দেশের সমৃদ্ধির পেছনে “প্রতিষ্ঠানের” একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা দাবি করেন যে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক। যেসব স্থানে উপনিবেশবাদ তথাকথিত “অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান” তৈরি করেছিল, যেমন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো স্থায়ী উপনিবেশগুলোতে, সেখানকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সফল হয়েছে। অন্যদিকে, যেখানে উপনিবেশবাদ “শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান” প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেখানে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে।

তাদের কাজ নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, তাদের যুক্তির ভিত্তি দুর্বল। কারণ, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র বা দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ ছাড়াই অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। এমনকি পশ্চিমা দেশগুলোরও উচ্চ প্রবৃদ্ধির সময় দুর্নীতি ছিল একটি সাধারণ বিষয়। অন্যদিকে, কেউ কেউ বলেছেন যে বসতিস্থাপনকারী উপনিবেশ এবং অন্যান্য উপনিবেশের পার্থক্য হলো, বসতিস্থাপনকারী উপনিবেশগুলোতে পশ্চিমা জনগণ অভিবাসী হয়ে এসে বসবাস করতেন। আরেক দল সমালোচক মনে করেন, এই গবেষকরা পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিমূল্যায়ন করেছেন এবং উপনিবেশবাদের মাধ্যমে চালানো চরম নির্যাতন বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

“কিছু দেশের পিছিয়ে পড়া আসলে অন্যদের এগিয়ে যাওয়ার ফলাফল। অর্থাৎ, পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধিই দারিদ্র্যের জন্ম দেয়।”

এখানে আমাদের উদ্দেশ্য এই লেখকদের যুক্তি বিশ্লেষণ করা নয়। বরং আমরা তাদের প্রবৃদ্ধি ও পশ্চাৎপদতার ধারণায় থাকা একটি মৌলিক ঘাটতির দিকে ইঙ্গিত করতে চাই, যা তাদের সমালোচকদের চিন্তাভাবনাতেও বিদ্যমান। যদিও এই সমালোচকরা অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক হতে পারেন। এই ঘাটতি হলো, তারা দারিদ্র্যকে শুধু উন্নয়নের অভাব হিসেবে দেখেন, অথচ বাস্তবে এটি প্রবৃদ্ধিরই একটি দ্বান্দ্বিক অংশ। তাদের চিন্তাভাবনায় এমন একটি দৌড়ের চিত্র উঠে আসে, যেখানে কিছু দেশ ভালো (“অন্তর্ভুক্তিমূলক”) প্রতিষ্ঠান নিয়ে এগিয়ে গেছে, আর কিছু দেশ খারাপ (“শোষণমূলক”) প্রতিষ্ঠান নিয়ে পিছিয়ে পড়েছে। কিন্তু এতে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বাদ পড়ে তা হলো, কিছু দেশের পিছিয়ে পড়া আসলে অন্যদের এগিয়ে যাওয়ার ফলাফল। অর্থাৎ, পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধিই দারিদ্র্যের জন্ম দেয়। প্রয়াত আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক এই ঘটনা ব্যাখ্যা করতে বলেছিলেন “পশ্চাৎপদতার বিকাশ”। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে পশ্চাৎপদতা শুধু উন্নয়নের অভাব নয়, বরং এটি এক ধরণের বিশেষ উন্নয়ন যা সাধারণ উন্নয়নের সমান্তরালেই ঘটে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যখন পৃথিবীর কিছু দেশ বা অঞ্চল উন্নত হয়, তখন অন্য দেশ বা অঞ্চল পিছিয়ে পড়ে। এই বৈষম্যের সমীকরণটি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবী কোনো স্থানের সম্পদের প্রবৃদ্ধি অন্য প্রান্তের দারিদ্রের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু রিক্সব্যাংক পুরস্কারের সাম্প্রতিক বিজয়ীরা উন্নয়ন ও পশ্চাৎপদতা এবং সম্পদের প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্যের এই বিপরীতমূলক বা দ্বান্দিক সংযোগটিকে মানতে চান না। 

সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্যের বৃদ্ধির সম্পর্ক, আর কিছু দেশে ব্যাপক উন্নয়নের সমান্তরালে অন্যদের পশ্চাৎপদ থাকার মূল কারণ লুকিয়ে আছে পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে। পুঁজিবাদে মূলধনের আদিম সঞ্চয়ন (primitive accumulation) নামে একটি প্রক্রিয়া থাকে, যেখানে ছোট ছোট স্বাধীন উৎপাদকদের থেকে সম্পদ ও সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয়, ফলে তারা আরও দরিদ্র হয়ে পড়ে। কিন্তু এই মানুষদের সবাইকে পুঁজিবাদ নিজস্ব ব্যবস্থার অধীনে কাজের সুযোগ দেয় না। কেবল একটি ছোট অংশই পুঁজিবাদী খাতে কাজের সুযোগ পায়, আর বেশিরভাগই এই প্রবৃদ্ধির বাইরে থেকে দরিদ্র অবস্থায় থেকে যায়। 

সময়ের সাথে পুঁজির সঞ্চয় বৃদ্ধি পেতে থাকলেও এই ব্যবস্থার “বাইরে” থাকা মানুষের সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এই ‘বাইরে থাকা’ মানুষ বলতে সেসব কৃষকদের বোঝানো হয়েছে যারা পুঁজিবাদের সম্প্রসারণের কারণে তাদের জমি হারিয়েছেন, সেসব ছোট ব্যবসায়ী যারা বড় কোম্পানীর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি, কিংবা সেসব শ্রমিক যারা অটোমেটিক মেশিনের কাছে তাদের চাকরি হারিয়েছেন। যদিও বা এই ব্যবস্থার ‘বাইরে থাকা’ সংখ্যা না বাড়ে, বরং স্থিতিশীল বা হ্রাস পায়, তাহলেও তাদের মধ্যে দারিদ্র্যের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং তাদের দারিদ্র্যের মাত্রা কমে যাওয়া, সম্ভাবনা নেই কারণ প্রাথমিক পুঁজি সঞ্চয় একটি অনবরত চলমান প্রক্রিয়া। এই ঘটনাই ব্যাখ্যা করে কেন একদিকে সম্পদ সঞ্চয় ঘটলে অন্যদিকে একইসাথে দারিদ্র্যের বৃদ্ধি ঘটে। তবে সম্পর্কটি বোঝা আমাদের জন্য প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, পুঁজির প্রাথমিক সঞ্চয় প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ চিত্রটি আমাদের কাছে অস্পষ্ট।  সাধারণত, কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপরেই আমাদের বেশী মনোযোগ থাকার কারণে অনেক সময়ই ভুল ধারণার তৈরি হয়। 

পুঁজিবাদের দীর্ঘ প্রবৃদ্ধির সময়, অর্থাৎ ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত, পুঁজিবাদ একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়। এ সময় সম্পদ ও দারিদ্র্য একসাথে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পুঁজিবাদ ব্রিটেন থেকে ইউরোপের অন্য অঞ্চলে এবং ইউরোপীয়দের বসতি স্থাপনের জায়গাগুলোতে যেমন— কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। এই বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছিল কারণ ব্রিটেন এই অঞ্চলের পণ্যের জন্য নিজের বাজার খুলে দেয়, পাশাপাশি তাদের শিল্পে বিনিয়োগ করে এবং ব্রিটেন ও ইউরোপের মানুষদের এসব অঞ্চলে যেতে উৎসাহিত করে।

“ইউরোপ এবং তার বসতিস্থাপনকারী উপনিবেশগুলোতে সম্পদের সঞ্চয় ও উন্নতি ঘটে, আর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপনিবেশগুলোতে সেই সম্পদ শোষণ করে দরিদ্রতা বাড়ানো হয়। ইউরোপের অর্থনীতিবিদরা একে নিজেরাই অর্জিত সফলতা বলে তুলে ধরেন, যদিও এর অন্তরালে ছিল ঔপনিবেশিক শোষণ।”

নেপোলিয়নের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে (১৮১৫) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত (১৯১৪) ইউরোপ থেকে অন্তত ৫ কোটি মানুষ অভিবাসন করেছিলেন। এই অভিবাসীরা গিয়ে নতুন অঞ্চলে স্থানীয় মানুষের জমি দখল করেছিল। যারা এই সংঘর্ষে প্রাণ হারায়নি বা নতুন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়নি, তাদের অনেককে নির্দিষ্ট এলাকায় (“রিজার্ভেশন”) আটকে রাখা হয়। শুধু ব্রিটেন থেকেই এত বেশি মানুষ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল যে বলা হয়, প্রতি বছর ব্রিটেনের জনসংখ্যা যে পরিমাণ বাড়ত, তার প্রায় অর্ধেকই “নিউ ওয়ার্ল্ড” বা নতুন বিশ্বে চলে যেত।

ব্রিটেন তার নতুন বসতি স্থাপনকারী দেশগুলো, যেমন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সহজে পণ্য রপ্তানি করত এবং সেখানে প্রচুর বিনিয়োগও করত। এ কারণে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে একটা বড় ঘাটতি দেখা দিত। অন্যদিকে, এসব দেশ থেকে প্রচুর পণ্য আমদানি করায় ব্রিটিশ অর্থনীতিতে সংকটের ঝুঁকি বাড়ে, যেখানে স্থানীয় কিছু শিল্প ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এতে বেকারত্ব বেড়ে যেতে পারত এবং আমদানি-নির্ভর বাজারে রক্ষার প্রয়োজন পড়ত। এই সংকট মোকাবিলা করতে, ব্রিটেন তার অতিরিক্ত পণ্য, বিশেষ করে কটন টেক্সটাইল, তাদের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপনিবেশগুলোতে (যেমন ভারত, আফ্রিকার দেশ) রপ্তানি করতে থাকে। এই কটন টেক্সটাইল তখন শিল্পবিপ্লবের অন্যতম প্রধান উৎপাদন ছিল, যা ব্রিটেনে ঘরোয়া চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হচ্ছিল।

ঐতিহাসিক এরিক হবসবম এই পুরো প্রক্রিয়াকে “কলোনিতে গমন” বলে অভিহিত করেন, অর্থাৎ ব্রিটেন তার উপনিবেশে সেই পণ্য বিক্রি করছিল যা নিজ দেশে বিক্রি করা যাচ্ছিল না। তবে এর একটা বড় প্রতিক্রিয়া উপনিবেশগুলোতে দেখা দেয়। ঐতিহ্যবাহী কারিগর, বিশেষ করে সুতাকাটা ও তাঁতশিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা তাদের কাজ হারাতে শুরু করে, কারণ তাদের তৈরি পণ্য ব্রিটিশ পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছিল না। ফলে, এই শ্রমিকদের অনেকেই জমির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, জমিতে কাজ করতে বাধ্য হয়। এর ফলে জমির ভাড়া বাড়তে থাকে, মজুরি কমতে থাকে এবং স্থানীয়ভাবে দারিদ্র্য অনেক বৃদ্ধি পায়। এভাবে ব্রিটেনের শিল্প বৃদ্ধির জন্য উপনিবেশগুলোতে প্রচলিত জীবনধারা ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দারিদ্র্যের গভীর সংকট তৈরি করে।

সেই সময়ে ব্রিটেনের “নতুন শিল্পায়নপ্রাপ্ত দেশগুলো,” যেমন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছিল, তা অনেকটাই পূরণ হত ব্রিটেনের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপনিবেশগুলো থেকে আসা দুটি উৎস থেকে। প্রথমত, ব্রিটেন এসব উপনিবেশে তার শিল্প-বিনাশকারী পণ্য, যেমন কটন টেক্সটাইল রপ্তানি করত, যা সেখানের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোকে ধ্বংস করেছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটিশদের সস্তা কাপড়ের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ভারতের স্থানীয় তাঁত ও সুতাকাটা শিল্প, বাংলার মসলিন শিল্প ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়।   দ্বিতীয়ত, সম্পদের একমুখী স্থানান্তর ছিল—অর্থাৎ, এই উপনিবেশগুলো থেকে কোনো বিনিময় ছাড়াই সম্পদ ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া হত। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় পুরোপুরি ব্রিটেন নিয়ে নিত, যা ব্রিটেনের জন্য বাণিজ্য ঘাটতি পূরণে সহায়ক ছিল এবং অন্যান্য “নতুন শিল্পায়নপ্রাপ্ত” দেশগুলোর সঙ্গে আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করত। এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কারণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপনিবেশগুলো, যেমন ভারত, ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানে পণ্য রপ্তানি করে প্রচুর আয় করত। ভারতের বিশাল রপ্তানি আয় ছিল মূলত কৃষিপণ্য ও কাঁচামাল সরবরাহের জন্য। কিন্তু এই আয় ভারতের জন্য নয়, বরং ব্রিটেন বিনামূল্যে এই আয় দখল করত এবং তা ব্যবহার করত নিজের নিউ ওয়ার্ল্ডের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য ঘাটতি পূরণে। বিনামূল্যে দখল করা বলতে বোঝায়, ব্রিটিশরা ভারতীয় কৃষকদের থেকে রপ্তানি পণ্যের মূল্য আদায় করত তাদেরই করের অর্থ থেকে। এই কর ব্যবস্থার ফলে ভারতের মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে।

“ব্রিটেন ভারতীয় কৃষকদের করের অর্থ থেকে রপ্তানি পণ্যের মূল্য আদায় করত, যা ভারতের জন্য দারিদ্র্য এবং উন্নয়নের সংকট তৈরি করেছিল।”

ঐতিহাসিক এরিক হবসবম “দীর্ঘ উনিশ শতক” নামে একটি বিশেষ সময়কে চিহ্নিত করেছেন, যা ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সময়ে ইউরোপের উপনিবেশগুলোতে, বিশেষ করে বসতিস্থাপনকারী (settler) উপনিবেশগুলোতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। যেমন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় ইউরোপীয় বসতকারীরা গিয়ে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলে। কিন্তু এর বিপরীতে, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপনিবেশগুলোতে, যেমন ভারত, শ্রীলঙ্কা, এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরোপীয় শাসনের কারণে দরিদ্রতা এবং দুর্ভিক্ষ বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের বহু অঞ্চলেই অর্থনৈতিক অবনতি ঘটে এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান কমতে থাকে। অনেক সময় দুর্ভিক্ষের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যান, যেমন ১৮৭৬-৭৮ সালে “মহা দুর্ভিক্ষ”। এটা বোঝাতে গিয়ে অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ শিরিন মুসভি ভারতের মুঘল আমলের সময়কার আয়ের সাথে ঔপনিবেশিক আমলের আয়ের তুলনা করেছেন। তিনি ১৫৭৫ সালের মুঘল আমলের রাজস্ব আদায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তখন ভারত ছিল সমৃদ্ধশালী একটি দেশ এবং প্রজাদের মাথাপিছু আয়ও তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। এরপর তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ১৯১০ সালের ভারতের মাথাপিছু আয়ের সাথে সেই সময়ের তুলনা করেন এবং দেখান যে ১৫৭৫ সালের তুলনায় ১৯১০ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় কমে গিয়েছিল।

“দীর্ঘ উনিশ শতক” নামে পরিচিত সময়ে, ইউরোপে শিল্প পুঁজিবাদের বিস্তার হয়, যা নতুন নতুন কারখানা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রচুর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়। এই উন্নয়ন শুধু ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রচেষ্টার ফল ছিল না; বরং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপনিবেশগুলো থেকে সম্পদ শোষণও এর বড়ো কারণ। ব্রিটেন এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো তখন ভারত, আফ্রিকা, ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো অঞ্চল থেকে প্রচুর কাঁচামাল নিয়ে আসত এবং সেসব জায়গাকে নিজেদের তৈরি পণ্যের জন্য বড় বাজারে পরিণত করেছিল। এই শোষণের মাধ্যমে ইউরোপে পুঁজির সঞ্চয় হয় এবং শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি মজবুত হয়। ইউরোপ শুধু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোকে শোষণ করেই থেমে থাকেনি; তারা আমেরিকা, কানাডা, এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো বসতিস্থাপনকারী উপনিবেশগুলোতেও নতুন নতুন নগরায়ন এবং উন্নয়ন ঘটায়। ফলে, শীতল অঞ্চলের এই উপনিবেশগুলোতে ইউরোপের মতোই সমৃদ্ধি আসে। অন্যদিকে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে দরিদ্রতা বাড়ে, কারণ এখান থেকে যে সম্পদ নেওয়া হচ্ছিল, তা স্থানীয় জনগণের জন্য কোনো উন্নয়নে কাজে লাগেনি। বরং, এটি তাদের জীবনের মান আরো নিচে নামিয়ে দেয়। এভাবে, সম্পদ এবং দরিদ্রতার মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়। ইউরোপ এবং তার বসতিস্থাপনকারী উপনিবেশগুলোতে সম্পদের সঞ্চয় ও উন্নতি ঘটে, আর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপনিবেশগুলোতে সেই সম্পদ শোষণ করে দরিদ্রতা বাড়ানো হয়। অথচ, ইউরোপের অর্থনৈতিক চিন্তাবিদরা কখনোই এ কথা স্বীকার করতে চান না; তারা বোঝাতে চান যে, শিল্প পুঁজিবাদের সমৃদ্ধি শুধু তাদের নিজেদের কৃতিত্বের ফল, উপনিবেশের শোষণের কারণ নয়।

 

লেখকঃ প্রভাত পট্টনায়েক। 
অনুবাদঃ খায়রুল হাসান। 

লেখকবৃন্দ

প্রভাত পট্টনায়েক (জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫) একজন ভারতীয় মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তিনি জাওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ সোশ্যাল সায়েন্সেসের ইকোনোমিক স্টাডিজ অ্যান্ড প্ল্যানিং সেন্টারে শিক্ষকতা করেছেন।

খায়রুল হাসান জাহিন ক্রিমসন থিওরির  উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন। বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থায় তরুণ গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তার আগ্রহের বিষয় স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফর্মেশন, ইকোলজিক্যাল ইকোনমিক্স।

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার জন্য নিচের শব্দগুলোতে ক্লিক করুন

Scroll to Top